আম্মার যখন ২০ বছর বয়স তখন আমার জন্ম। আমি তাঁর প্রথম সন্তান।
চোখ বুজে সেই বয়সী আম্মার চেহারা যখন কল্পনা করি তখন দেখতে পাই, চোখে অবাক বিস্ময় আর পায়ে মৃদু ভয় নিয়ে কম্পিত অন্তরে সদ্য বিবাহিত এক ছিপছিপে সুন্দরী তরুণী মফস্বল থেকে স্বামীর সঙ্গে সংসার করতে রাজধানী শহরে পা ফেলেছে। ১৯৬৬ সালে যখন আম্মার বিয়ে হয় তখন তাঁর বয়স ১৭ বছর। নেত্রকোনা সরকারি গার্লস স্কুল থেকে ১৯৬৫ সালে ম্যাট্রিক পাস করে গভর্মেন্ট কলেজে আইএ প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়েছেন মাত্র। এই সময় হঠাৎ করেই ‘মেয়ে’ দেখতে এসে পছন্দ হয়ে যাওয়ায় তাৎক্ষণিক বিয়ের আয়োজন। আম্মার দাদা-দাদুই মূলত এ বিয়ের উদ্যোক্তা। আমার নানা-নানু এত তাড়াতাড়ি মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। কিন্তু বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্যদের প্রবল ইচ্ছার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মতো জোরও ছিল না তাদের।
আমার আব্বা তখন কিশোরগঞ্জের গুরুদয়াল কলেজ থেকে বিএ পাস করে ঢাকায় কমার্স ব্যাংকে চাকরি নিয়েছেন। আত্মীয়-পরিজনহীন ঢাকা শহরে তিনি বাসা ভাড়া করেছেন মহাখালীতে। সেই আমলের মহাখালী আসলেই ছিল এক্কেবারে খালি, মানে খাঁ খাঁ প্রান্তর। জলা-জঙ্গলে ভরা। বুড়িগঙ্গার তীরে পুরান ঢাকা তখন আসল ঢাকা- গেণ্ডারিয়া, ওয়ারি, বংশাল, আরমানিটোলা, চকবাজার, নারিন্দা, সূত্রাপুর, শাঁখারিবাজার, লালবাগ থেকে টেনেটুনে হাজারিবাগ পর্যন্ত জমজমাট ঢাকা শহর।
আম্মা গল্প করেছেন, একবার ট্রেনে করে নেত্রকোনা থেকে ঢাকায় ফেরার সময় একজন সহযাত্রীর সঙ্গে আলাপ হলো তাঁর। মহিলা কমলাপুর স্টেশনে নামার সময় জিজ্ঞেস করলেন, ‘ঢাকার কোথায় থাকেন আপনারা?’
আম্মা মহাখালীর কথা বলায় তিনি চোখ কপালে তুলে বললেন, ‘ওইখানে মানুষ থাকে নাকি? শুনছি তো ওইখানে নাকি বাঘ, শেয়াল আর সাপখোপে ভরা!’
যতটা মানুষের ধারণা আসলে ততটা পাণ্ডববর্জিত এলাকা ছিল না সেটা। কারণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে সেই ১৯৪৫ সালে মহাখালীর খুব কাছে তেজগাঁ বিমানবন্দর নির্মাণ করা হয়েছিল।
ফলে একেবারেই যে ওই অঞ্চলে লোক চলাচল ছিল না, তা নয়। স্থানীয়রা থাকতেন। দালানবাড়ি তেমন ছিল না। বাসাগুলো ছিল টিনশেড। আমার যদ্দূর মনে পড়ে সত্তরের দশকে মহাখালীর যে বাসাটায় আমরা থাকতাম সেটা ছিল বারান্দাসহ দুই রুমের একটা টিনশেড বাসা। সামনে ছোট্ট উঠান পেরিয়ে রান্নাঘর, গোসলখানা আর বাথরুম। একপাশে একটা কুয়া। সেই কুয়াটা তেমন একটা ব্যবহৃত হতো না, কারণ ততদিনে টিউবওয়েল এসে গেছে। আমাদের বাসার পেছনে চার পরিবারের জন্য একটা টিউবওয়েল ছিল। বুড়ি নামের একজন জোয়ান মহিলা ওই কল থেকে পানি চেপে কলসে ভরে এনে আমাদের বাসায় দিয়ে যেতেন। সেই পানিতেই রান্না-খাওয়া চলত। মাঝে-মধ্যে কাপড় ধোয়া বা গোসলের জন্য বালতিতে দড়ি বেঁধে ওই গভীর অন্ধকার কুয়ার অতল থেকে পানি তোলা হতো।
