ইসলাম মানবসভ্যতাকে যে অনন্য মূল্যবোধ উপহার দিয়েছে, তার মধ্যে ক্ষমা ও সহনশীলতা অন্যতম প্রধান। মানুষের জীবনে সংঘাত, ভুল বোঝাবুঝি, অপমান কিংবা অন্যায় ঘটবে- এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এসব পরিস্থিতিতে একজন বিশ্বাসী যে মনোভাব নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখাবে, সেটাই তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে। ইসলামের শিক্ষা স্পষ্ট—প্রতিশোধে নয়, বরং ক্ষমায় নিহিত আছে প্রকৃত উচ্চতা।
আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেছেন, ভালো আর মন্দ সমান নয়। উৎকৃষ্ট দিয়ে মন্দকে দূর করো। তখন দেখবে, তোমার আর যার মধ্যে শত্রুতা আছে সে যেন অন্তরঙ্গ বন্ধু। (সুরা ফুসসিলাত, ৩৪)। এই আয়াতের মাধ্যমে মুসলমানকে শিখানো হয়েছে—শত্রুতার আগুন নেভানোর জন্য প্রতিশোধ নয়, বরং উত্তম আচরণই উত্তম পথ। অন্য আয়াতে আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেছেন, যদি তোমরা প্রতিশোধ গ্রহণ করতে চাও তবে ততটুকু প্রতিশোধ গ্রহণ কর যতটুকু অন্যায় তোমাদের ওপর করা হয়েছে। আর যদি তোমরা ধৈর্য ধারণ কর তবে ধৈর্য ধারণকারীদের জন্য অবশ্যই তা উত্তম। (সুরা নাহল, ১২৬)।
অর্থাৎ প্রতিশোধ নেওয়ার অনুমতি থাকলেও ক্ষমাই আল্লাহর কাছে অধিক পছন্দনীয়। ক্ষমা শুধু নৈতিকতা নয়—এটি আল্লাহর রহমত লাভের উপায়ও। কোরআনে মুমিনদের প্রশংসা করতে গিয়ে বলা হয়েছে, যারা ক্রোধ সংবরণকারী এবং মানুষের প্রতি ক্ষমাশীল, আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন। (সুরা আলে ইমরান, ১৩৪)
রাসুলুল্লাহ (সা.) শুধু কথায় নয়, বাস্তব জীবনে ক্ষমার অনন্য দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। তিনি বলেছেন, ‘শক্তিশালী সে ব্যক্তি নয় যে কুস্তিতে প্রতিপক্ষকে পরাজিত করে। বরং প্রকৃত শক্তিশালী সে, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।’ (বুখারি, ৬১১৪; মুসলিম, ২৬০৯) প্রতিশোধের আগুন নিভিয়ে আত্মসংযম ও ক্ষমার মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়াই ইসলামের চোখে শক্তির পরিচায়ক।
আরেক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ক্ষমা করে, আল্লাহ তার মর্যাদা বৃদ্ধি করেন।’ (মুসলিম, ২৫৮৮)। সমাজে মর্যাদা ও সম্মান অর্জনের উপায় প্রতিহিংসা নয়; বরং ক্ষমার মাধ্যমে হৃদয় জয় করাই প্রকৃত পথ।
কেন মানুষ প্রতিশোধ না নিয়ে ক্ষমা করবে?
কোরআন ও হাদিসের বেশ কিছু বর্ণনায় প্রতিশোধ গ্রহণ না করে ক্ষমা করাকে উত্তম বলা হয়েছে। আসুন প্রতিশোধ গ্রহণ না করে কেন ক্ষমা করা উত্তম, যা জেনে নিই—
১. মানুষকে ক্ষমা করলে আল্লাহর ক্ষমা লাভ করা যায়: আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেছেন, আর তারা যেন তাদের ক্ষমা করে এবং তাদের দোষত্রুটি উপেক্ষা করে। তোমরা কি পছন্দ করো না যে, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করে দেন? আর আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (সুরা নুর, ২২)
২. ক্ষমা করলে মর্যাদা বৃদ্ধি পায়: আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সদকা করাতে সম্পদের ঘাটতি হয় না। যে ব্যক্তি ক্ষমা করে আল্লাহ তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন। আর যে কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভে বিনীত হলে তিনি তার সম্মান প্রতিষ্ঠিত করে দেন।’ (মুসলিম, ২৫৮৮)
৩. প্রতিশোধ নিতে গেলে সীমা লঙ্ঘনের ঝুঁকি থাকে: আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেন, যদি তোমরা প্রতিশোধ গ্রহণ করতে চাও তবে ততটুকুই প্রতিশোধ গ্রহণ কর যতটুকু অন্যায় তোমাদের ওপর করা হয়েছে। আর যদি তোমরা ধৈর্য ধারণ কর তবে ধৈর্য ধারণকারীদের জন্য অবশ্যই তা উত্তম। (সুরা নাহল, ১২৬)।কঠিন বাস্তবতা হলো—মানুষ প্রতিশোধ নিতে গিয়ে সীমা অতিক্রম করে ফেলতে পারে। তাই আল্লাহ ধৈর্য ও ক্ষমার দিকে উৎসাহ দিয়েছেন।
৪. মন্দকে ভালো দিয়ে বদলে দিলে শত্রুও বন্ধু হয়ে যায়: আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেন, ‘মন্দকে উত্তম আচরণ দিয়ে প্রতিহত করো; তখন দেখবে, যার সঙ্গে শত্রুতা ছিল সে ঘনিষ্ঠ বন্ধুর মতো হয়ে যাবে।’ (সুরা ফুসসিলাত, ৩৪)। এটি ক্ষমার একটি বাস্তবিক ও সামাজিক উপকার- প্রতিশোধ না নিয়ে ক্ষমা করলে শত্রুতা কমে যায় এবং সম্পর্ক ভালো হয়।
৫. রাগ নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষমা করাই প্রকৃত শক্তি: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘শক্তিশালী সে নয় যে কুস্তিতে প্রতিপক্ষকে পরাজিত করে; বরং শক্তিশালী সে, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।’ (বুখারি, ৬১১৪)। সুতরাং ইসলাম বলে, প্রতিশোধ নেওয়া বা প্রতিরোধ শক্তি নয়- আত্মসংযম বা ক্ষমাই হলো প্রকৃত শক্তি।
৬. ক্ষমা সমাজে শান্তি ও স্থিতি আনে: ক্ষমা মানুষের মধ্যে সন্দেহ, শত্রুতা, প্রতিশোধের চক্র ভেঙে দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মক্কা বিজয়ের পর ক্ষমা তার সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণ। তিনি বলেছেন, ‘আজ তোমাদের ওপর কোনো দোষারোপ নেই। তোমরা সবাই মুক্ত।’ (সিরাত ইবনে হিশাম) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এ ক্ষমার ঘোষণায় গোটা আরবে শান্তি এনেছিল।
৭. ক্ষমাকারীদের জন্য আল্লাহ কাছে উত্তম প্রতিদান রয়েছে: আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেছেন, ‘যে ক্ষমা করে ও সংশোধন করে, তার প্রতিদান আল্লাহর দায়িত্বে।’ (সুরা শুরা, ৪০)
প্রতিশোধ মানবিক দুর্বলতা বাড়ায়; ক্ষমা মানবিক শক্তিকে পরিপূর্ণ করে। সমাজে শান্তি, সম্প্রীতি ও ভালোবাসা প্রতিষ্ঠার জন্য মুসলমানকে প্রতিশোধ নয়—বরং ক্ষমার জীবনধারায় অভ্যস্ত হতে হবে। আল্লাহ ও তার রাসুল (সা.)-এর শিক্ষা অনুযায়ী ক্ষমাই হলো মুমিনের প্রকৃত সৌন্দর্য ও উত্তম চরিত্রের প্রতিফলন।
লেখক: আলেম, গবেষক ও সাংবাদিক