ইসলামি শরিয়তের পাঁচটি মূল ভিত্তির (আরকান আল-ইসলাম) অন্যতম জাকাত কেবল একটি ঐচ্ছিক দান নয়, বরং এটি একটি অপরিহার্য স্তম্ভ (ফরজে আইন)। পবিত্র কোরআনে সালাতের (নামাজ) পাশাপাশি বহু স্থানে জাকাত আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা এর গুরুত্বকে প্রশ্নাতীত করে তোলে। জাকাত আদায় করা পরিপূর্ণ ঈমানের পরিচায়ক এবং এটি সম্পদের পবিত্রতা নিশ্চিত করে সমাজের অর্থনৈতিক কাঠামোতে ধনীদের দায়িত্ববোধ জাগ্রত করে। এই বিধানের মূল লক্ষ্য হলো ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে সামাজিক সেতুবন্ধন তৈরি করা, সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা এবং দারিদ্র্য দূর করা।
আরবিতে ‘জাকাত’ শব্দের মূল অর্থ দুটি- পবিত্রতা (তাতহির) এবং বৃদ্ধি বা পরিশুদ্ধতা (তাজকিয়াহ)। জাকাত দেওয়ার মাধ্যমে সম্পদ অপবিত্রতা (লোভ, কৃপণতা) থেকে পরিশুদ্ধ হয় এবং আল্লাহ তাতে বরকত দান করে। সুরা তাওবার ১০৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহতায়ালা রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে নির্দেশ দেন, ‘তাদের সম্পদ থেকে সদাকা নাও। এর মাধ্যমে তাদেরকে তুমি পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করবে। আর তাদের জন্য দোয়া করো, নিশ্চয় তোমার দোয়া তাদের জন্য প্রশান্তিকর। আর আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।’ জাকাতসহ আল্লাহর দেওয়া সব বিধান নিয়ে যারা তুচ্ছতাচ্ছিল্য করবে তারা কাফির হয়ে যাবে।
জাকাত গ্রহণকারীকে সমাজের নিকৃষ্ট ব্যক্তি বলে অভিহিত করার বিরুদ্ধে মহান আল্লাহতায়ালা সুরা নিসার ১৪০ নম্বর আয়াতে বলেন, ‘আর তিনি তো কিতাবে তোমাদের প্রতি নাজিল করেছেন যে, যখন তোমরা শুনবে আল্লাহর আয়াতগুলো অস্বীকার করা হচ্ছে এবং সেগুলো নিয়ে উপহাস করা হচ্ছে, তাহলে তোমরা তাদের সঙ্গে বসবে না, যতক্ষণ না তারা অন্য কথায় নিবিষ্ট হয়, তা না হলে তোমরাও তাদের মতো হয়ে যাবে। নিশ্চয় আল্লাহ মুনাফিক ও কাফিরদের সবাইকে জাহান্নামে একত্রকারী।’জাকাত ইসলামের এমন এক অকাট্য ও সর্বজনবিদিত বিধান (দারুরিয়্যাত আল-দিন) যে, যে ব্যক্তি এর ফরজ হওয়াকে অস্বীকার করে, সে ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যায়।
আইনি পরিণতি: মুসলিম শাসকের দায়িত্ব হলো, অস্বীকারকারীকে তওবা করার আহ্বান জানানো। যদি সে তার কুফরি অবস্থানে অনড় থাকে এবং জাকাতকে ফরজ হিসেবে অস্বীকার করে, তবে তাকে কুফরির দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তবে নতুন মুসলিম বা ইসলামি জ্ঞান থেকে দূরে অবস্থানকারী অজ্ঞ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে প্রথমে অবকাশ দেওয়া হবে।
যে ব্যক্তি জাকাত ফরজ হওয়াকে অস্বীকার করে না, কিন্তু শুধু কৃপণতা বা আলস্যের কারণে তা দেয় না, সে ইসলাম থেকে খারিজ হয় না, তবে সে গুরুতর পাপী হিসেবে বিবেচিত।
আইনি পরিণতি: এই ক্ষেত্রে মুসলিম শাসকের দায়িত্ব হলো কঠোরভাবে তার থেকে জোরপূর্বক জাকাত আদায় করা এবং তাকে তিরস্কার করা ও শাস্তি দেওয়া। জাকাতকে একটি বাধ্যতামূলক রাষ্ট্রীয় আইন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্যই শাসকের পক্ষ থেকে এই ধরনের কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়।
যারা কার্পণ্যবশত জাকাত দিতে অস্বীকার করে তাদের বিরুদ্ধে শাসক কেবল জোরপূর্বক জাকাত আদায় করবেন না, বরং তাকে অতিরিক্ত দণ্ড দেওয়ারও ক্ষমতা রাখেন। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বাণী অনুসারে, শাস্তির একটি উদাহরণ হলো, জাকাত আদায় শেষে শাস্তিস্বরূপ তার অবশিষ্ট সম্পদের অর্ধেক বাজেয়াপ্ত করা হবে। এই বিধানের মাধ্যমে শাসকের প্রতি আল্লাহতায়ালা এই ক্ষমতা অর্পণ করেছেন। আলিমদের মতে, এই শাস্তি শুধু সেই সম্পদের ওপর প্রযোজ্য হবে, যে সম্পদের জাকাত কৃপণতাবশত দেওয়া হয়নি।
যারা জাকাত ফরজ হওয়াকে অস্বীকার না করা কার্পণ্যবশত বা আলস্যের কারণে তা দেয় না, তাদের জন্য পরকালে সুনির্দিষ্ট ও ভয়াবহ শাস্তির সতর্কবাণী রয়েছে।
১. গলায় বেড়ি (তাওক্ব): আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যাতে তারা কৃপণতা করবে কিয়ামতের দিন তা-ই তাদের গলায় বেড়ি হবে।’ (সুরা আলে ইমরান, ১৮০)
ইহকালে যে সম্পদকে তারা নিরাপত্তার উৎস মনে করত, কিয়ামতের দিন সেই সম্পদই তাদের জন্য বোঝা ও শাস্তির উপকরণ হয়ে দাঁড়াবে। ২. আগুনের পাত (সাফা-ইহ মিন নার): যারা সোনা ও রুপা পুঞ্জীভূত করে রাখে এবং তার জাকাত আদায় করে না, তাদের জন্য মর্মন্তুদ আজাবের ঘোষণা এসেছে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘সেদিন জাহান্নামের আগুনে তা গরম করা হবে, অতঃপর তা দ্বারা তাদের কপালে, পার্শ্বে এবং পিঠে সেক দেওয়া হবে।’ (সুরা আত-তাওবাহ, ৩৪-৩৫)
এই শাস্তি চলতে থাকবে এমন একদিনে, যার পরিমাণ দুনিয়ার ৫০ হাজার বছরের সমান। ৩. বিষধর সাপে রূপান্তর (শুজাআন আকরা): রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, জাকাত অনাদায়ী সম্পদকে কিয়ামতের দিন টেকো মাথা বিশিষ্ট বিষধর সাপের আকৃতি (শুজাআন আকরা) দান করা হবে। এই সাপটি তার গলায় মালা পরিয়ে দেওয়া হবে এবং তা তার উভয় চোয়াল কামড় দিয়ে বলতে থাকবে, ‘আমি তোমার সম্পদ, আমি তোমার পুঞ্জীভূত সম্পদ।’ (সহিহ বুখারি, ১৪০৩)
লেখক: প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক