রোকেয়ার পায়ে যে সত্যি সত্যি ঘোড়ার পায়ের নাল লাগানো আছে, এ কথা কখনো বিশ্বাস করেনি মোতালেব। তার দুই মেয়ের স্বভাব দুই রকম। খুকি একেবারে মাটির মতো ঠাণ্ডা, লাফালাফি, দাপাদাপি নেই, মুখের কথাও খরচ করে হিসাব কষে; আর এই ছোটটি হয়েছে তার উল্টো। সারা দিন কথার খই ফোটে মুখে। মায়ের শাসন, দাদির বকুনি মোটেই গায়ে মাখে না। দাপিয়ে বেড়ায় এপাড়া-ওপাড়া। নাওয়া-খাওয়ার নেই ঠিক-ঠিকানা। যাকে বলে উড়নচণ্ডী, তাই। দাদির ধারণা- নির্ঘাৎ ওর পায়ে ঘোড়ার পায়ের নাল বসানো আছে। ধারণা শুধু নয়, প্রতিদিন জোর গলায় ওর দাদি বলে সে কথা। মোতালেব শোনে আর হাসে, হেসে উড়িয়ে দেয়। কিন্তু সেদিন ভর সন্ধ্যায় ছোট মেয়েকে রুদ্ধশ্বাসে দৌড়াতে দৌড়াতে বাড়ি ফিরতে দেখে ঘোড়ার পায়ের নালের কথা মনে পড়ে যায় মোতালেবের। শেষে কি না বাড়ির দুয়োরে এসে খাসি ছাগলটার গায়ের ওপরে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। ভ্যাঁ করে প্রতিবাদ জানিয়ে ছাগল দেয় ভোঁদৌড়। রোকেয়া উঠে গা-গতরের ধুলোবালি ঝেড়ে পরিষ্কার করার বদলে খানিক দূর ছিটকে পড়া একটা চিঠির খাম তুলে এনে হাঁপাতে হাঁপাতে বলে,
আব্বা, তুমার চিঠি।
মোতালেবের তো চোখ গোল হয়ে যায় বিস্ময়ে- চিঠি!
মেয়ের কাছ থেকে চিঠিটা সে হাতে নেয়। এপিঠ-ওপিঠ ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দ্যাখে। রোকেয়ার মুখের দিকে তাকায়, কাঁধ পর্যন্ত নেমে আসা উসকো-খুসকো চুলের মধ্যে হাত চালায়, আবার চিঠিটা উল্টে দ্যাখে। সে আন্দাজ করতেই পারে না- তাকে চিঠি লিখবে কে! এমন আচনক ঘটনা আগে কখনো ঘটেছে! কী আশ্চর্য ঘটনা, সে কি লেখাপড়া জানে নাকি? এতক্ষণে রোকেয়াই উল্টে প্রশ্ন করে,
কার চিঠি আব্বা?
কার চিঠি মানে সে জানতে চাইছে কে লিখেছে এই চিঠি! মোতালেব তো নিজেই সাংঘাতিক অবাক, এই জগৎ সংসারে তাকে চিঠি লেখার মতো লোকও আছে! রোকেয়ার হাতে চিঠি ফেরত দিয়ে সে জানতে চায়,
এ চিঠি তুই কনে পালি মা?
কালাম স্যার দিলু যে! কুন দোকানের বোলে হালখাতা!