আমার জন্মের আগে এরকম একা একটা বাসায় ১৮-১৯ বছর বয়সী তরুণী আম্মার সময় কীভাবে কাটত, তাই জানতে চাইতাম আমি।
আম্মা তখন অতীত হাতড়ে স্মৃতিচারণ করতেন, ‘তোমার আব্বা তো সকাল ৯টায় নাশতা টাশতা করে অফিসে চলে যেত। আসবে সেই বিকাল বেলা। আমার হাতে অফুরন্ত সময়। হয়তো একটা গল্পের বই নিয়ে বসলাম, চোখে নামত রাজ্যের ঘুম। ব্যস দরজা লাগিয়ে দিতাম ঘুম। কীসের নাওয়া? কীসের খাওয়া? ৩টা-৪টার দিকে ধরফরিয়ে উঠে হাতমুখ ধুয়ে চুল আঁচড়ে পরিপাটি হয়ে তোমার আব্বাার জন্য অপেক্ষা করতাম। উনি ফিরলে বিকেলে হয়তো রিকশা করে দুজন কোথাও ঘুরতে যেতাম।’
কোনোদিন আবার পাশের বাড়ির দুই বোন জামিনা আর আমিনা এসে হাজির হতো। পাড়ার গাছ থেকে চুপিচুপি চুরি করে কোঁচরভর্তি কাঁচা আম বা কাঁঠালের মুচি পেড়ে সঙ্গে তেঁতুল নিয়ে আসত দুই কিশোরী বোন। আম্মা তাদের সঙ্গে নিয়ে ওইসব চোরাই মালের মজাদার ভর্তা বানাতেন। কখনো ওদের চুল বেঁধে দিতেন। কখনো পড়া দেখিয়ে দিতেন। কোনো কোনো দিন মাথায় ঘোমটা দিয়ে পান চিবুতে চিবুতে আশপাাশের বাড়ির বৌঝিরা আসতেন। এটা সেটা গল্প করতেন। তবে আমার জন্মের আগে বাপের বাড়িতেই বেশি থাকতেন আম্মা। তখন কলেজ ছিল। পরীক্ষা ছিল।
আমি যখন পেটে এলাম তখন আম্মার কলেজের ক্লাস, আইএ পরীক্ষা দুই-ই শেষ। আব্বা আম্মাকে ঢাকায় নিয়ে এলেন।
আম্মার কাছে শুনেছিলাম, আমার জন্মের আগে দুবার আম্মার মিসক্যারেজ হয়েছিল। গর্ভের শিশু পরিপূর্ণ হয়ে ওঠার আগেই গর্ভপাত হয়ে গেলে সেটাকে সাধারণভাবে বলা হতো বাচ্চা নষ্ট হওয়া। তো দুবার বাচ্চা নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর আমার জন্মের সময় আম্মা-আব্বা দুজনেই খুব সতর্ক ছিলেন। সে কারণে প্রথম মাসের গর্ভ অবস্থা থেকেই আম্মা নিয়মিত ডাক্তারের চেকআপের জন্য ঢাকার হলিফ্যামিলি হাসপাতালে যাওয়া-আসা শুরু করেন।
১৯৫৩ সাল থেকে মগবাজারে ওই হাসপাতালটি আছে। আমাদের মহাখালীর বাসার সামনে থেকে রিকশায় চড়ে সোজা রাস্তায় তখন মগবাজারে হাসপাতালে চলে আসা যেত। প্রথমবার আব্বা অফিস থেকে ছুটি নিয়ে আম্মাকে ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যান। পরেরবার থেকে আম্মা একাই যেতেন। এখনকার তুলনায় প্রায় ফাঁকা লম্বা রাস্তাটা পারি দিতে দিতে আম্মা কৌতূহলী চোখ মেলে রিকশার হুডের ফাঁক দিয়ে রাস্তার দুই পাশের গাছপালা, দোকানপাট দেখতে দেখতে যেতেন, আবার একইভাবে ফিরে আসতেন। এই আসা-যাওয়ার পথেই আম্মার চোখে পড়ে একটা সেলাই মেশিন বিক্রির দোকান। সেলাই ফোঁড়াইয়ের দিকে আম্মার ঝোঁক ছিল। স্কুলে সেলাই দিদিমণির ক্লাসে কাপড় কেটে ফ্রক বানানো শিখেছিলেন। পরে নিজের জামাকাপড় তো সেলাই করতেনই, ছোট ভাইবোনদের জামাও নিজ হাতে সুই-সুতা দিয়ে সেলাই করে দিতেন। ফলে সেলাইপটিয়সী আম্মার অনুসন্ধিৎসু চোখ যে সেলাই মেশিনের দিকে যাবে সেটাই স্বাভাবিক।
একদিন লাজুক কণ্ঠে নত মুখে আব্বাকে বললেনও সেটা।
‘নিজের একটা সেলাই মেশিনের শখ আমার আনেক দিনের।’
আব্বা বললেন, ‘বেশ তো কিনব সেলাই মেশিন।’
‘সত্যি?’
