২৫ মার্চ দিবাগত রাতে ঢাকা শহরে সামরিক অভিযান চলে। ওই রাতে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড চালায় পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী। তখন ৬ দফা দাবির আন্দোলন ধরেই দেশ স্বাধীনতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতির উদ্দেশে যে ভাষণ দেন তা বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন ভাষায় প্রচার এবং অনূদিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠের কিছু অংশ আংশিকভাবে শোনানো হয়েছে। তার ভাষণে বিশ্ববাসীর নজরে আসে। তারই ধারাবাহিকতায় শেষ দীক্ষার বড় ঘটনা ঘটে ২৫ মার্চের দিবাগত রাতে সামরিক বাহিনীর অপারেশন সার্চ লাইট নামে গণহত্যা।
এই গণহত্যার ঠিক কয়েক দিন আগে ইয়াহিয়া খান ঢাকায় এসেছিলেন। শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমেদ, ড. কামাল হোসেনকে নিয়ে ইয়াহিয়া খান বৈঠক করেন। তাছাড়া ইয়াহিয়া খান একান্তভাবে শেখ মুজিবুর রহমান ও তাজউদ্দীন আহমেদের সঙ্গে বৈঠক করেন। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে লিখিত বক্তব্য ইয়াহিয়া খানের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। তাজউদ্দীন আহমেদ সাংবাদিকদের বলেছিলেন যে, ইয়াহিয়া খান হয়তো শান্তিপূর্ণ একটা অবস্থান নিবেন। কিন্তু তা তিনি করেননি। তারপর দেখা গেল ওই দিন সন্ধ্যার পর ইয়াহিয়া খান পাকিস্তানে চলে যান। শোনা যায়, ইয়াহিয়া খান দেশ ছাড়ার সময় সামরিক বাহিনীকে একটা নির্দেশ দিয়ে যান। যারা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছে তাদের ওপর অপারেশন সার্চ লাইট নামে যেন হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়। আমি পল্টন ময়দানে একটি সভা হচ্ছিল তখন কাজি জাফর আহমেদের বক্তব্য থেকে শুনতে পাই যে, ইয়াহিয়া খান দেশ ছাড়ার পর মিলিটারিরা দেশে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালাবে। আন্দোলনকারীদের বা আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গকারীদের ওপর ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালানো হবে। ইয়াহিয়া খান মনে করেছিলেন এই ঘটনার পর সবকিছু পাকিস্তানের পক্ষে যাবে। কিন্তু এই ধারণাটা ছিল ভুল। আইয়ুব খান অন্তত বুঝতে পেরেছিলেন যে, পূর্ব পাকিস্তানকে থামানো যাবে না। আইয়ুব খানের বৈশিষ্ট্য ইয়াহিয়া খানের চাইতে অনেক তফাত ছিল। আইয়ুব খান ইংরেজিতে অনেক পরিচ্ছন্ন বক্তব্য দিতেন। আমরা সব সময় আইয়ুব খানের বিরোধিতা করেছি। কারণ তিনি পাকিস্তান জাতীয়তাবাদী ছিলেন। আমাদের আবেগ ও নীতির সম্পূর্ণ বিরোধী ছিলেন। তিনি পাকিস্তানে দীর্ঘ ১০ বছর ধরে রাজনৈতিক দলের মধ্যে শৃঙ্খলা তৈরি করে দক্ষতার সঙ্গে দেশ শাসন করেছেন। তিনি কামাল আতাতুর্কের মতো বর্ষীয়ান নেতাদের আদর্শে গড়ে উঠেছেন। তিনি আমাদের দেশের নীতি ও আদর্শের বিরোধী ছিলেন। তাই আমরা তার নীতিকে মেনে নিতে পারি না।
ইয়াহিয়া খান ব্যাপক হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে আতঙ্ক সষ্টি করবেন, এটাত সামরিক বাহিনীর মোটা বুদ্ধির ফল। কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন মানুষ হলে বা মানুষের প্রতি ন্যূনতম মমতা থাকলে এমন নারকীয় কাণ্ড করতে পারে না। এ জন্য কাজী জাফর আহম্মদ সাধারণ মানুষের উদ্দেশে বলেছিলেন, যারা গ্রামে যাবেন যান, আমরা তো আর মরতে পারি না, অতএব আমাদের সংগ্রাম করে যেতে হবে। আমরা আমাদের রাজনৈতিক ধারা থেকে সরে দাঁড়াব না। মরব আমরা কিন্তু মেরে মরব। মানুষ যার শরীরে রক্ত আছে এবং মাথায় বুদ্ধি আছে সে অবশ্যই সংগ্রাম করবে। মানুষের ভেতর থেকেই জাগরণ উঠে আসতে হবে।

তাজউদ্দীন আহমেদ ও ব্যারিস্টার আমিনুল ইসলাম সব সময় বলেছেন, আমাদের বেঁচে থাকতে হবে। মিলিটারি অপারেশন চালালেও বেশি দিন চালাতে পারবে না। বঙ্গবন্ধু কখনোই পাকিস্তানিদের কথায় শামিল হতে রাজি হলেন না। বঙ্গবন্ধু সব সময় বলেছেন, আমি মরলে আমার বাসায় মরব, তবুও আমি মাথা নত করব না। তাজউদ্দীন বলছেন, আমাদের যুদ্ধ করতে হবে। পথিবীর অনেক দেশ যুদ্ধ করে স্বাধীনতা অর্জন করেছে, আমাদেরও করতে হবে।
২৬ মার্চ আমার বাসার আশপাশের লোকজন আমাকে জিজ্ঞেস করলেন স্যার এখন কী করা যায়। এর মধ্যে হঠাৎ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় অনেক গোলাগুলি। আমি ছাদে চলে গেলাম এবং দেখি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় কোনো মানুষ নেই। তখন আমি তাজউদ্দীন আহমেদকে ফোন দিলাম এবং জিজ্ঞেস করলাম বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় গুলি করার কারণ কি? তিনি উত্তর দিলেন কী ব্যাপার বলতে পারব না। যারা ক্ষমতায় আছে তারা কী করতে চায়, আমরা বলতে পারি না। তবে আমরা ইয়াহিয়া খানকে স্পষ্টভাবে আমাদের স্ট্যান্ড জানিয়ে দিয়েছি। এখন তিনি কী করবেন সেটা তার ব্যাপার। হয়তো তিনি শান্তপূর্ণ সমাধান করবেন। কিন্তু তা তিনি করলেন না। করলেন নারকীয় হত্যাকাণ্ড। জগন্নাথ হলে ৪১ জন ছাত্র ছিল তাদের সবাইকে হত্যা করেছে। ঢাকা শহরের মাঝে যত রেলস্টেশনের পাশে বস্তিবাসী ছিল সবাইকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। পাকিস্তানি মিলিটারিদের ধারণা ছিল যে, এই বস্তিবাসীরাই সবচেয়ে বেশি আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে থাকে। এ কারণেই এদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। সলিমুল্লাহ হল, ফজলুল হক হল, ইকবাল হল ও সূর্যসেন হলে যেসব ছাত্র ছিল সবাইকে হত্যা করেছে। এমনকি হলের দারোয়ানদেরও গুলি করে মেরেছে। যাত্রাবাড়ীর কাছে গিয়েও মানুষকে হত্য করা হয়েছে। অনেকে বলেছে প্রায় ১ লাখ লোক হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু এতটা বাড়িয়ে বলা ঠিক না। আমার ধারণা ১০ থেকে ২০ হাজার মানুষ হত্যা করা হয়েছিল। ১০ হাজার মানুষ হত্যা কি কম কথা নাকি। এমন নারকীয় হত্যাকাণ্ড করা হয়েছে সেদিন। একটা মিথ্যা কথা প্রতিষ্ঠিত করতে হলে অনেক মিথ্যাকে প্রতিষ্ঠিত করতে হয়। দেশের সঠিক ইতিহাস থাকা দরকার। কোনো কিছুতেই অতিরঞ্জিত করা ঠিক না। বিজিত ইতিহাসকে কখনোই গৌরাবান্বিত করতে গিয়ে অতিরঞ্জিত করা ঠিক না। যুদ্ধ চলাকালে অনেক কিছুই বলা যায়। যুদ্ধে বিজিত হই বা পরাজিত হই প্রকৃত ইতিহাস থাকা দরকার। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক কথা অনেকে বাড়িয়ে বলেছে আবার অনেকে কমিয়ে বলেছে।
ভাষা আন্দোলনেও গ্রামেগঞ্জে ছাত্র-শিক্ষক আন্দোলন করে সাহস জুগিয়েছে। ২৫ মার্চের হত্যাকাণ্ডের আগে ইয়াহিয়া খান বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলাপ করতে আসলে কোনো ইতিবাচক ভূমিকা ছিল না। পূর্ব পাকিস্তানকে কোনোমতেই ছাড়তে রাজি ছিলেন না ইয়াহিয়া খান। এদিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কোনো মতেই পশ্চিম পাকিস্তানের কাছে মাথা নত করতে রাজি নন। প্রয়োজনে তিনি মারা যাবেন। অবশেষে অপারেশন সার্চ লাইটের নামে নারকীয় হত্যাকাণ্ড করে দেশ ছাড়েন।
লেখক: বাংলা একাডেমির সভাপতি ও রাষ্ট্রচিন্তক