উপমহাদেশের প্রথম হাদিস চর্চাকেন্দ্র নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে। এ হাদিস চর্চাকেন্দ্রের নাম সোনারগাঁ ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়। বাংলাদেশের প্রথম ও প্রাচীনতম উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল এটি। সোনারগাঁয়ে ইসায়ি ১৩ শতাব্দীতে এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। শেখ শরফ উদ্-দীন আবু তাওয়ামা বুখারি আদ-দেহলভি আল হানাফি (রহ.)। তিনি ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে আনুমানিক ১২৭৭ খ্রিষ্টাব্দে সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবনের শাসনকালে (১২৬৬-৮৭) তিনি দিল্লিতে পৌঁছান এবং সেখান থেকে বাংলায় আসেন। জ্ঞানতাপস শেখ শরফ উদ্-দীন আবু তাওয়ামার নেতৃত্বে সে সময়ের বাংলার রাজধানী সোনারগাঁ ইসলামি শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রে পরিণত হয়। সোনারগাঁয়ে আবু তাওয়ামা তার খানকাহ ও একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। এখানে ইসলামি ধর্মতত্ত্ব ও বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় শিক্ষাদান করা হতো। অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই জ্ঞানতাপস শরফ উদ্-দীনের নিষ্ঠায় এর খ্যাতি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।
শেখ শরফ উদ্-দীন আবু তাওয়ামা একজন নামজাদা সমাজ সংস্কারক, আলেম, শিক্ষাবিদ এবং ইসলামি আইনবিদ। তার হাতেই বাংলার জমিনে স্থাপিত হয় উপমহাদেশের প্রথম এ হাদিস চর্চা কেন্দ্রটি। গিয়াসউদ্দিন আজম শাহর সহযোগিতায় তিনি ওই সময়ে এ হাদিস চর্চা প্রতিষ্ঠা করেন। উপমহাদেশের দূর-দূরান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা এখানে জ্ঞানার্জনের জন্য ছুটে আসত। একসময় এ শিক্ষাকেন্দ্রে শিক্ষার্থীর সংখ্যা দাঁড়ায় ১০ হাজারে। শেখ শরফ উদ্-দীন আবু তাওয়ামা দীর্ঘ ২৩ বছর এই সোনারগাঁয়ে অধ্যাপনা করেন।
সোনারগাঁয়ে প্রতিষ্ঠিত ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য তিনি উপমহাদেশের ধর্মীয় ইতিহাসে কালজয়ী হয়ে থাকবেন। শেখ আবু তাওয়ামা (রহ.) ৭০০ হিজরি মোতাবেক ১৩০০ খ্রিষ্টাব্দে সোনারগাঁয়ে ইন্তেকাল করেন এবং বাংলার মাটিতেই তাকে দাফন করা হয়। বর্তমানে মহান এ ধর্ম প্রচারকের মাজারটি সোনারগাঁয়ের দরগাবাড়ি গেলে দেখা যায়। পাশাপাশি ছয়টি মাজারের মধ্যে সবুজ রং করা মাজারটি শায়েখের। প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে মাজার দেখতে আসেন শিক্ষানুরাগী ও শায়খের ভক্তরা। তার কবরের পাশে হজরত ইব্রাহীম দানেশমান্দ (রহ.)-সহ অন্য বুজুর্গদের কবর রয়েছে। তবে বর্তমানে সংরক্ষণের অভাবে উপমহাদেশের প্রাচীনতম দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্মৃতিচিহ্নগুলো আজ হারিয়ে যাওয়ার দ্বারপ্রান্তে। তার মৃত্যুর পর ধীরে ধীরে জ্ঞানকেন্দ্রটিও বন্ধ হয়ে যায়।
শেখ শরফ উদ্-দীন আবু তাওয়ামার মৃত্যুর পর বিদ্যাপীঠের পরিচালক হন শায়খ শরফুদ্দিন ইয়াহইয়া মানেরি। তিনি ছিলেন শেখ শরফ উদ্-দীন আবু তাওয়ামার প্রকৃত ভাবশিষ্য এবং তার আধ্যাত্মিক সাধনা ও জ্ঞানতত্ত্বে পরিপক্বতা দেখে শেখ তার কাছে কন্যাদান করেছিলেন। শেখ আবু তাওয়ামার নির্দেশনায় তিনি আধ্যাত্মিক দীক্ষাদানের অনুমতির জন্য গিয়েছিলেন ওলিকূল-শিরোমণি নিজামুদ্দিন আউলিয়ার সান্নিধ্যে। নিজামুদ্দিন আউলিয়া তার সঙ্গে কতগুলো জটিল ধর্মতাত্ত্বিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। তার যথার্থ ও বিশদ বিশ্লেষণী উপস্থাপন নিজামুদ্দিন আউলিয়াকে এতটাই প্রীত করে যে, তিনি তার সম্মানে এক থাল পান পেশ করেন। যা ভারতীয় সুফিদের ইতিহাসে অনুপম নজিরবিহীন।