চমকে ওঠে মোতালেব, এটা তাহলে হালখাতার চিঠি! কালাম মাস্টার দিয়েছে! এটুকু শোনার পর সব পরিষ্কার হয়ে যায় মোতালেবের কাছে। রোকেয়ার কাছে চিঠি পড়িয়ে নেওয়ারও আর প্রয়োজন হয় না। সব মনে পড়ে যায়। মাত্র একটা বছর ঘুরতে না ঘুরতে কত কিছুই যে ঘটে গেল তার সংসারে! সাগরের ঢেউয়ের মতো একটা এসে আরেকটাকে ছাপিয়ে যেতে চায়। তাই বলে গাংনী বাজারে কাজল বস্ত্রালয়ের দেনার কথা সে ভুলে যাবে! মেয়ে-জামাই, বেয়াই-বেয়ানকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় করার সময় কালাম মাস্টারই গাংনী গিয়ে এই দেনার ব্যবস্থা করে দেয়। গ্রাম্য আত্মীয়তার সুবাদে কালাম মাস্টারের সঙ্গে তার যে সম্পর্ক তা ধরলে ধান, না ধরলে পাতান। আসল কথা হচ্ছে, মোতালেবের দুই মেয়ের ওপরে তার খুব টান। খুকির নীরবতা যেমন তার ভালো লাগে, রুকির চঞ্চলতাও তার ভালো লাগে। লেখাপড়ায় রুকির মাথা ভালো বলে হয়তো একটুখানি পক্ষপাতও থাকতে পারে। স্কুলের খাতায় তার নাম পাল্টিয়ে ‘রোকেয়া পারভীন’ করে দিয়েছে কে? এই কালাম মাস্টারই তো! খুকির ওপরেও তার দরদ কম নয়। রুইতনপুর থেকে খুকির বিয়ের প্রস্তাব এলে সে পাহাড় হয়ে সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। অল্পবয়সে বিয়ের কুফল বুঝিয়ে বলে, এক পশলা ঝগড়াঝাটি পর্যন্ত করে। জন্মদাতা বাপ যদি যাচা কাজ কাঁচা করতে না চায়, সে তাহলে কত বেলা পথ আগলে রাখবে!
যাচা কাজই তো! রুইতনপুরের জব্বার মিস্ত্রির ছেলে জলিল নিজে পছন্দ করেছে খুকিকে। গত বছর নদীপাড়ের বৈশাখী মেলায় এসে দেখে গেছে। খোঁজখবর নিয়ে ঠিকানা-পরিচয় জেনেছে। তার পর লোক পাঠিয়েছে কথা পাড়তে। মিস্ত্রির কাজ শিখেছে জলিল। অল্পদিনেই সৌদি আরবে যাবে চাকরি নিয়ে। যাওয়ার আগে বিয়ে করতে চায়। এবং সেটা মোতালেবের বড় মেয়ে খুকিকেই। না, কোনো দাবি-দাওয়া নেই। বিয়ে করে সোজাসুজি ঘরে বউ তুলতে চায়। গরিবের মেয়ের বিয়ের জন্য এ প্রস্তাব যথেষ্ট লোভনীয়। খুকির বয়োস্বল্পতার অজুহাত তুলে কালাম মাস্টার আপত্তি জানালেও মোতালেব পায়ে ঠেলতে পারেনি প্রস্তাব। সাধ্যমতো ধুমধাম করে সে বড় মেয়ের বিয়ে দিয়েছে। এবং কালাম মাস্টারকে বুঝিয়ে বলেছে- রুকির মাথা ভালো, ল্যাকাপড়া শিখিয়ি ওকেই তুমি মানুষ কর ভাই।
বেশ ক’ধাপ দূর সম্পর্কের ফুপাতো ভাই কালাম মাস্টার। প্রথমে একটু মন খারাপ করলেও পরে সে বাস্তবতা মেনে নিয়েছে। এমনকি মোতালেবের বাড়িতে নতুন বেয়াই-বেয়ান বেড়াতে এলে সে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। গাংনী বাজার থেকে মোতালেবের নামে দেনায় কাপড়চোপড় কেনার ব্যবস্থা পর্যন্ত করে দিয়েছে। বছর ঘুরে পুরানো সেই দেনার অঙ্ক এখন যদি শাল হয়ে দাঁড়ায় তো সে কী করবে! কাজল বস্ত্রালয়ের দেওয়া হালখাতার চিঠি রেকেয়ার হাতে ধরিয়ে দিয়েছে।
মোতালেবের বুক ফেঁড়ে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। আপন মনে সে গুমরে ওঠে- বাপরে বাপ! দেখতে দেখতে বছর গড়িয়ে গেল! কিন্তু জামাইবাবাজির বিদেশযাত্রার কী হলো! না, সে কথা মুখ খুলে কারও কাছে শুধানোর উপায় নেই। বহুবার তাকে মুখঝামটা জবাব শুনতে হয়েছে- তুমার ট্যাকায় বিদেশ যাচ্ছে নাকি জলিল, এ্যাঁ? তুমার এত তড়পানি কিসির!
শ্বশুর হয়ে এমন ত্যাড়া কথার কী জবাব দেবে মোতালেব! জামাইকে বিদেশে পাঠানোর কোনো পরিকল্পনা তো সে করেনি। তবু হ্যাপা তো কম কিছু সামলাতে হয়নি তাকে! তার মতো সামান্য মানুষের কী-ই বা সামর্থ্য আছে, আর কী-ই বা দিতে পারে! বিয়ের পর এক মাস পেরোতে না পেরোতেই জানা গেল- বিদেশ গমনের ভিসা বের করতে টাকা লাগবে কুড়ি হাজার, তা দিতে হবে মোতালেবকে। কেন, তাকে দিতে হবে কেন? কুড়ি হাজার টাকা কোথায় পাবে সে! টাকার অঙ্ক শুনে বুকে খিল লাগার জোগাড়। কিন্তু সে কি চায় না- জামাইবাবাজি বিদেশে গিয়ে টাকা-পয়সা কামাই করে দেশে জমিজিরেত কিনুক, দালানবাড়ি করুক, খুকি সুখে থাক? এতই পাষণ্ড সে, বাপ হয়ে মেয়ের সুখ-সুবিধা চায় না?
গোয়ালে বাঁধা গাভিন গাইগরু বের করে এনে খুকির মা সামনে ধরে- হাটে তোলো। বিক্রি কইরি জামুইকে ট্যাকা দ্যাও। মোতালেব তাই করেছে। এক-আধ মাসের মধ্যে বাছুর বিয়োবে যে গাই, সেই গাইগরু ব্যাপারীর হাতে তুলে দিয়েছে নির্বিবাদে। খুকির মা তিন দিন নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে চোখের জল ফেলেছে। কিন্তু সে তো ঠিকই গরু বিক্রির পনেরো হাজার টাকা হাসিমুখে তুলে দিয়েছে জামাইয়ের হাতে। কুড়ি হাজার দিতে পারেনি বলে নিতিবিতি করে হাত কচলে দুঃখ প্রকাশ করেছে। তবু কি সুখী হয়েছে তার আদরের মেয়ে খুকি!
ভরসন্ধ্যায় রোকেয়া যখন ছুটতে ছুটতে এসে হালখাতার চিঠি এনে দেয় হাতে, তখন মোতালেবের বুকের ভেতরে একবার দুরু দুরু করে কেঁপে উঠেছিল- খুকির চিঠি নয় তো! লেখাপড়ায় মাথা যেমনই হোক বছরে বছরে ক্লাসের পর ক্লাস ডিঙিয়ে সে ফাইভ পর্যন্ত উঠেছিল তো ঠিকই। সে লিখতে পারে না একটা চিঠি! মাস তিনেক আগে এ গ্রামেরই ভিখিরি রমজান বেওয়ার হাত দিয়ে একবার ছোট একটা চিরকুট তো পাঠিয়েছিল খুকি। আব্বাকে সে ডেকেছিল দেখার জন্য, আঁকাবাঁকা অক্ষরে মাত্র দুটি বাক্যে লেখা চিঠি। শেষে অনুরোধ রুকিকে সঙ্গে আনিও। মোতালেব তো পড়তে জানে না, সেই ছোট্ট চিঠি তার ছোট মেয়ে রোকেয়াই পড়ে শোনায়। পড়তে পড়তে কেঁদে বুক ভাসায়। মাত্র মাইল তিনেকের পথ, নসিমন কিংবা ভ্যানে চেপে যখন তখন খুকির শ্বশুরবাড়ি থেকে যে কেউ ঘুরে আসতে পারে। এইটুকু পথ হেঁটে গেলেই বা কতক্ষণ লাগে! সমস্যা অন্য জায়গায়। খুকির শ্বশুর-শাশুড়ি এ রকম মর্জিমাফিক আসা-যাওয়া মোটেই পছন্দ করে না। মোতালেব তো বটেই, ছোটমেয়ে রোকেয়াও সেটা টের পায়। টের পাবে না কেন, রাখ-ঢাক না করে তারা মুখের ওপরেই বলে বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িই মেয়েদের আপন বাড়ি, ভালোমন্দ যা-ই ঘটুক সেই বাড়িতেই থাকবে। ঘন ঘন দেখা-সাক্ষাৎ করলে নাকি মন দাঁড়ায়! যতসব আদিখ্যেতা! এসব শুনে বুকে পাষাণ বেঁধে পড়ে থাকে খুকির মা-বাপ, ভাইবোন। কিন্তু রমজান বেওয়ার হাতে চিঠি পাওয়ার পর চুপ করে থাকে কেমন করে! তাড়াতাড়ি ভ্যান ভাড়া করে রুইতনপুরে গিয়ে দ্যাখে রমজানের কথাই ঠিক, খুকির শরীর শুকিয়ে আমচুর। অসুখ-বিসুখ কী যে হয়েছে, মুখে সে কথা কিছুতেই বলবে না। মুখে তার কপাট আঁটা। কেবল চোখে তার নীরব অশ্রুধারা।
অবশেষে অনেক অনুনয় অনুরোধ করার পর এক সপ্তাহর কড়ালে বাড়ি এসে খুকি যখন মুখ খোলে, তখন সবাই চমকে ওঠে। জলিলের নাকি ভাব-ভালোবাসা আছে পাশের গ্রামের এক খালাতো বোনের সঙ্গে। দিনরাত সেখানেই পড়ে থাকে। তার সেই পিরিতের সখি যেতে দেয় না বলেই সে বিদেশে যায় না। খুকি কিছু বলতে গেলে সে গায়ে হাত তোলে। শ্বশুর-শাশুড়ি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব দেখেও ছেলেকে কিছুই বলে না। এসব নোংরামির কথা শুনে মোতালেব সিদ্ধান্তই নিয়ে ফেলে- যা হওয়ার হয়েছে, ওই বাড়িতে আর মেয়ে পাঠাব না।
কিন্তু সপ্তাহ গড়াতে না গড়াতে খুকির মা শুরু করে উল্টো গাওনা- পুরুষমানুষির হাজার গণ্ডা দোষত্রুটি মেয়ে মানুষকেই সামলাতি হয়। সংসার ভাঙলি আর জোড়া লাগবে? মেয়েকে মন্ত্রপড়ানোর মতো করে ফুঁসলায়- পুরুষমানুষকে কব্জা কত্তি হলি মুখ বুইজি থাকলি হয়! ছলাকলাও কত্তি হয়। হ্যাঁ।
বলা যায় খুকির মা-ই সেবার নানা যুক্তিবুদ্ধি খাটিয়ে মেয়েকে শ্বশুরবাড়ি পাঠানোর ব্যবস্থা করে। জামাইবাবাজিকে দাওয়াত দিয়ে ডেকে আনে। ঘরে পোষা মোরগ জবাই করে খাওয়ায়। এনজিওঅলাদের সমিতি থেকে লোন নিয়ে চায়না মোবাইল সেট কিনে দেয়- কথাও হবে, গানও শোনা যাবে। রোকেয়া জানায়, ওটা দিয়ে ছবি তোলাও যায়; দুলাভাই নাকি ওদের দুই বোনেরই ছবি তুলেছে সেই মোবাইলে।
জামাইয়ের মন পাওয়ার আশায় খুকির মা সমিতির কাছে যে ধারদেনা করেছে, প্রতি সপ্তাহে সপ্তাহে কিস্তির টাকা গুনে গুনে এখন তা শোধ করতে হচ্ছে। এক সপ্তাহের হেরফের হলে সমিতির লোক এসে গলায় পা তুলে দাঁড়ায়, লজ্জায় মাথা কাটা যায় মোতালেবের। কিন্তু সে জন্যও তার বিশেষ দুঃখ নেই, ঋণের টাকা শোধ একভাবে হবেই। খুকিকে নিয়ে তার দুশ্চিন্তা কিছুতেই শেষ হয় না। মনের ভেতর কেবলই কু গায়। মনে হয় খুকি ভালো নেই। ভয়ে ভয়ে নানা কৌশলে মেয়ের খোঁজখবর নিতে চেষ্টা করে। তবু তার মনে হয়, কেউ বুঝি তাকে সত্যি খবরটা দিচ্ছে না। খুকি বোধহয় ভালো নেই। এত যে খুকি রুকির হিতাকাঙ্ক্ষী কালাম মাস্টার, তার সামনেও মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সাহস হয় না। প্রাণ খুলে সে কথা বলবে কোথায়, কার কাছে!
