নওশীনের বিশ্বাস হচ্ছে না যে তার বিয়ে হয়ে গেছে। তার বিয়ে হওয়ার কথা নয়। বাবা অনেকদিন হলো নওশীনের বিয়ের জন্য পাত্র খুঁজছেন। পাত্র খুঁজে পাওয়া যায় না। আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে ছেলে আসে নওশীনকে দেখতে। মেয়ে দেখে তাদের পছন্দ হয়। নওশীন প্রথম দেখাতেই পছন্দ হওয়ার মতো মেয়ে।
ছেলের আত্মীয়স্বজন এসে প্রথমেই মেয়ের গায়ের রং দেখে। ছেলের জন্য তারা ফরসা গায়ের রঙের মেয়ের সন্ধান করে।
নওশীনের গায়ের রং ফরসা নয়। আখের নতুন গুড়ের মতো চকচকে উজ্জ্বল। যেখানে রোদ পড়লে ঝিকমিক করতে থাকে।
পাড়াপড়শিরা বলে কালো মেয়ে। তাতেই নওশীনের বিয়ে দিতে সবাই উঠেপড়ে লেগেছে। এখুনি বিয়ে না হলে পরে না কি আর এ মেয়ের বিয়েই হবে না।
তবে নওশীনের দিকে একবার তাকালে আরেকবার ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতে হয়। মুগ্ধ হয়ে দেখার মতো তার চেহারা। মাথায় লম্বা ঘন কালো চুল আর কালো কুচকুচে মণি নিয়ে বড় বড় দুটো চোখ। সেই চোখের ভেতরে যেন পুরো পৃথিবী খেলা করছে।
আবু হাশিম হচ্ছেন নওশীনের বাবা। সৎ মানুষ। মেয়ের হার্টে জন্ম থেকে ছিদ্র আছে, এই কথা তিনি বিয়ের পাকা কথা বলার সময় পাত্রপক্ষকে জানিয়ে দেন। নওশীনের বিয়ে ভেঙে যায়। পাত্রপক্ষ বিয়ের কথাবার্তা নিয়ে আর এগোতে চায় না।
নওশীনের মায়ের নাম রানু। তিনি স্বামীর ওপর যথেষ্ট বিরক্ত। অসন্তুষ্ট গলায় বললেন, অসুখবিসুখ কি মানুষের হয় না! তাই বলে কি সেটা জনেজনে ধরেধরে বলে বেড়াতে হবে?
আবু হাশিম বললেন, জনেজনে ধরেধরে আমি বলি না রানু। যে ছেলেটি নওশীনকে বিয়ে করবে তার জানা দরকার আছে।
নওশীনের শরীরের অসুখ তুমি জানো। তার মনে কোনো অসুখ আছে কি না জানো তুমি?
বুঝলাম না।
নওশীনের যদি আগের কোনো ঘটনা থেকে থাকে, সেই কথা যদি তুমি জানো, তাও কি ছেলেকে বলবে, শোনো, আমার মেয়ের এক ছেলের সঙ্গে প্রেম ছিল।
ছিল নাকি?
আঃ জ্বালা। বলছি, সেরকম কিছু থাকলে যখন বলা হয় না, তখন মেয়ের হার্টে ফুটো আছে সে কথা বলার দরকার কী?
নওশীনের যদি সেরকম কিছু থাকে তবে অবশ্যই বিয়ের আগে ছেলেকে সে কথা জানানো উচিত।
রানু কপাল চাপড়াতে চাপড়াতে হাহুতাশ করতে থাকলেন, এত মানুষের মরণ হয়, আমার মরণ হয় না কেন? এই বোকা, আধপাগলা লোকের সঙ্গে সংসার করতে গিয়ে পাগল হয়ে গেলাম। আমি বলে তোমার সংসার করে যাচ্ছি। অন্য কেউ হলে বিয়ের পরদিনই বাপের বাড়ি চলে যেত।
আবু হাশিম চুপ করে আছেন। কথাবার্তার এ পর্যায়ে এসে তিনি চুপ করে থাকেন। রানু একা একা বকে যান। একই কথা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলেন।
রানু বললেন, চুপ করে আছ কেন? মুখে কথা নেই? জিবে ব্যথা, নাকি দুই ঠোঁট আঠা লেগে বন্ধ হয়ে গেছে?
ক্লান্ত গলায় আবু হাশিম বললেন, কোনো কিছু আমি লুকাতে পারব না। বিয়ের পর মেয়ের শ্বশুরবাড়ির মানুষজন মেয়েকে এ কথা-ও কথা শোনাবে, আমাদের প্রতারক বলবে, তা আমার সহ্য হবে না।
ঝনঝন করতে করতে রানু বললেন, রাখো তোমার মেয়েকে ঘরে পুষে। তবে মনে রেখো, সময়মতো পুঁইয়ের ডগা মাচায় তুলে দিতে না পারলে মাটিতে গড়ায়। তখন পোকায় খায়।
এক ছেলে নওশীনকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছে। তার নাম পাভেল। সে নওশীনকে দেখে পছন্দ করেছে। আবু হাশিম তার কাছে কোনো কিছু লুকিয়ে রাখেননি। আলাদা করে ডেকে বলেছেন, বাবা শোনো, আমার মেয়ের হার্টে ছিদ্র আছে। জন্ম থেকেই তার এই রোগ। সবসময় দুর্বল থাকে। কাজ করতে গেলে হাঁপিয়ে যায়। ঘন ঘন ঠাণ্ডা লাগে, কাশি জ্বরে ভুগতে থাকে সারা বছর। এখন তোমার বিবেচনা, তাকে বিয়ে করবে কি না।
পাভেল আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করল, চিকিৎসা করাননি?
তার চিকিৎসার জন্য ব্যাপক অর্থের প্রয়োজন। বাজারে থান কাপড়ের বেচাবিক্রি কম। এখন সবাই গার্মেন্টসের রেডিমেড কাপড় পরে। ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে। চিকিৎসা বলতে এখানকার ডাক্তাররা দেখে। অসুখ বেশি বাড়াবাড়ি হলে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হয়। কয়দিন ভালো থাকে।
পাভেলকে চিন্তিত দেখাচ্ছে। সে কিছু বলছে না। কী বিষয়ে এমন গভীরভাবে চিন্তা করছে তাও বোঝা যাচ্ছে না। আবু হাশিমের মনে হলো সব শোনার পর পাভেল নিশ্চয় আর সবার মতো চলে যাবে। তার পর যোগাযোগ বন্ধ করে দেবে।
আবু হাশিমকে অবাক করে দিয়ে পাভেল বলল, আপনার মেয়েকে আমি বিয়ে করব।
চোখে পানি চলে এসেছে আবু হাশিমের। এমন একটা দিনের জন্য তিনি সেই কবে থেকে অপেক্ষা করছেন। পাভেলের দুটো হাত নিজের হাতের ভেতর নিয়ে নরম গলায় আবু হাশিম বললেন, মেয়ের কারও সঙ্গে সম্পর্ক আছে কি না আমার জানা নেই। তুমি নওশীনের সঙ্গে কথা বলো। তার কাছ থেকে জেনে নাও।
পাভেল বলল, নওশীনকে আমার বিয়ে করতেই হবে। না হলে ইশকুলের চাকরিটা আমি পাব না।
আবু হাশিম এবার থমকে গেলেন। কিছু সময়ের জন্য তিনি বিস্মৃত হয়েছিলেন। নওশীনকে বিয়ের ব্যাপারে পাভেলের আগ্রহের কথা মনে পড়েছে। প্রাইমারি ইশকুলে সহকারী শিক্ষক পদে চাকরির জন্য দুই লাখ টাকা দিতে হবে। পাভেলদের আর্থিক অবস্থা অত্যধিক খারাপ। পাভেলের বাবা ফজলুর রহমান প্রাইমারি ইশকুলে পাভেলের চাকরির জন্য দুই লাখ টাকা আবু হাশিমের কাছে চেয়েছেন।
আবু হাশিম বললেন, ফজলু ভাই, ঘুষ দিয়ে চাকরি নেওয়া ঠিক না। আপনি ছেলেকে ইশকুলে চাকরি নেওয়ার সিদ্ধান্ত বদলাতে বলেন।
ফজলুর রহমান বললেন, দেশ চালায় এমপিরা। দেশের আইন বানায় এমপিরা। এমপি হওয়ার জন্য নমিনেশন নিতে কত টাকা ঘুষ দিতে হয় আপনার ধারণা আছে? আইন যে বানায় সে-ই বেআইনি কাজ করে। আমাকে বলছেন তুলসীপাতা ধুয়ে পানি খাওয়ার জন্য।
শুকনো গলায় আবু হাশিম বললেন, যৌতুক দেওয়া আর নেওয়া দুটোই অপরাধ।
ফজলুর রহমান বললেন, এখানে যৌতুক এল কোথা থেকে! আমরা আত্মীয় হতে যাচ্ছি। আপনার মেয়ের জামাইয়ের দুই লাখ টাকা লাগবে চাকরির জন্য। আপনি তাকে সহযোগিতা করছেন। যৌতুক বলবেন না, পাপ হবে।
রানু সব শুনে আবু হাশিমকে ডেকে বললেন, তুমি যদি এই বিয়ের আয়োজন না করো, তাহলে আমার যেদিকে দুচোখ যায় চলে যাব। মা-বাপ বেঁচে থাকলে তাদের কাছে যেতাম। আমার তো কেউ নেই। আমি এতিম।
বলে কান্না শুরু করলেন। আবু হাশিম বললেন, এতগুলো টাকা!