প্রাচীনকালে নির্মিত এ হাদিস চর্চাকেন্দ্র ইসলামি পাঠাগারটির ধর্মীয় কোনো কার্যক্রম নেই, রয়েছে শুধু একটি জরাজীর্ণ ভবন ও তার কিছু ধ্বংসাবশেষ। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় জরাজীর্ণ ভবনটির অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে স্থানীয়রা প্রাচীন এ হাদিস চর্চাকেন্দ্র ইসলামি পাঠাগারটিকে আন্ধারকোঠা নামে অভিহিত করেন। ভবনটির মাটির ভেতরে নিচের মেঝেতে কোনো রকম আলো-বাতাস প্রবেশ না করায় স্থানীয়রা সবাই জরাজীর্ণ এ ভবনটিকে এখন আন্ধারকোঠা নামেই চেনে। দুঃখজনক হলেও সত্য, একদিন সোনারগাঁ থেকে ছড়িয়ে পড়া ইলমে নববির যে আলোক শিখা সমগ্র উপমহাদেশকে আলোকিত করেছিল, অযত্ন-অবহেলায় আজ তার শেষ স্মৃতি চিহ্নটুকু হাদিস চর্চাকেন্দ্র ইসলামি পাঠাগারটি বিলীন হওয়ার পথে।
গবেষক ও মাদরাসাতুশ শরফ আল ইসলামিয়া মহতামিম আল্লামা মুফতি ওবায়েদুল কাদের নদভী বলেন, ইসলামি দার্শনিক ও চিন্তাবিদ সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নদভী (রহ.) হিন্দুস্তান থেকে সোনারগাঁয়ে এসে শেখ শরফ উদ্-দীন আবু তাওয়ামার কবর জিয়ারত ও মোনাজাত করেন। মাজার থেকে অল্প দূরে ভাগলপুর এলাকায় শেখ শরফ উদ্-দীনের স্মৃতি রক্ষার্থে ‘মাদরাসাতুশ শরফ আল ইসলামিয়া’ নামে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালু করেন, যা বর্তমানে সোনারগাঁয়ে ইসলামি শিক্ষার জ্যোতি ছড়াচ্ছে। এটা শুধু বাংলাদেশের জন্য সমগ্র মুসলিম দুনিয়ার গর্ব ও গৌরবের স্থান। এটির সংরক্ষণে রাষ্ট্রীয়ভাবে উদ্যোগ নেওয়ার ধর্মপ্রাণ মানুষের দাবি।
ভাটিবন্দর মিফতাহুল উলুম কওমী মাদরাসার মহতামিম মুফতি মাওলানা মুহাম্মদ উল্লাহ বলেন, শেখ শরফ উদ্-দীন আবু তাওয়ামা (রহ.)-এর প্রতিষ্ঠিত মাদরাসাটি ছিল উপমহাদেশে ইলমে হাদিসের সর্বপ্রথম ও সর্ববৃহৎ বিদ্যাপীঠ। সোনারগাঁয়ের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ কমিটির আহ্বায়ক কবি শাহেদ কায়েস বলেন, সোনারগাঁয়ের মোগরাপাড়া এলাকায় আনুমানিক ১২৭৮ খ্রিষ্টাব্দে উজবেকিস্তান থেকে আগত ইসলামি চিন্তাবিদ শেখ শরফ উদ্-দীন আবু তাওয়ামা একটি হাদিস চর্চাকেন্দ্র গড়ে তুলেছিলেন। ওই সময় দেশ-বিদেশে এটির ব্যাপক পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ে। এ চর্চাকেন্দ্রটির পাশেই ছিল একটি সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার। বর্তমানে এর ধ্বংসাবশেষ টিকে রয়েছে। অবিলম্বে এ গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নসম্পদটি সংস্কার ও সুরক্ষার দাবি জানান তিনি।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগীয় আঞ্চলিক পরিচালক আফরোজা খান মিতা জানান, মোগরাপাড়া ইউনিয়নের ষোলপাড়ায় শেখ শরফ উদ্-দীন আবু তাওয়ামার মাজার ও ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতাধীন করার পরিকল্পনা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে হাতে নেওয়া হবে।
সোনারগাঁয়ে মোগরাপাড়া ইউনিয়নের দরগাবাড়ি এলাকায় এখনো পর্যটকরা ভিড় করেন মাজার জিয়ারতে পয়গম্বরদের আস্তানায়, জানাযায় হজরত (শাহ), হজরত দানেশ মান্দ (র), হজরত মুন্না (শাহ)-এর সমাধিও রয়েছে, পাশে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন পুকুর ঘাট, বকুল গাছ, অমৃত ফল গাছ, সফেদা ফল গাছ, আম গাছ, বেল গাছ, চন্দন গাছ, জামরুল গাছ, জাম্বুরা গাছ, কাঁঠাল গাছ দৃষ্টি কাড়ছে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের।
শেখ শরফ উদ্-দীন আবু তাওয়ামা (রহ.)-এর মাজার অর্থাৎ দরগাবাড়ি আসতে হলে প্রথমে আপনাকে গুলিস্তান থেকে স্বদেশ ও দোয়েল সিটিং বাসে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সোনারগাঁয়ের মোগরাপাড়া চৌরাস্তা বাসস্ট্যান্ডে আসতে হবে। পরে সোনারগাঁ সরকারি কলেজ রোডে রিকশা বা অটোরিকশা দিয়ে মোগরাপাড়া বাজারে এসে যে কাউকে দরগাবাড়ির কথা জিজ্ঞেস করলেই আপনাকে দেখিয়ে দেবে। দরগাবাড়ি কবরস্থানে সারিবদ্ধ বেশ কয়েকটি কবর রয়েছে। এর মধ্যে সবুজ রঙের কবরটি শায়েখ শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামা (রহ.)-এর মাজার।
লেখক: সোনারগাঁ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি