রবীন্দ্রনাথ যখন খ্যাতির মধ্যগগনে, তখন রবীন্দ্র-বলয় থেকে প্রভাবমুক্ত হয়ে সম্পূর্ণ নিজস্ব সাবলীল ভঙ্গিতে সাহিত্য রচনা শুরু করেন নজরুল। তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক ছিল শ্রদ্ধার, স্নেহের। বিভিন্ন সময়ে দুই কবির সাক্ষাতে তৈরি হয়েছে অমূল্য কিছু মুহূর্ত, রচিত হয়েছে ইতিহাসের জীবন্ত দলিল। বিশ্বকবির আশীর্বাদ, প্রেরণা জুগিয়েছে দুখুমিঞার বিভিন্ন সৃষ্টিতে। নজরুল তাঁর জীবদ্দশায় গুরুদেবকে নিয়ে বিভিন্ন সময়ে একাধিক কবিতা রচনা করেন।...
আজি হতে শত বর্ষ আগে
কে কবি, স্মরণ তুমি করেছিলে আমাদেরে
শত অনুরাগে,
আজি হতে শত বর্ষ আগে!
বাঙালির হৃদয়ের কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘১৪০০ সাল’ কবিতাটি পড়ে চেতনার কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচনা করলেন এ কবিতা। কবিতার প্রারম্ভে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথকে তিনি ‘কবি-সম্রাট’ বিশেষণে ভূষিত করেছেন। বাঙালি মাত্রই যেমন শৈশব থেকেই রবীন্দ্রনাথকে ‘প্রাণের ঠাকুর’ হিসেবে গ্রহণ করে, নজরুলও তার ব্যতিক্রম নন। রবীন্দ্রভক্ত নজরুলকে আরও একবার সবার সামনে তুলে ধরাই এ লেখার উদ্দেশ্য। ‘বড়র পিরীতি বালির বাঁধ’ প্রবন্ধে নজরুল স্বয়ং লিখেছেন- ‘বিশ্বকবিকে আমি শুধু শ্রদ্ধা নয়, পূজা করে এসেছি সকল হৃদয়-মন দিয়ে, যেমন করে ভক্ত তার ইষ্টদেবতাকে পূজা করে। ছেলেবেলা থেকে তাঁর ছবি সামনে রেখে গন্ধ-ধূপ-ফুল-চন্দন দিয়ে সকাল-সন্ধ্যা বন্দনা করেছি। এ নিয়ে কত লোকে কত ঠাট্টা-বিদ্রূপ করেছে। এমনকি আমার এই ভক্তির নির্মম প্রকাশ রবীন্দ্রবিদ্বেষী কোনো একজনের মাথার চাঁদিতে আজো অক্ষয় হয়ে লেখা আছে। এবং এই ভক্তির বিচারের ভার একদিন আদালতের ধর্মাধিকরণের ওপরেই পড়েছিল।’
নজরুল তাঁর জীবনে রবীন্দ্রনাথকে ‘গুরুদেবে’র আসনেই বসিয়েছিলেন। প্রকৃত ভক্তের মতো তাই তিনি লিখেছেন- ‘কবি-গুরুর চরণে, -ভক্তের আর একটি সশ্রদ্ধ আবেদন- যদি আমাদের দোষত্রুটি হয়েই থাকে, গুরুর অধিকারে সস্নেহে তা দেখিয়ে দিন, আমরা শ্রদ্ধাবনত শিরে তাঁকে মেনে নিব।’
বিশিষ্ট নজরুল গবেষক ড. রফিকুল ইসলামের ‘নজরুল জীবনী’ থেকে জানা যায়, ১৯১৪ সালে নজরুল দরিরামপুরের স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হন। ওই বছরই স্কুলে মহিমবাবুর পরিচালনায় একটি বিচিত্রানুষ্ঠান হয়, সেই অনুষ্ঠানে নজরুল কবিগুরুর ‘দুই বিঘা জমি’ এবং ‘পুরাতন ভৃত্য’ আবৃত্তি করে সবাইকে মুগ্ধ করেন।
১৯১৭ সালে নজরুল ৪৯ নম্বর বাঙালি পল্টনে যোগ দেন। নজরুলের সহসৈনিক শম্ভুরায়ের ২৪/০৬/১৯৫৭ তারিখে শ্রী প্রাণতোষ চট্টোপাধ্যায়কে লেখা চিঠি থেকে জানা যায়- ‘পল্টনে যেদিন কাজী যায় সেদিন থেকে আরম্ভ করে পল্টন থেকে যেদিন আমি চলে আসি সেদিন পর্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে মিশেছি… নিজেরা সব মিলতাম ব্রজের রাখাল বালকের মত। কাজীর পড়াশোনার প্রতি বেশ প্রীতি ছিল। রবীন্দ্রনাথের প্রায় সমস্ত পুস্তকই ও শরৎচন্দ্রের সব লেখাই কাজীর কাছে ছিল।’
রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল শীর্ষক রচনায় ড. রফিকুল ইসলাম চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করেছেন নজরুলের রবীন্দ্রপ্রেমের কথা- ‘‘রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে অর্থাৎ তাঁর সৃষ্টির সঙ্গে পরিচয় যে নজরুলের কলকাতায় সাংবাদিক-সাহিত্যিক জীবন সূচনার পূর্ব থেকেই করাচি সেনানিবাস বা স্কুল জীবনেই ঘটেছিল, তার পরিচয় পাওয়া যায় করাচিতে রচিত ও কলকাতার বিভিন্ন সাহিত্য পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর বেশ কিছু সংখ্যক গল্প ও উপন্যাস থেকে। ‘ব্যথার দান’, ‘হেনা, ‘বাদল-বরিষণে’, ‘ঘুমের-ঘোরে’, ‘অতৃপ্ত কামনা’, ‘রাজবন্দীর চিঠি’, ‘রিক্তের বেদন’, ‘মেহের নেগার’, ‘সাঁঝের তারা’ গল্প এবং পত্রোপন্যাস ‘বাঁধনহারা’তে প্রায় বিশ-পঁচিশটি রবীন্দ্রসঙ্গীত বা কবিতার উদ্ধৃতি ব্যবহৃত হয়েছে।’’
১৯২০ সালের মার্চ মাসে ৪৯ নম্বর বেঙ্গলি রেজিমেন্ট পুরোপুরি ভেঙে গেলে নজরুল ইসলাম কলকাতায় ফিরে এলেন। নজরুল-সুহৃদ মুজফ্ফর আহ্মদ তাঁর ‘কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতিকথা’য় লিখেছেন- ‘কৌতূহলের বশে আমরা তার গাঁটরি-বোচকাগুলি খুলে দেখলাম। তাতে তার লেপ, তোশক ও পোশাক-পরিচ্ছদ ছিল। সৈনিক পোশাক তো ছিলই, আর ছিল শিরওয়ানি (আচ্কান) ট্রাউজার্স ও কালো উঁচু টুপি যা তখনকার দিনে করাচির লোকেরা পরতেন। একটি দূরবীনও ছিল। কবিতার খাতা, গল্পের খাতা, পুঁথি-পুস্তক, মাসিক পত্রিকা এবং রবীন্দ্রনাথের গানের স্বরলিপি ইত্যাদিও ছিল।’
এ সময় নজরুলের জনপ্রিয়তার একটি অন্যতম কারণ তাঁর গান। অন্য গান নজরুল যে দু-একটা গাইতেন না তা নয়, মুজফ্ফর আহ্মদের মতে- ‘‘এসব সত্ত্বেও সে মূলত গাইত রবীন্দ্রনাথের গান। এত বেশী রবীন্দ্র-সঙ্গীত সে কি করে মুখস্থ করেছিল তা ভেবে আমরা আশ্চর্য হয়ে যেতাম। সমস্ত ‘কুরআন’ যাঁরা মুখস্থ করেন তাঁদের হাফিজ বলা হয়। আমরা বলতাম নজরুল ইসলাম রবীন্দ্র-সঙ্গীতের হাফিজ।” নজরুলের দেওয়া হেডিং-এর জন্য ‘নবযুগ’ সেই সময় জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল।
মুজফ্ফর আহ্মদ লিখেছেন- ‘বিদ্যাপতি ও চন্ডীদাসের কবিতা তাঁর পড়া ছিল। সেই সব কবিতার কিছু কিছু কথা উল্লেখ করেও সে হেডিং দিত।
সে রবীন্দ্রনাথকেও ছাড়েনি। যেমন ইরাকের রাজা ফয়সলের কী একটা সংবাদকে উপলক্ষ করে সে হেডিং দিয়েছিল:
‘আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার
পরাণ সখা ফয়সুল হে আমার।’
এভাবেই রবীন্দ্র-ভাবনায় মগ্ন থাকতেন নজরুল। ১৯২১ সালের শরৎকালের দিকে নজরুলকে শান্তিনিকেতনে নিয়ে যান ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে নজরুলের সাক্ষাৎকারের বিষয়ে স্মৃতিচারণ করেছেন তৎকালীন রবীন্দ্রনাথের একান্ত সচিব কবি সুধাকান্ত রায় চৌধুরীর ভাই নিশিকান্ত রায় চৌধুরী। শহীদুল্লাহ সাহেব কবিগুরুকে বলেছিলেন- ‘ট্রেনে আসতে আসতে কাজী সাহেব আপনার গীতাঞ্জলির সব ক’টা গান আমাকে গেয়ে গেয়ে শুনিয়েছেন।’ কবিগুরু বললেন- ‘তাই নাকি? অদ্ভুত স্মৃতিশক্তি তো। আমার গীতাঞ্জলির গান সব তো আমারই মনে থাকে না।’
রবীন্দ্রসংগীতের প্রতি নজরুলের ভালোবাসার কথা উল্লেখ করেছেন নজরুলের প্রাণপ্রিয় বন্ধু কাজী মোতাহার হোসেন- ‘‘প্রথম যৌবনে নজরুল রবীন্দ্রনাথের গানকে সবকিছুর ওপর স্থান দিয়েছিলেন। বস্তুত নজরুলই আমাকে প্রথম কয়েকটি রবীন্দ্রনাথের গান শেখান। তার প্রথমটি হল-
‘কে আমারে যেন এনেছে ডাকিয়া এসেছি ভুলে’
দ্বিতীয় গানটি হল-
‘পারবি নাকি যোগ দিতে এই ছন্দেরে’
এই দুটি সুপরিচিত গান ছাড়া ‘গীতাঞ্জলি’ ও ‘গীতিমাল্য’ প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থের আরও অনেক গান নজরুল গাইতেন।”
অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তর স্মৃতিচারণা থেকে জানা যায়, কোন এক বিয়ের আসরে নজরুল নিজের গান না গেয়ে শুরু করেছিলেন রবীন্দ্র-সঙ্গীত দিয়ে- ‘প্রকাণ্ড বৈঠকখানায় ঢালা ফরাসে গানের আসর বসে গেল তক্ষুণি। যেখানেই নজরুল সেখানেই গান, সেখানেই প্রাণ, সেখানেই অফুরান। কোত্থেকে একটা হার্মোনিয়ম এসে জুটল, গান ধরল নজরুল। কিন্তু আশ্চর্য, নিজের গান না গেয়ে ধরল রবীন্দ্র-সঙ্গীত-
তোমার সুরের ধারা ঝরে যেথায় তারি পারে...’
রবীন্দ্রনাথ যখন খ্যাতির মধ্যগগনে, তখন রবীন্দ্র-বলয় থেকে প্রভাবমুক্ত হয়ে সম্পূর্ণ নিজস্ব সাবলীল ভঙ্গিতে সাহিত্য রচনা শুরু করেন নজরুল। তাঁদের পারস্পরিক সম্পর্ক ছিল শ্রদ্ধার, স্নেহের। বিভিন্ন সময়ে দুই কবির সাক্ষাতে তৈরি হয়েছে অমূল্য কিছু মুহূর্ত, রচিত হয়েছে ইতিহাসের জীবন্ত দলিল। বিশ্বকবির আশীর্বাদ, প্রেরণা জুগিয়েছে দুখুমিঞার বিভিন্ন সৃষ্টিতে। নজরুল তাঁর জীবদ্দশায় গুরুদেবকে নিয়ে বিভিন্ন সময়ে একাধিক কবিতা রচনা করেন। একজন প্রকৃত বাঙালির মতোই নজরুলও তাঁর ‘অশ্রু-পুষ্পাঞ্জলি’ অর্পণ করেছেন রবি ঠাকুরের চরণে-
চরণারবৃন্দে লহ অশ্রু-পুষ্পাঞ্জলি,
হে রবীন্দ্র, তব দীন ভক্ত এ কবির।
অশীতি-বার্ষিকী তব জনম-উৎসবে
আসিয়াছি নিবেদিতে নীরব প্রণাম!
হে কবি-সম্রাট, ওগো সৃষ্টির বিস্ময়,
হয়তো হইনি আজো করুণা-বঞ্চিত!
সঞ্চিত যে আছে আজো স্মৃতির দেউলে
তব স্নেহ করুণা তোমার, মহাকবি!
লেখক: নজরুল সংগীতশিল্পী ও গবেষক