মাহে রমজানের পবিত্রতা ও ফজিলত বড়-ছোট সবার জন্যই সমান। যদিও শরিয়তের দৃষ্টিতে শিশুরা সিয়াম পালনে ‘মুকাল্লাফ’ বা বাধ্যতামূলক দায়িত্বপ্রাপ্ত নয়, কিন্তু শৈশব থেকেই ইবাদতের প্রতি অনুরাগ সৃষ্টি করা প্রতিটি মুসলিম পিতামাতার নৈতিক দায়িত্ব। সন্তানকে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার প্রথম পাঠ শুরু হয় ঘর থেকেই। নামাজ ও রোজার প্রশিক্ষণ শৈশবে সম্পন্ন হলে বড় হয়ে ইবাদত পালন তাদের জন্য সহজ ও আনন্দময় হয়ে ওঠে।
নির্দেশ ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধন
রাসুলুল্লাহ (সা.) সন্তানদের ৭ বছর বয়স থেকে নামাজের আদেশ দিতে এবং ১০ বছর বয়স থেকে শাসন করার নির্দেশ দিয়েছেন। রোজার ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। সাহাবায়ে কেরাম (রা.) তাদের সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই রোজা রাখাতেন। রুবাই বিনতে মুআওয়িয (রা.) বর্ণনা করেন, তারা শিশুদের রোজার দিনে মসজিদে নিয়ে যেতেন এবং ক্ষুধার তাড়নায় কাঁদলে পশমের খেলনা দিয়ে ইফতার পর্যন্ত ভুলিয়ে রাখতেন। হজরত ওমর (রা.) একবার এক মদ্যপকে শাসন করে বলেছিলেন, ‘আফসোস! আমাদের ছোট শিশুরা পর্যন্ত রোজাদার, আর তুমি সুস্থ-সবল হয়েও রোজা রাখছ না!’
প্রশিক্ষণের ১০টি কার্যকর কৌশল
শিশুদের শারীরিক সক্ষমতা ও বয়স বিবেচনা করে ১০ বছর বয়স থেকেই তাদের নিয়মিত রোজায় অভ্যস্ত করা যেতে পারে। এ জন্য নিচের কৌশলগুলো অবলম্বন করা যেতে পারে:
১. ফজিলত বর্ণনা: শিশুদের সামনে রোজার সওয়াব ও জান্নাতের ‘আর-রাইয়্যান’ নামক বিশেষ দরজার গল্প বলুন, যা কেবল রোজাদারদের জন্য।
২. প্রস্তুতিমূলক রোজা: রমজান আসার আগে শাবান মাসে দু-একটি রোজা রাখিয়ে তাদের মানসিক ও শারীরিক প্রস্তুতি নিতে সাহায্য করুন।
৩. ধাপে ধাপে অভ্যাস: শুরুতে দিনের কিছু অংশ রোজা রাখান, পরে ধীরে ধীরে সময় বাড়িয়ে পূর্ণ রোজার দিকে নিয়ে যান।
৪. বিলম্বিত সেহরি: একদম শেষ সময়ে সেহরি খাওয়ালে শিশুদের জন্য সারা দিন ক্ষুধা সহ্য করা সহজ হয়।
৫. পুরস্কার ও স্বীকৃতি: প্রতিদিন বা সপ্তাহ শেষে শিশু রোজা রাখলে তাকে সাধ্যমতো উপহার দিন।
৬. সর্বজনীন প্রশংসা: ইফতার ও সেহরির সময় পরিবারের সবার সামনে শিশুর প্রশংসা করুন। এতে তার মানসিক প্রশান্তি ও উৎসাহ বাড়বে।
৭. স্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা: একাধিক শিশু থাকলে তাদের মধ্যে ইবাদতের প্রতিযোগিতা তৈরি করুন, তবে খেয়াল রাখবেন কেউ যেন হতাশ না হয়।
৮. মনোযোগ অন্যদিকে রাখা: ক্ষুধা লাগলে তাকে ঘুম পাড়িয়ে দিন অথবা হালকা কোনো খেলা বা শিক্ষামূলক কার্টুন/অনুষ্ঠান দেখতে দিন যেন পরিশ্রম কম হয়।
৯. মসজিদের সান্নিধ্য: বিশেষ করে আসরের পর বাবাকে সঙ্গে নিয়ে মসজিদে যাওয়া এবং কোরআন তেলাওয়াত ও জিকিরে সময় কাটানো শিশুদের ইবাদতমুখী করে।
১০. উৎসাহমূলক পরিবেশ: যেসব পরিবারে শিশুরা রোজা রাখে, তাদের সঙ্গে ভাববিনিময় বা বেড়াতে যাওয়ার ব্যবস্থা করুন। ইফতারে শিশুর পছন্দের খাবার ও পানীয় রাখুন।
অভিভাবকদের প্রতি বিশেষ সতর্কতা
ইসলামিক শরিয়ত অত্যন্ত সহজ ও ভারসাম্যপূর্ণ। শিশু যদি ক্ষুধার্ত হয়ে খুব বেশি অসুস্থ বোধ করে বা অতিরিক্ত কষ্ট পায়, তবে তাকে রোজা পূর্ণ করতে বাধ্য করবেন না। মনে রাখবেন, শিশুটি এখনো ‘মুকাল্লাফ’ নয়। জোর করলে তার মনে ইবাদতের প্রতি অনীহা তৈরি হতে পারে অথবা সে লুকিয়ে খাওয়ার মতো মিথ্যাচারের আশ্রয় নিতে পারে। ভালোবাসা ও অনুপ্রেরণাই হোক শিশুকে মহান রবের আনুগত্য শেখানোর প্রধান মাধ্যম।
আজকের শিশুই আগামীর ভবিষ্যৎ। তাদের হৃদয়ে ছোটবেলা থেকেই আল্লাহভীতি ও ইবাদতের মহিমা গেঁথে দিলে তারা বড় হয়ে সুন্দর সমাজের একনিষ্ঠ কারিগর হবে। এবারের রমজান হোক আমাদের সন্তানদের ইবাদতের প্রথম পাঠশালা।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক