পুরুষদের জন্য সেলাইবিহীন দুই টুকরো সাদা কাপড় আর নারীদের জন্য স্বাচ্ছন্দ্যময় শালীন পোশাক পরিধান করাই হলো ইহরাম।
ইহরাম বাঁধার নিয়ম: মিকাতের নির্ধারিত স্থানে অথবা মিকাতের নির্ধারিত স্থানের আগেই ইহরামের কাপড় পরতে হয়। এ সময় পুরুষরা দুটি নতুন বা পরিষ্কার সাদা চাদর নেবে। একটি লুঙ্গির মতো করে পরবে। অপরটি চাদর হিসেবে ব্যবহার করবে। পায়ের পাতার উপরের অংশ খোলা থাকে এমন জুতা বা স্যান্ডেল পরবে। নারীরা স্বাভাবিক কাপড় পরবে। তাদের জন্য ইহরাম অবস্থায় জুতা-মোজা পরার অবকাশ রয়েছে।
মাকরুহ ওয়াক্ত না হলে ইহরাম বাঁধার আগে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়বে। অতঃপর যে হজ আদায়ের ইচ্ছা সে অনুযায়ী নিয়ত করে তালবিয়া পাঠ করবে। নামাজের প্রথম রাকাতে সুরা ফাতিহা পর সুরা কাফিরুন ও দ্বিতীয় রাকাতে সুরা ইখলাস পড়া মুস্তাহাব। (নামাজের সময় মাথায় টুপি থাকবে, নামাজ শেষে নিয়তের আগেই টুপি খুলে ফেলা)
ইহরামের নিয়ত করা: ইহরামের কাপড় পরিধানের পর ইহরামের নিয়ত করতে হবে। যদি উমরার জন্য ইহরাম হয় তাহলে বলবে- ‘লাব্বাইক উমরাতান’। অতঃপর উমরা সহজে সম্পাদনের জন্য ইমাম কুদুরি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি এ দোয়াটি পড়তে বলেন, উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি উরিদুল উমরাতা ফাইয়াসসিরহু লি ওয়া তাকাব্বালহু মিন্নি’। অর্থ: হে আল্লাহ! আমি উমরার ইচ্ছা করছি; আপনি আমার জন্য তা সহজ করে দিন এবং আমার পক্ষ থেকে তা কবুল করুন।’
তালবিয়া পাঠ: ইহরামের মূল বিষয় হচ্ছে হজ বা উমরার নিয়তে তালবিয়া পাঠ। এর মাধ্যমে ইহরাম সম্পন্ন হয়ে যায়। আবদুল্লাহ ইবনে উমরা (রা.) বলেন, ‘আমি রাসুল (সা.)-কে মাথায় সিঁথি করা অবস্থায় ইহরামের তালবিয়া পাঠ করতে দেখেছি। তিনি বলেছেন, এই বাক্যগুলোর অতিরিক্ত কিছু বলেননি।’ (মুসলিম, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৩৭৬)
ইহরাম অবস্থায় নিষিদ্ধ কাজ
✓ পুরুষরা ইহরামের পর তালবিয়া উচ্চৈঃস্বরে পাঠ করবেন আর নারীরা আস্তে পড়বেন। (তিরমিজি, হাদিস: ৯২৭)
✓ ইহরামের জন্য পুরুষদের আলাদা পোশাক আছে, নারীরা যেকোনো রঙের স্বাভাবিক ঢিলেঢালা পোশাক পরবেন। তাদের ইহরামের জন্য ভিন্ন পোশাক নেই।
✓ পুরুষরা বিশেষ চপ্পল পরবেন আর নারীরা জুতা-মোজাও পরতে পারবেন। (ইবনে আবি শায়বা, ১৪৪১৯)
✓ পুরুষের জন্য ইহরাম অবস্থায় মাথা ও চেহারা ঢাকা নিষেধ। আর নারীরা মাথা ঢেকে রাখবেন এবং মুখমণ্ডলে কাপড় লাগাবেন না। তবে ইহরাম অবস্থায়ও নারীদের চেহারার পর্দা জরুরি হওয়ার বিষয়টি হজরত আয়েশা (রা.)-সহ অন্যান্য সাহাবির বক্তব্য ও আমল দ্বারা প্রমাণিত। (ফাতহুল বারি, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ৪০৬)
এক বর্ণনায় আয়েশা (রা.) বলেন, ‘বিদায় হজের সময় আমরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে ইহরাম অবস্থায় ছিলাম। লোকেরা যখন আমাদের পাশ দিয়ে যেত, তখন আমরা আমাদের চাদর মাথা থেকে চেহারার ওপর ঝুলিয়ে দিতাম। আর চলে যাওয়ার পর তা সরিয়ে ফেলতাম।’ (আবু দাউদ, হাদিস: ১৮৩৩)
উমরার জন্য ইহরাম বাঁধার পর যেসব কাজ নিষিদ্ধ হয়ে যায়, সেগুলো তিন ভাগে ভাগ করা যায়—
ক. পুরুষের জন্য নিষিদ্ধ
✓ মাথা এবং মুখমণ্ডল আবৃত করা যাবে না। (বুখারি: ১২৬৫) কান, ঘাড় ও পা ঢাকা যাবে। স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য একান্ত প্রয়োজন হলে ফেস মাস্ক পরা যাবে। (মানাসিক, ১২৩)
✓ সেলাই করা পোশাক পরা যাবে না। (বুখারি, ১৫৪৩; মুসলিম, ১১৭৭) পাঞ্জাবি, জুব্বা, শার্ট-প্যান্ট, গেঞ্জি, পায়জামা, আন্ডারওয়্যার ইত্যাদি পরা যাবে না। তবে ঘড়ি, বেল্ট ও সঙ্গে থাকা ব্যাগ ইত্যাদিতে সেলাই থাকলে সমস্যা নেই। (ইবনে আবি শাইবা, ১৫৬৯৯)
✓ পায়ের পাতার ওপরের অংশ ঢেকে যায় এমন জুতা পরা নিষেধ। (বুখারি, ১৫৪২)
✓ চুল-দাড়ি আঁচড়ানো ও চুলে সিঁথি করা নিষেধ।
খ. নারীর জন্য নিষিদ্ধ
✓ চেহারায় কাপড় লাগানো নিষেধ। (বুখারি, ১৮৩৮) তবে মাথা ঢেকে রাখতে হবে। (মুয়াত্তা মুহাম্মাদ, ৪১৮)
✓ মেহেদি, লিপস্টিকসহ বিভিন্ন সাজসজ্জার প্রসাধনী ঘ্রাণমুক্ত হলেও ব্যবহার করা নিষেধ।
✓ চুলে তেল দেওয়া ও সিঁথি করা নিষেধ। তবে চুল বেঁধে রাখতে পারবেন। আর চুল না আঁচড়ানোর কারণে যদি খুব বেশি অস্বস্তি লাগে কিংবা চুলে জট লেগে যায়, তাহলে সাজসজ্জার নিয়ত ছাড়া প্রয়োজনমতো চুল আঁচড়ানো যাবে।
✓যদি মাসিক স্রাব বা সন্তান প্রসবোত্তর স্রাব অবস্থায় ইহরাম করেন তাহলে তার জন্য শুধু তাওয়াফ করা, নামাজ আদায়, কোরআন তেলাওয়াত ও মসজিদে প্রবেশ করা নিষেধ। এ ছাড়া তিনি উমরার অন্যসব কাজ করতে পারবেন।
লেখক: প্রিন্সিপাল, জামিয়া দারুল উলুম মতিঝিল