কান্না থামিয়ে রানু বললেন, ব্যবসা বন্ধক রাখো। তার আগে ব্যবসার কাগজপত্র দেখিয়ে ব্যাংক না হয় কোনো এনজিও থেকে লোন নাও।
আবু হাশিম অল্প দিনের ভেতর টাকা জোগাড় করে ফেললেন। মাত্র এক লাখ এক টাকা দেনমোহরে নওশীনের বিয়ে হয়ে গেল।
বিয়ের রাতে বৃষ্টি হলো প্রচণ্ড। জুন মাসের খ্যাপাটে বৃষ্টি। ভোররাতে বৃষ্টি ছেড়ে গেল। সকাল হলো ঝকঝকে তকতকে। রোদের আলোয় ঝলমলে।
রান্নাঘর থেকে নওশীন দুই কাপ চা নিয়ে এসেছে। বাবা সকালে নাশতা খেয়ে বেরিয়ে গেছেন। মা রান্নাঘরে। পাভেলের দিকে এককাপ চা এগিয়ে দিয়ে অত্যন্ত স্বাভাবিক গলায় নওশীন বলল, মা বানিয়েছেন চা। খেয়ে বোলো না যে অপূর্ব হয়েছে। মায়ের বানানো চা তুমি প্রতিদিন খাচ্ছ। নতুন করে সেই চা অপূর্ব হওয়ার কোনো কারণ নেই।
অদ্ভুত সুন্দর দেখাচ্ছে নওশীনকে। বিয়ের পর কয়েকদিন মেয়েরা লাল শাড়ি পরে থাকে বলে পাভেল মনে করেছিল। নওশীন পরে আছে সবুজ শাড়ি। সে খলবল করে কথা বলছে। তার চেহারার জন্য না কি কথার জন্য তাকে এমন সুন্দর দেখাচ্ছে পাভেল বুঝতে পারছে না।
চায়ের কাপ নিয়ে নওশীন পাশে বসেছে। সে শান্তভঙ্গিতে চায়ে চুমুক দিল। স্থির গলায় বলল, তোমাকে আমি অপছন্দ করি। অতিরিক্ত অপছন্দ। তুমি একজন খারাপ মানুষ। অত্যধিক খারাপ মানুষ। তোমাকে আমি তালাক দেব।
হকচকিয়ে গেছে পাভেল। সে হতভম্ব চোখে তাকিয়ে আছে। নওশীন কেন এরকম কথা বলছে বুঝতে পারছে না। নওশীন বলল, ছোট মামাকে আসতে বলেছি। ছোট মামা জজ কোর্টের উকিল। আমাদের তালাকের ব্যবস্থা তিনিই করবেন। তুমি দেনমোহরের এক লাখ টাকা জোগাড় করো।
থতমত খাওয়া গলায় পাভেল জিজ্ঞেস করল, কীসে তোমার মনে হলো যে আমি খারাপ মানুষ?
