ডায়াবেটিস একটি দীর্ঘমেয়াদি বিপাকীয় (metabolic) রোগ, যেখানে রক্তে শর্করার (গ্লুকোজ) মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকে। মানুষের শরীরে অগ্ন্যাশয় থেকে ইনসুলিন নামক হরমোন নিঃসৃত হয়, যা রক্তের গ্লুকোজকে কোষে প্রবেশ করিয়ে শক্তিতে রূপান্তর করে। যখন ইনসুলিন যথেষ্ট তৈরি হয় না, অথবা শরীর ইনসুলিনকে ঠিকমতো ব্যবহার করতে পারে না—তখনই ডায়াবেটিস হয়।
ডায়াবেটিস একদিনে হয় না; ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের চূড়ান্ত প্রকাশ এই রোগ। প্রথমে শরীর ইনসুলিন বৃদ্ধি করে গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। কিন্তু এক সময় ইনসুলিন এত বেশি হয়ে যায় যে, কোষ আর সাড়া দেয় না। গ্লুকোজ তখন রক্তে থেকে যায়, আর আমরা দেখি চিনি বেড়ে গেছে। আসলে তা নয় বরং চিনি আটকে গেছে। প্রতিটি খাবারের পর ইনসুলিন বাড়ে এবং দিনে পাঁচ থেকে ছয়বার খাওয়া মানে ইনসুলিন সারাক্ষণ কাজ করছে। এই ক্রমাগত চাপের ফলে প্যানক্রিয়াস ক্লান্ত হয়ে পড়ে, শুরু হয় ডায়াবেটিসের যাত্রা।
কেন ডায়াবেটিস হয়? ডায়াবেটিসের প্রধান কারণগুলো হলো—অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতা, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, বংশগত কারণ এবং হরমোনের ভারসাম্যহীনতা।
World Health Organization (WHO)-এর মতে, বিশ্বে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে এবং এটি অকালমৃত্যুর অন্যতম কারণ। দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণহীন থাকলে ডায়াবেটিস থেকে হৃদরোগ, কিডনি বিকল, অন্ধত্ব ও স্নায়ু ক্ষতির মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে।
ডায়াবেটিস কত প্রকার? টাইপ-১ ডায়াবেটিস, টাইপ-২ ডায়াবেটিস এবং গর্ভকালীন ডায়াবেটিস (Gestational Diabetes)। নোট—International Diabetes Federation জানায়, টাইপ-২ ডায়াবেটিস মোট রোগীর প্রায় ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়।
সঠিক নিয়মে রোজা পালন করলে বিশেষ করে টাইপ-২ ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। নিচে পয়েন্ট আকারে বিষয়গুলো তুলে ধরা হলো—
১. ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বৃদ্ধি: রোজার সময় দীর্ঘক্ষণ খাবার না খাওয়ায় রক্তে ইনসুলিনের মাত্রা কমে। এতে শরীর ইনসুলিনের প্রতি বেশি সংবেদনশীল হয়। Journal of Translational Medicine-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়ন্ত্রিত উপবাস ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স কমাতে সহায়তা করে।
২. ওজন কমানো: অতিরিক্ত ওজন টাইপ-২ ডায়াবেটিসের প্রধান কারণ। রোজা ক্যালরি নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে, ফলে শরীরের চর্বি কমে এবং রক্তে শর্করার মাত্রা উন্নত হয়।
৩. লিভারে গ্লুকোজ উৎপাদন কমানো: উপবাসের সময় শরীর জমে থাকা গ্লাইকোজেন ব্যবহার করে। এতে লিভারের অতিরিক্ত গ্লুকোজ উৎপাদন কমে, যা রক্তে শর্করার ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।
৪. খাদ্যাভ্যাসে শৃঙ্খলা আনা: রোজা মানুষকে নির্দিষ্ট সময়ে খাবার খেতে শেখায়। অতিরিক্ত স্ন্যাকস বা অপ্রয়োজনীয় মিষ্টিজাতীয় খাবার কমে যায়। American Diabetes Association উল্লেখ করে যে, নিয়মিত ও নিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের অন্যতম মূল চাবিকাঠি।
৫. মানসিক চাপ কমানো: মানসিক চাপ রক্তে শর্করা বাড়ায়। রোজা আত্মসংযম ও আধ্যাত্মিক প্রশান্তি দেয়, যা স্ট্রেস হরমোন (কর্টিসল) কমাতে সহায়ক হতে পারে।
টাইপ-১ ডায়াবেটিস বা ইনসুলিননির্ভর রোগীদের রোজা রাখার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। সাহরি ও ইফতারে সুষম খাদ্য, পর্যাপ্ত পানি ও নিয়মিত গ্লুকোজ মনিটরিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডায়াবেটিস একটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য রোগ, যদি সচেতনতা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা যায়। রোজা সঠিক পদ্ধতিতে পালন করলে বিশেষ করে টাইপ-২ ডায়াবেটিসে ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বাড়ানো, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং খাদ্যাভ্যাসে শৃঙ্খলা আনার মাধ্যমে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে মনে রাখতে হবে—রোজা চিকিৎসার বিকল্প নয়; বরং সঠিক চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের সহায়ক একটি হালাল পদ্ধতি।
লেখক: আলেম, গবেষক ও সাংবাদিক