ঈদুল আজহার আগে সারা দেশে পশুর হাট বসে। লাখ লাখ মানুষ কোরবানির পশু কিনতে এই হাটে যান। হাটে প্রবেশের সময় বা পশু কেনার সময় হাট কর্তৃপক্ষ একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ আদায় করে–যাকে আমরা ‘হাসিল’ বলি। এই হাসিল দেওয়া নিয়ে মানুষের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও বিভ্রান্তি আছে। অনেকে মনে করেন হাসিল না দিলে কোরবানি হবে না–আবার অনেকে মনে করেন হাসিল ফাঁকি দেওয়া কোনো বিষয় না। দুটি ধারণাই ভুল। এই বিষয়ে সঠিক জ্ঞান থাকা প্রতিটি মুমিনের জন্য জরুরি।
আরো পড়ুন: শরিকানা কোরবানির অজানা কিছু কথা
হাসিল দেওয়া আসলে একটি চুক্তিভিত্তিক লেনদেন। ক্রেতা বা বিক্রেতা হাটের সুবিধা ব্যবহার করেন–বিনিময়ে হাসিল দেন। ইসলামি ফিকহে এ ধরনের লেনদেনকে ‘ইজারা’ বা ভাড়া চুক্তির আওতায় বিবেচনা করা হয়। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে এরশাদ করেছেন, ‘হে ঈমানদাররা! তোমরা চুক্তিগুলো পূর্ণ করো।’ (সুরা মায়েদা, ১) হাটে প্রবেশ করে সুবিধা গ্রহণ করলে—হাসিল দেওয়া এই চুক্তির অংশ হয়ে যায়। আর চুক্তি পূরণ করা প্রতিটি মুমিনের ওপর ওয়াজিব। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুসলমানরা তাদের শর্ত ও চুক্তির ওপর থাকবে।’ (আবু দাউদ, ৩৫৯৪)
অনেকে হাসিল ফাঁকি দেওয়াকে তেমন গুরুতর মনে করেন না। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে এটি অন্যের হক নষ্ট করার শামিল, যা সম্পূর্ণ হারাম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো মুসলমানের সম্পদ তার সন্তুষ্টি ছাড়া অন্যের জন্য হালাল নয়।’ (বায়হাকি, শুআবুল ঈমান, ৫৫২০)
হাসিল হলো হাট কর্তৃপক্ষের প্রাপ্য। এটি না দিলে তাদের হক নষ্ট হয়। আর অন্যের হক নষ্ট করা ইসলামে সবচেয়ে গুরুতর পাপগুলোর একটি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বিদায় হজের ভাষণে বলেছেন, ‘তোমাদের রক্ত, সম্পদ ও সম্মান পরস্পরের জন্য হারাম।’ (বুখারি, ১০৫)
আরো পড়ুন: আত্মত্যাগের ইতিহাস
হাসিল না দিলে কোরবানি হবে না–এই অনেকে মনে করেন হাসিল না দিলে কোরবানি কবুল হবে না। এই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও ভুল। হাসিল দেওয়া বা না দেওয়ার সঙ্গে কোরবানি সহিহ হওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। কোরবানি সহিহ হওয়ার শর্তগুলো হলো–সঠিক পশু নির্বাচন, নির্ধারিত সময়ে জবাই করা, সঠিকভাবে বিসমিল্লাহ বলা এবং সঠিক নিয়ত থাকা। হাসিল দেওয়া এর কোনোটিরই শর্ত নয়। (বাদায়েউস সানায়ে: ৪/১৯৬-২২৩)
হাসিলের বিষয়ে তিনটি কথা মনে রাখতে হবে, প্রথমত হাসিল না দিলে কোরবানি হয় না–এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। কোরবানি সহিহ হওয়ার সঙ্গে হাসিলের কোনো সম্পর্ক নেই। দ্বিতীয়ত হাসিল ফাঁকি দেওয়া গুনাহ। এটি হাট কর্তৃপক্ষের প্রাপ্য হক, যা আদায় করা প্রতিটি মুমিনের দায়িত্ব। তৃতীয়ত অতিরিক্ত হাসিল আদায় করা হাট কর্তৃপক্ষের জন্যও হারাম। নির্ধারিত হারের বেশি আদায় করলে তা জুলুম।
আরো পড়ুন: কোরবানির ফজিলত
কোরবানি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এই ইবাদতের পশু কেনা থেকে শুরু করে জবাই পর্যন্ত প্রতিটি পদক্ষেপ হালাল ও সৎ পদ্ধতিতে হওয়া উচিত। হাসিল ফাঁকি দিয়ে পশু কিনে কোরবানি দেওয়া মানে–একটি ইবাদতের সঙ্গে একটি গুনাহ যুক্ত করা। একজন সচেতন মুমিন কখনো এই কাজ করবেন না।
লেখক: আলেম ও গবেষক