আমি প্রচণ্ড অসুস্থ জেনেও তুমি আমাকে বিয়ে করেছ। আমার জন্য নয়, টাকার জন্য। তোমার টাকা দরকার। টাকা দিয়ে তোমার সমস্যা মিটে গেলে আমি বাঁচলাম কি মরলাম, সে ব্যাপারে তোমার কোনো বিবেচনা থাকবে না। তখন তোমার মনে হবে নওশীন কেন মরে না! কিংবা আমাকে বাবার কাছে ফেলে রেখে আসবে। তুমি আবার বিয়ে করবে। আমি হচ্ছি তোমার হাতের আংটির সেই পাথর যে গ্রহের ফের কাটাবে। তবে ওই একবারই। তার পর সেই পাথর তুমি গোবরে ছুড়ে ফেলে দেবে।
নওশীনের শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছে। সে ধীরে ধীরে নেতিয়ে পড়তে থাকল। তার এরকম অবস্থা চলল টানা সাত দিন। এর ভেতর একদিন নওশীনের ছোট মামা ফরিদ এসে হাজির হলো।
পাভেলকে ডেকে বলল, নওশীন তো তোমার সঙ্গে থাকতে চায় না, বাবা। যে থাকতে চায় না, তাকে জোর করে বেঁধে রাখার দরকার নেই। তার বিয়ে হচ্ছিল না বলে পাড়াপড়শির ঘুম হচ্ছিল না। বিয়ে হয়ে গেছে, পাড়াপড়শি এখন ঘুমুচ্ছে। তুমি তার দেনমোহরের টাকাটা দিয়ে দাও। গয়নাপাতি তো কিছু দাওনি। উসুলের প্রশ্ন নেই। নগদ এক লাখ টাকা নওশীন মায়ের হাতে দিয়ে দেবে। এটা তার হক। আর এই দেনমোহর শোধ না করা পর্যন্ত স্ত্রীকে স্পর্শ করা ধর্মে নিষেধ আছে।
কী বলবে বুঝতে পারছে না পাভেল। সে চুপ করে আছে। ফরিদ বলল, পৌরসভা থেকে আজই তোমাদের ডিভোর্সের চিঠি ইস্যু করিয়ে দেব। চিঠি তুমি পাবে। তিরিশ দিন পর ডেট পাবে। সমঝোতার ডেট। ওসব ফর্মালিটিজ। হাজিরা দেওয়ার দরকার নেই। নব্বই দিন পার হলে এমনিতেই তোমাদের ডিভোর্স হয়ে যাবে।
পাভেল একেবারে নিচু গলায় বলল, ডিভোর্সের পর পাড়াপড়শীরা নওশীনকে মন্দ বলবে না? তারা তখন বলবে, এই মেয়ে স্বামীর ঘর করতে পারেনি। যেমন বলে।
ফরিদ হাসছে। তার হাসির সঙ্গে শেয়ালের হাসির মিল পাওয়া যাচ্ছে। সুচালো মুখের হাসি ঝুলিয়ে রেখে ফরিদ বলল, পাড়াপড়শীরা জানবে মেয়ে ঘনঘন অসুস্থ হয়ে পড়ে বলে তাকে স্বামী তালাক দিয়েছে। যৌতুকের টাকা খেয়ে হজম করে ফেলে বউকে ছেড়ে দিয়েছে।
বিস্মিত চোখে ফরিদের দিকে তাকিয়ে আছে পাভেল। তার কাছে ফরিদের কথা অবিশ্বাস্য বোধ হচ্ছে। ফরিদ আগের মতো খ্যানখ্যানে গলায় বলল, বাবা, এই ফরিদ উকিল কোল্ডড্রিঙ্কসকে পানি বলে প্রমাণ করে দিতে পারে। লোকের মুখে কী কথা তুলে দিতে হবে তা আমার জানা আছে।
পরদিন পাভেল পৌরসভা থেকে তালাকের চিঠি পেয়েছে। তালাকের ব্যাপারে সে কাউকে কিছু জানাল না। শুধু নওশীনকে গিয়ে বলল, তোমার সব চাওয়া মেনে নিচ্ছি। দেনমোহরের এক লাখ টাকা তোমাকে দিয়ে দিচ্ছি। আমরা একসঙ্গে থাকব না। তুমি শুধু বাবা-মাকে এখুনি কিছু জানিও না। তারা তোমাকে ভুল বুঝতে পারেন। তোমাকে তারা ভুল বুঝবেন এটা আমি চাইছি না। আমার একটা চাওয়া তুমি রাখো।
শীতল গলায় নওশীন বলল, তোমার এই চাওয়া আমি রাখলাম। আমার বাবা-মাকেও এখন কিছু জানাব না। ছোটো মামাকেও বলে দেব সে যেন কাউকে কিছু না বলে। আর তালাক কার্যকর হওয়া পর্যন্ত আমি এখানেই থাকব।
এ ঘটনার পরপরই নওশীন প্রবল অসুস্থ হয়ে পড়ল। তার অসুখ হলো উথালপাথাল। খাওয়াদাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। শ্বাসকষ্ট শুরু হলো ভয়াবহ। হার্টবিট বেড়ে অস্বাভাবিক অবস্থায় চলে গেল। মাথা ঘামে ভিজে জবজব করতে থাকল। নিশ্বাসে শুরু হলো ভয়ংকর শব্দ।
নওশীনকে নিয়ে পাভেল শহরের বড় হাসপাতালে গেল। ডাক্তার পরীক্ষা করে বললেন, রোগীর অবস্থা বেশ ক্রিটিকাল। অনেক আগে অপারেশন করা দরকার ছিল। এখুনি অপারেশন না করলে রোগী বাঁচবে না। অপারেশন করতে লাখ দুয়েক টাকা খরচ হবে।
হাসপাতালে ভর্তি করা হলো নওশীনকে। ডাক্তার অপারেশন করলেন। নওশীন শঙ্কামুক্ত হয়ে গেল। তবে তার সেরে উঠতে সময় লাগল প্রায় তিন মাস।
সেপ্টেম্বর মাসের সকাল। আকাশ নীল হয়ে আছে। যেন তাতে সাদা চক দিয়ে ছবি আঁকানো যাবে। এখানে-ওখানে মুঠো মুঠো সাদা মেঘ।
নওশীন আর পাভেল ঘরের বারান্দায় মুখোমুখি বসে আছে। পাভেল বলল, আমাদের তালাক হয়ে গেলে তুমি আর এ বাড়িতে থাকবে না!
