ভয়াবহ পানিশূন্যতার ফলে বাংলাদেশের অধিকাংশ নদীর অস্তিত্ব সংকটের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। পলি জমে কমপক্ষে ৯৫টি নদী বিলুপ্তির অপেক্ষায় ধুঁকছে। এ ছাড়া আরও ৪২টি নদ-নদী পলি সঞ্চয়ের কারণে চরের চাপে বিপন্ন হয়ে পড়েছে। পলি জমে চর পড়ায় শুকনো মৌসুমে এসব নদীতে পানি থাকে না। নদী গবেষণা জরিপে সংগতভাবে এগুলোকে মৌসুমি নদী বলে উল্লেখ করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে অধিকাংশ নদ-নদীর এ সঙ্গিন দশায় নদী বিশেষজ্ঞরা দেশের ভূ-প্রাকৃতিক ভারসাম্যের ওপর বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসার আশঙ্কা করছেন।
একদিকে উজানে পানি প্রত্যাহার, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে নদীগুলোর ওপর অবৈধ দখলবাজি, ভরাট এবং অপরিকল্পিতভাবে নানা স্থাপনা নির্মাণের কারণে দেশের অধিকাংশ নদীবক্ষ প্রথমে নাব্যতাহীন, অতঃপর পানিশূন্য হয়ে ধু-ধু বালুচরে পরিণত হচ্ছে। নদীমাতৃক বাংলাদেশে মানুষের জীবন সম্পূর্ণভাবে পানির ওপর নির্ভরশীল। নদ-নদীর পানিকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে এ দেশের মানুষের জীবনধারা। নদ-নদী শুকিয়ে যাওয়ায় শুকনো মৌসুমে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অনেক নিচে নেমে গেছে। প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে সেচ ও পানীয় জলের জন্য ভূগর্ভস্থ পানি তোলায় আর্সেনিকে ভয়াবহভাবে আক্রান্ত হচ্ছে দেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষ। নদীগুলো শুকিয়ে যাওয়ায় বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে এসেছে দেশের মৎস্য সম্পদ ও নৌপরিবহনে।
ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। ইসলাম মানব জীবনের সব বিষয় ও সমস্যার সুষ্ঠু সমাধান দিয়েছে। নদ-নদী মূলত আল্লাহর সৃষ্টি মহান নিয়ামত। এই নিয়ামতের মাধ্যমে শুধু মানবজাতিকেই নয়, গোটা বিশ্ব জাহানকে টিকিয়ে রেখেছেন আল্লাহ। একদিন একটি মুহূর্তের জন্যও যদি পৃথিবীর বুক থেকে নদ-নদী আর সাগর উঠিয়ে নেওয়া যায়, মুহূর্তের মাঝেই নিঃশেষ হয়ে যাবে সবকিছু। তাই আমাদের উচিত শুধু মানবিক চাহিদা বা প্রয়োজন থেকে নয়, একজন খাঁটি মুসলমান হিসেবে প্রত্যেকটি নদ-নদীর সুষ্ঠু সংরক্ষণে ভূমিকা পালন করা। কোনোভাবে যেন এসব নদ-নদীর গতিরোধ না হয় কিংবা কোনো কারণেই যেন মৃত্যুবরণ না করতে হয় নদ-নদীগুলোকে—এ ব্যাপারে সক্রিয় ভূমিকা পাল করা আমাদের ইমানি দায়িত্ব।
অহেতুক সৃষ্টি করা হয়নি এসব নদ-নদী। পবিত্র কোরআনে এরশাদ আছে, ‘এবং তিনি পৃথিবীতে সুদৃঢ় পর্বত স্থাপন করেছেন। যাতে পৃথিবী তোমাদের নিয়ে আন্দোলিত না হয়। এবং স্থাপন করেছেন নদ-নদী ও পথ, যাতে তোমরা তোমাদের গন্তব্যস্থলে পৌঁছাতে পার। (সুরা নাহল: ১৫)
আল্লাহতায়ালা আরও এরশাদ করেন, ‘তিনিই আল্লাহ যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন, যিনি আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করে তা দিয় তোমাদের জীবিকার জন্য ফলমূল উৎপাদন করেন, যিনি নৌযানকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন যাতে তার বিধানে তা সমুদ্রে বিচরণ করে এবং তিনি তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন নদীগুলো (সুরা ইবরাহিম: ৩২)
আরও এরশাদ হচ্ছে, তিনি পৃথিবীকে বিস্তৃত করেছেন এবং তার মধ্য থেকে পর্বত ও নদ-নদী সৃষ্টি করেছেন। (সুরা রাদ: ৩)। গোটা পৃথিবীর তিন ভাগের দুই ভাগ পানি এবং এই দুই ভাগ পানিই নদ-নদী ও সমুদ্রের রূপ নিয়ে উপস্থিত রয়েছে। পানির অপর নাম জীবন। ইসলামি অনুশাসন ও নীতিমালা মেনে, পবিত্র কোরআন ও হাদিসের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রত্যেকটি মানুষের প্রয়োজনে নিজ নিজ স্থান থেকে নদ-নদী সংরক্ষণমূলক কার্যক্রম গ্রহণ করা ও চালিয়ে যাওয়া উচিত।
কারণ এই নদ-নদীর সঙ্গে পরিবেশগত ভারসাম্য ঠিক থাকা না থাকার অনেক সম্পর্ক রয়েছে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে নদ-নদী সংরক্ষণে ভূমিকা পালন করার মাধ্যমে পৃথিবীর প্রকৃতি ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার্থে কাজ করার জন্য কবুল করুন। আমিন।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক