শরিয়া আইন মূলত কী? কোরআন ও সুন্নাহ নির্দেশিত তথা ইসলামি আইনকানুনের সমষ্টিই হচ্ছে শরিয়া আইন। তবে শরিয়া আইন বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন ইসলামি শাসন ব্যবস্থা। এ ছাড়া যে কেউ চাইলেই শরিয়া আইন বাস্তবায়ন বা প্রয়োগ করতে পারবেন না। প্রায় সব সমাজেই প্রত্যক্ষভাবে শরিয়া আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা না হলেও; পরোক্ষভাবে প্রত্যেক মুসলমানই কোনো না কোনোভাবে শরিয়া আইনের মধ্যেই জীবনযাপন করছেন। যেমন—নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত প্রভৃতি ইবাদতের বাস্তব অনুশীলন করার জন্য প্রত্যেকেই কোনো একজন আলেমের শরণাপন্ন হন। আর এভাবেই পরোক্ষভাবে প্রত্যেকেই একজন শরিয়া আইন উপদেষ্টার প্রতি মুখাপেক্ষী। আর এ কাজটি যে বা যারা করেন; তারাই হচ্ছেন, আলেম সমাজ।
অতএব, আমরা বলতে পারি—বাস্তবে কোরআন সুন্নাহতে পারদর্শী ও যোগ্যতা সম্পন্ন প্রত্যেক আলেমই একজন শরিয়া আইন উপদেষ্টা!
হাদিসে এসেছে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আলেমরা হচ্ছেন, নবিদের ওয়ারিশ বা উত্তরাধিকার। আর নবিরা কোনো দিনার বা দিরহাম (অর্থাৎ অর্থ-সম্পদ) মিরাসরূপে রেখে যান না; তারা উত্তরাধিকার সূত্রে রেখে যান শুধু ইলম। সুতরাং যে ইলম অর্জন করেছে সে পূর্ণ অংশগ্রহণ করেছে। (আবু দাউদ, ৩৬৪৩)
প্রশ্ন হচ্ছে, আলেম বা আলিম বলতে সাধারণত কী বোঝানো হয়? কিংবা আলেম বলতে স্বাভাবিকভাবে প্রচলিত অর্থে কাদের উদ্দেশ করা হয়? এজন্য প্রথমেই আমাদের জানতে হবে, এ ‘আলেম’ শব্দটির অর্থ কী। এটি কী অর্থে ব্যবহার হয়ে আসছে। তবে এ কথা নিশ্চিত যে ‘আলেম’ একটি আরবি শব্দ। আরবি অভিধান মতে বাংলায় যার অর্থ হচ্ছে—জ্ঞানী-বিজ্ঞানী বিদ্বান ও পণ্ডিত। আর বাংলা একাডেমির ভাষ্য মতে; ১. ইসলাম ধর্মতত্ত্বজ্ঞ। ২. বিদ্বান। অর্থাৎ যার মধ্যে প্রচুর জ্ঞান রয়েছে, এমন ব্যক্তি। বিশেষ করে যিনি ইসলাম বিষয়ে খুব ভালো জানেন। অনেক বেশি জানাশোনা আছে এমন ব্যক্তি ইত্যাদি। তবে আরবি পরিভাষায় ‘আলেম’ শব্দটি বাংলায় জ্ঞানী-বিদ্বান প্রভৃতি অর্থ হলেও; প্রচলিত অর্থে যেকোনো জ্ঞান-বিজ্ঞানে পারদর্শী ব্যক্তিকেই ব্যাপকভাবে আলেম বা জ্ঞানী-বিজ্ঞানী পণ্ডিত বলা হয় না। বলা যায়ও না। মনে করাও হয় না কখনো।