‘হ্যাঁ। কিন্তু একটা শর্ত আছে।’
আম্মা একটু দমে গেলেন। শর্তটর্ত আবার কেন? কিনে দিতে চাইলে তো এমনিই দেওয়া যায়। আব্বা হেসে বললেন,
‘আরে, তেমন কিছু না! শর্তটা হলো এর পরের বার হাসপাতাল থেকে আসার পথে তুমি যদি ওই দোকানে গিয়ে সেলাই মেশিনের দরদাম করে, কত টাকা লাগবে সেটা জেনে আসতে পার তবেই মেশিনটা কিনব।’
আম্মার প্রথমে একটু অস্বস্তি হয়, ভয় ভয় লাগে। একা একা পারবেন? কিন্তু পরে ভাবলেন, পারব না কেন? এ আর এমনকি? একটু দরদাম করাই তো!
পরের মাসে আম্মা যখন হাসপাতাল থেকে ফিরছিলেন তখন রিকশা থামালেন সেই সেলাই মেশিনের দোকানের সামনে। সাহস করে ঢুকে পড়লেন দোকানটাতে। পাকিস্তানি ব্র্যান্ড ‘সালিকা সেলাই মেশিন কোম্পানি’র দোকান ছিল সেটা। আম্মা টেবিলে সাজিয়ে রাখা হাতে চালাবার সেলাই মেশিনগুলো ঘুরে ঘুরে, হাত দিয়ে ধরে, ছুঁয়ে, চালিয়ে দেখলেন।
দোকানদার তো কাস্টমারকে প্রভাবিত করার জন্য বাংলা উর্দু মিশিয়ে বলল, ‘মেশিনসি কোয়ালিটি বহুতই আচ্ছা হ্যায়, কাপড়া সিলাই করনে লিয়ে বহুতই জবরদস্ত মেশিন ইয়ে..’
আম্মা মেশিনের গুণাগুণ শুনে এর দাম জানতে চাইলেন। তারপর বললেন, ‘আচ্ছা। পরে আমার হাজবেন্ডকে নিয়ে এসে কিনব।’
আব্বা অফিস থেকে ফেরার পর আম্মা মহা উৎসাহে তাঁর দোকান ভ্রমণের দুঃসাহসী অ্যাডভেঞ্চার কাহিনি আব্বাকে সবিস্তারে শোনালেন।
আব্বা বললেন, ‘ঠিক আছে! তুমি তো দেখি শর্ত ভালোভাবেই পূরণ করেছ। আগামী মাসের বেতন পেয়েই প্রথমে তোমার মেশিন কিনব।’
১৯৬৯ সালের জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে ২৫০ টাকায় আম্মার জন্য সালিকা সেলাই মেশিন কেনা হলো। আমার জন্ম হলো তার পরের মাসে ফেব্রুয়ারির ৮ তারিখে।
ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি এই হাত মেশিনের হাতল ঘুরিয়ে আম্মা আমাদের সব ভাইবোনের জামা সেলাই করছেন। আম্মা আমাকে বলতেন, ‘এই মেশিন আর তোমার বয়স সমান।’
পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় কেটে গেছে, আমাদের জামাকাপড় এখন আর সেলাই করার দরকার পড়ে না। তবে সেই মেশিন কিন্তু এখনো সচল আছে। আমরা মজা করে বলি, ‘আম্মার অমর ও অক্ষয় সেলাই মেশিন’। এখনো আম্মা সময় পেলেই চোখে চশমা লাগিয়ে তার বহুদিনের সঙ্গী সালিকা সেলাই মেশিনে টুকটাক এটা সেটা সেলাই করেন।
আগে দেখতাম ছুটির দিনগুলোতে আব্বা মেশিনের ফুটোগুলোতে তেল দিয়ে দিতেন। এখনো ওটা বেশি ঘট ঘট শব্দ করলে আম্মা তাই করেন। মেশিনের যত্নআত্যি বলতে এতটুকুই। আশ্চর্যের বিষয়, এতদিনেও মেশিনটা কখনো নষ্ট হয়নি এবং কখনোই তার সেবা দেওয়া বন্ধ হয়নি।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে এই কোম্পানির সেলাই মেশিনের শোরুম আর দেখা যায়নি। বিক্রিও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আমি কৌতূহলবশত, গুগলে সালিকা সেলাই মেশিন লিখে সার্চ দিয়ে দেখলাম। হ্যাঁ, ‘সালিকা সিউইং মেশিন কোং প্রাইভেট লিমিটেড নামে পাকিস্তানে এর অস্তিত্ব এখনো আছে। করাচি ও লাহোরে তাদের শোরুম আছে। ফেসবুক পেজে বলা হচ্ছে সালিকা ‘দ্য বেস্ট ডমেস্টিক সিউইং মেশিন অব পাকিস্তান’। ১৯৪১ সাল থেকে কোম্পানিটি সেলাই মেশিন বানিয়ে আসছে। হাতে চালানো মেশিনের পাশাপাশি ওরা এখন পায়ে চালিত ও ইলেকট্রিকচালিত মেশিনও বানায়।
মজার ব্যাপার হলো, ৫৬ বছর আগে ২৫০ টাকা দিয়ে আম্মা যেরকম সেলাই মেশিন কিনেছিলেন পাকিস্তানে সেই একই মেশিনের হোলসেল মূল্য এখন ১৬ হাজার ৫০০ রুপিয়া মাত্র।