নওশীন গভীর গলায় জিজ্ঞেস করল, নব্বই দিন কবে হবে?
পরশু। শুধু আজকের দিনটা আর আগামীকাল তুমি এখানে আছ।
আমাকে মিস করবে?
পাভেল বুকের ভেতর লম্বা শ্বাস টেনে নিয়ে আবার বাতাসে ছাড়তে ছাড়তে বলল, জানি না।
নওশীন জানতে চাইল, তুমি ইশকুলে যাও না? তোমার প্রাইমারি ইশকুলের সেই চাকরি?
টাকা আমি দিইনি। টাকা দিয়ে শিক্ষক হতে চাইনি, নওশীন। আমি ভুল করছিলাম। যে শিক্ষক নিজে অসৎ, তিনি কীভাবে ছেলেমেয়েদের সততার শিক্ষা দেবেন, বলো! নষ্ট হয়ে যাওয়া একজন মানুষের কাছে থেকে কেউ কিছু শিখতে পারে না।
গভীর কৌতূহল নিয়ে নওশীন জিজ্ঞেস করল, তাহলে সেই টাকা কী করলে?
পাভেল হাসছে। হাসলে পাভেলকে এত সুন্দর দেখায় নওশীন আগে খেয়াল করেনি। পাভেলকে দেখাচ্ছে নিষ্পাপ শিশুর মতো। পবিত্র হাসিমুখে পাভেল বলল, ডাক্তারকে দিয়ে দিয়েছি। হাসপাতাল গুনে গুনে ঠিক সেই পরিমাণ টাকা নিয়েছে, যা আমার কাছে ছিল।
দুই লাখ টাকা!
পাভেল এখনো হাসছে। হাসিমুখে বলল, হাসপাতাল বলল পুরোটা দিতে হবে।
তাহলে আমাকে যে দেনমোহরের এক লাখ টাকা দিলে, সেই টাকা কোথায় পেয়েছ?
অনেকদিন ধরে এই টাকা জমিয়েছিলাম। দেশবিদেশ দেখার খুব ইচ্ছে আমার। ভেবেছিলাম ওই টাকা নিয়ে দেশভ্রমণে বের হব।
নওশীন বলল, এক লাখ টাকা আমার কাছে আছে। সেই টাকা দিয়ে আমরা ব্যবসা শুরু করব। এখন আমি অনেকটা সুস্থ। কাজ করতে পারব। দুজন মিলে কাজ করলে ব্যবসা অল্প সময়ে দাঁড়িয়ে যাবে। তার পর আমাদের অতিরিক্ত টাকা হবে। তখন আমরা দুজন দেশভ্রমণে বের হব। পাহাড়ে যাব, সমুদ্র দেখতে যাব।
নওশীনের চোখে স্বপ্ন। চোখ ভিজে এসেছে পাভেলের। বুকের মাঝখানে চাপ ধরে আসছে। গলার নিচে তীব্র ব্যথা শুরু হয়েছে। নিশ্বাসের সঙ্গে নাকের ভেতর দিয়ে ব্যথাটা গলায় গিয়ে ধাক্কা দিচ্ছে। আলতোভাবে ঢোক গিয়ে পাভেল বলল, আমাদের তালাক!
নওশীন বলল, উইথড্র করে নেব আজই। আর সেটা ছোট মামাকে দিয়েই করাব। তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাব না আমি।
পাভেলের চোখ উপচে পানি গড়িয়ে পড়ল গালে। আনন্দের এমন কান্না সে বাকি জীবন কাঁদতে চায়।