এজন্য সব জ্ঞানী-বিজ্ঞানী যেমন আলেম নন। তেমনি সব আলেমও বাস্তবিক অর্থেই পণ্ডিত বা বিদ্বান ও জ্ঞানী হতে হবে এমনটিও জরুরি নয়। একসময় মানুষ ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত বিদ্বানদের মোল্লা, মৌলবি, মুনশি, মৌলানা বলতেন। অভিধানে যথাক্রমে এগুলো পরিপূর্ণ জ্ঞানবিশিষ্ট মহাপণ্ডিত ব্যক্তি। (যথা—মোল্লা আলি কারি, মোল্লা জামি); মুসলিম পণ্ডিত। লেখক-বিদ্বান। ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ বা পণ্ডিত অর্থে ব্যবহার হতো। আর এখন যেমন বলা হয় মাওলানা। মানে আমাদের অভিভাবক, বন্ধু বা নেতা। সত্যিকারার্থে একজন বিজ্ঞ আলেম বা মাওলানা আমাদের পরম কল্যাণকামী উপকারী বন্ধু বা অভিভাবক। এ কথা কেউই অস্বীকার করতে পারবেন না।
এজন্যই কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, আপনি বলুন! যারা জানে আর যারা জানে না; তারা কী কখনো সমান হতে পারে? (সুরা জুমার, ৯)। উপর্যুক্ত আলোচনার আলোকে এ কথা বলা অতিশয়োক্তি হবে না যে, ইসলাম বিষয়ে তথা কোরআন, হাদিস, ফিকহ, তাফসির প্রভৃতি শাস্ত্রে জ্ঞান অর্জনকারীরাই একমাত্র ইসলাম বিষয়ে বিশেষজ্ঞ বা পণ্ডিত, জ্ঞানী ও আলেম। যাদের আমরা এখন সহজে একাডেমিক শিক্ষা সমাপনকারী আলেম বা মাওলানা বলি। হোক সেটা সরকারি মাদরাসা থেকে কামিল পাস কিংবা দরসে নিজামির দাওরা হাদিস সমাপ্তি করে। বর্তমানে এই দুই শ্রেণির শিক্ষা সমাপনকারীরাই প্রচলিত অর্থে আলেম তথা ধর্মীয় বিষয়ে জ্ঞানী বা পণ্ডিত তুল্য। এর বাইরেও দেশে-বিদেশে ইসলাম বিষয়ে উচ্চশিক্ষা অর্জন করার মাধ্যমেও যে কেউ আলেম হতে পারেন। তবে এক্ষেত্রে সবাই সব বিষয়ে সমান পারদর্শী না হওয়াটাও স্বাভাবিক।
আত্মশুদ্ধি ও নৈতিকতা সম্পন্ন সুশিক্ষা নিশ্চিত করার মাধ্যমে যাবতীয় দুর্নীতি ও অন্যায়, অনাচার, অবিচারমুক্ত সমাজ ও রাষ্ট্র গঠন করা যতটা সহজ এবং সম্ভাবনাময়। তেমনি খুন-খারাবি, লুটপাট, চুরি, ডাকাতি, গুম, ধর্ষণ ও মাদকমুক্ত আদর্শ সমাজ গড়ে তোলাও একটি সুন্দর ও সুশৃঙ্খল জীবন ব্যবস্থার জন্য জরুরি। আর এ কাজগুলো পরোক্ষভাবে আলেমরাই করে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত। যারা প্রত্যেকেই শরিয়া আইন উপদেষ্টার ভূমিকা পালন করছেন। আর শরিয়া আইন উপদেষ্টা আলেমদের কর্ম বক্তব্য ও উপদেশগুলোও আদর্শ জাতি গঠনের অন্যতম মৌলিক উপাদানও বটে। এজন্য এ কথা আজ ধ্রুব সত্য যে, আলেমদের হাত ধরেই আসতে পারে প্রকৃত সুখ ও শান্তি সমৃদ্ধ দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ।
লেখক: খতিব, ভবানীপুর মাইজপাড়া হক্কানি জামে মসজিদ, গাজীপুর