পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি আদম সন্তানদের সম্মানিত করেছি, স্থলে ও সামুদ্রিক ভাগে তাদের বাহন দান করেছি এবং উত্তম রিজিক দিয়েছি। আর আমার সৃষ্টির মধ্যে অনেকের ওপর তাদের মর্যাদা দান করেছি’ (সুরা বনি ইসরাইল: ৭০)। আলোচ্য আয়াতে আল্লাহতায়ালা সৃষ্টির সেরা মানবজাতির সম্মান ও উচ্চমর্যাদার কথা ঘোষণা করেছেন। মানুষকে আল্লাহতায়ালা অগণিত নেয়ামত দান করেছেন। যেমন- মানুষের আকার-আকৃতি, মানুষের বাকশক্তি, বিচারবুদ্ধি, বোধশক্তি, লেখার শক্তি, ইঙ্গিতে বোঝানোর শক্তি, সৃষ্টি জগতের ওপর কর্তৃত্ব, বিভিন্ন রকম শিল্প এবং পেশা কৌশল প্রদান করেছেন। তিনি মানুষকে পৃথিবীর সব বস্তুর সঙ্গে মহাকাশের কিছুর যোগসূত্র স্থাপনের তওফিক দান করেছেন- যেন মানুষ বিভিন্নভাবে উপকৃত হতে পারে এবং রিজিকের উপকরণগুলো অর্জিত হতে পারে। তিনি মানুষকে জীবজন্তু থেকে পৃথক এক বিশেষ ব্যবস্থা দিয়েছেন যে, মানুষ হাত দ্বারা ধরে স্বচ্ছন্দে খাদ্যগ্রহণ করতে পারে এবং মানুষকে তিনি মহব্বত, স্নেহ, মমতা, শ্রদ্ধাভক্তি, প্রীতি-ভালোবাসা ইত্যাদি গুণে গুণান্বিত করেছেন- যেন সে আল্লাহপাকের নৈকট্য লাভে ধন্য হতে পারে।
প্রতিটি মানুষ আপন কর্মের দায়ে আবদ্ধ। সবাই যার যার কর্মফল ভোগ করবে। পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘প্রত্যেক ব্যক্তি তার কৃতকর্মের জন্য দায়ী’ (সুরা মুদ্দাসসির: ৩৮)। প্রত্যেককেই তার কর্মের জন্য জবাবদিহি করতে হবে। প্রত্যেককে তার কৃত অন্যায়-অনাচারের জন্য শাস্তি ভোগ করতে হবে সেদিন, যেদিন আত্মীয়স্বজনের আত্মীয়তা, বন্ধুবান্ধবের বন্ধুত্ব কোনো কাজে আসবে না। কেউ কারও কোনো সাহায্য করতে পারবে না। যেমন- অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, সে দিনকে ভয় করো, যে দিন তোমাদের সবাইকে ফিরে যেতে হবে আল্লাহর দরবারে এবং প্রত্যেককে তার আমলের বদলা দেওয়া হবে পরিপূর্ণরূপে। আর তাদের প্রতি সেদিন কোনো প্রকার জুলুম করা হবে না। যদি কেউ অণু পরিমাণও সৎকাজ করে, তবে সে তা দেখতে পাবে। অর্থাৎ নেক আমল যত সামান্যই হোক, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র হোক কিন্তু তার পুরস্কার ক্ষুদ্র হবে না, বরং তা বেশি হবে এবং দেখা যাবে। আর যে কেউ অণু পরিমাণ অন্যায় কাজ করবে, তাও সে দেখতে পাবে।
আসলে পৃথিবীতে সুখী হওয়ার জন্য খুব বেশি আয়োজনের দরকার নেই। মহান আল্লাহ মানবজাতির জন্য যে গাইডবুক দিয়েছেন, সেখানে সব বলে দেওয়া হয়েছে। দয়াময় আল্লাহ সার্থক জীবনের তিনটি মন্ত্র জানিয়ে দিয়েছেন অতি সংক্ষেপে। পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘যারা আল্লাহর কিতাব পাঠ করে, নামাজ কায়েম করে এবং আমি যা দিয়েছি তা থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে- তারা এমন লভ্যাংশ লাভ করবে, যাতে কখনো লোকসান হবে না’ (সুরা ফাতির : ২৯)।
এ আয়াতে জীবনকে সার্থক করার তিনটি কর্মসূচি প্রদান করা হয়েছে। এ তিন কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে আখেরাতের ব্যবসায়ে সাফল্য লাভের সুনিশ্চিত আশা রয়েছে। যথা- ১. কোরআনুল কারিমের তেলাওয়াত, যা সব নফল ইবাদতের মধ্যে উত্তম এবং আল্লাহতায়ালার নৈকট্য লাভের মাধ্যম ও তাঁর সঙ্গে কথোপকথনের এক অপূর্ব সুযোগ। ২. সঠিকভাবে যথানিয়মে নামাজ আদায় করা। কেননা এটি দ্বীন ইসলামের অন্যতম খুঁটি এবং দৈহিক ইবাদতের ভিত্তি। সৃষ্টি জগতের ইবাদতের এটি একটি সমন্বিত রূপ। ৩. আল্লাহর পথে গোপনে ও প্রকাশ্যে দান করা। এতে সব আর্থিক ইবাদত অন্তর্ভুক্ত। যারা এই তিনটি কর্মসূচি গ্রহণ করবে এবং সঠিকভাবে এর বাস্তবায়ন করবে, আশা করা যায় তাদের আখেরাতের ব্যবসায়ে কণামাত্রও ক্ষতি হবে না। যারা অন্তর, রসনা, অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও সম্পদের মাধ্যমে আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টি লাভের সাধনা করে, তাদের জীবনসাধনা কখনো ব্যর্থ হবে না, তাদের সাফল্য সুনিশ্চিত।
লেখক: ইসলামি কলামিস্ট, মজলিশপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া