হালখাতার চিঠি পাওয়ার পর একবার মনে হয় কালাম মাস্টারের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। লতায়-পাতায় জড়ানো দূর সম্পর্কের হলেও সে ভাই তো বটে। এখন হঠাৎ করে হালখাতার টাকা শুধবে কী করে! হঠাৎ করেই বা হবে কেন, এ তো এক বছরের দেনা! বহু আগেই তার উচিত ছিল এ দেনা শোধ করে দেওয়া। একদা কালাম মাস্টার কাঁধ বাড়িয়ে উপকার করেছে, এখন তাকে কী বলবে সে! না না, একেবারে খালি হাতে তার সামনে দাঁড়াতে পারবে না। অভাব আছে, তাই বলে তো লজ্জা-শরম, মান-ইজ্জত সব হারিয়ে ফেলেনি! কালাম মাস্টারেরও হয়তো খুব সংকোচ হয়েছে, নিজে হাতে হালখাতার চিঠি দিতে পারেনি, পাঠিয়েছে রোকেয়ার হাতে। এসব নিয়ে রোকেয়ার কোনো ভাবনা নেই। নিজের গায়ের ধুলোবালি ঝেড়ে-ঝুড়ে পালিয়ে যাওয়া খাসি ছাগলটা ধরে এনে দিব্যি তার গলায় আদরের বিলি কাটে, বাপের দিকে তাকিয়ে মিটমিট করে হাসতে হাসতে বলে, দোকানে হালখাতা করলি ম্যালা মিষ্টি খাতি দ্যায় না আব্বা!
মোতালেব ভারি অবাক হয়। সে ভাবছে আকাশ-পাতালা, আর মেয়ের মাথায় কি না হালখাতার মিষ্টি নিয়ে ভাবনা! ছেলেমানুষ আর বলে কাকে! হঠাৎ মোতালেবের চোখে জ্বলে ওঠে অন্য আলো, যেন-বা ঝকমকে দ্যুতি ছড়ায়। দেরিতে হলেও কণ্ঠ মোলায়েম করে মেয়ের প্রশ্নের জবাব দেয় আরেক প্রশ্নে- হালখাতার মিষ্টি খাবি মা?
রোকেয়া ঘাড় দুলিয়ে সম্মতি জানায়। বাপও বেশ খুশি হয়ে বলে, আচ্ছা খাস। মোতালেবের দুচোখ এদিকে নিভৃতে জরিপ করে খাসি ছাগলটার শরীর, মনে মনে হিসাব কষে- কত হতে পারে বাজারদর! ওই খাসির আয়ু এমনিতেই ফুরিয়ে এসেছিল, বিক্রি ওকে করতেই হতো। খাসি বিক্রির টাকায় এই বৈশাখে এক বিঘে জমি চষে খুঁড়ে ধানের আবাদ করার পরিকল্পনা ছিল। হালখাতার চিঠি পাওয়ার পর সে নিজেকে প্রশ্ন করেছে- পেটের ভাত বড়, নাকি মানইজ্জত বড়? নিজের কাছ থেকে এক রকম উত্তরও আদায় করে নেয়, তার পর রোকেয়াকে আশ্বস্ত করে, এবার নিশ্চিয় হালখাতার মিষ্টি খাওয়াবে।
কিন্তু মোতালেবের পয়লা বৈশাখ আসে প্রলয়ংকরী ঝড়ের তাণ্ডব নিয়ে। সকালে নতুন বছরের প্রথম সূর্য ঠিকই হেসে ওঠে, তারও আগে অন্ধকার তাড়িয়ে জেগে ওঠে প্রভাত পাখির দল, তারও অনেক আগে মোতালেব ছাগল বিক্রির টাকায় হালখাতার প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রেখেছে। এত কিছুর পরও সেই সকালে রুইতনপুর থেকে খবর আসে- খুকি বিষপানে আত্মহত্যা করেছে। তখন কী করে মোতালেব? তার বিমূঢ় হাত থেকে খসে পড়ে হালখাতার চিঠি।