রাষ্ট্র সংস্কার ও সামাজিক বৈষম্য দূর করার একগুচ্ছ পরিকল্পনা নিয়ে শুরু হয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকারের পথচলা। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকার নানা ইতিবাচক পদক্ষেপ নেয়। কিন্তু গত এক বছরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল নাজুক এবং নৃশংস অপরাধের মাত্রা ছিল অনেকটাই অনিয়ন্ত্রিত। এর মধ্যে মব সন্ত্রাস বা মব ভায়োলেন্স (দলবদ্ধ সন্ত্রাস-সহিংসতা) সবচেয়ে বেশি সমাজে ভীতি ও অস্থিরতার সৃষ্টি করে। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি পরিকল্পিতভাবে ‘মব’ (দলবদ্ধ সহিংসতা) সৃষ্টি করে টার্গেট ব্যক্তিকে পিটিয়ে বা ‘গণপিটুনি’ দিয়ে হত্যার মতো মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে দেশের বিভিন্ন স্থানে। নৃশংস ঘটনা ঘটিয়ে বিকৃত উল্লাস প্রকাশ করার ঘটনাও ঘটেছে। বেশ কিছু ক্ষেত্রে সরকারের ইতিবাচক সাফল্য সত্ত্বেও মব সন্ত্রাসের কারণে তা অনেকটা ম্লান হয়েছে বলে অনেকে মনে করছেন।
আজ ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছর পূর্ণ হলো। কিন্তু ঘুরেফিরে প্রশ্ন আসে- এই এক বছরে আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক করতে সরকার কতটা সফল হয়েছে? এ নিয়ে বিশ্লেষকদের রয়েছে নানা অভিমত।
মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যমতে, গত এক বছরে (২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত) মব ভায়োলেন্স বা দলবদ্ধ হামলায় নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে ১৯৯ জনকে।
সামাজিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক খবরের কাগজকে বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুর্বলতা ও জবাবদিহি না থাকার সুযোগে একের পর এক মব সন্ত্রাস ঘটেছে। কিন্তু নানা অস্থিরতার কারণে আইনশৃঙ্খলার দিকে যথাযথ নজর দিতে পারেনি সরকার। সামাজিক নিরাপত্তা বা নাগরিককে স্বস্তি এনে দেয়- এমন বিষয়গুলো উপেক্ষিত ছিল।
মব ভায়োলেন্সের ক্ষেত্রে অনেক সময় অপরাধীরা অনুকূল পরিবেশ পেয়েছে- এমন অভিযোগও আছে। ফলে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকারের যতটুকু সাফল্য, তা খানিকটা ম্লান করে দিয়েছে ধারাবাহিক মব ভায়োলেন্সের ঘটনা।’
আসক গতকাল জানিয়েছে, এক বছরে মব ভায়োলেন্স বা দলবদ্ধ হামলায় ১৯৯ জনকে হত্যা করা হয়েছে। এর মধ্যে গত বছরের আগস্টে ২১ জনকে, সেপ্টেম্বর ২৮ জনকে, অক্টোবর ১৯ জন, নভেম্বর ১৪ জন ও ডিসেম্বর ১৪ জনকে হত্যা করা হয়েছে। এ ছাড়া চলতি বছরে জানুয়ারিতে ১৬ জন, ফেব্রুয়ারি ১১ জন, মার্চ ২০ জন, এপ্রিল ১৮ জন, মে ১৩ জন, জুন ১১ জন এবং জুলাই মাসে ১৪ জনকে মব সৃষ্টি করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
আসক জানায়, এই এক বছরে শুধু ঢাকা বিভাগে মব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন ৯২ জন, চট্টগ্রামে ৩৫, খুলনায় ১৮, রাজশাহীতে ১৭ জন, বরিশালে ১৭ জন, রংপুরে ৯, ময়মনসিংহে ৬ এবং সিলেটে ৫ জন।
এই এক বছরে কতগুলো মব ভায়োলেন্সের ঘটনা ঘটেছে, তা জানতে পুলিশ সদর দপ্তরের গণমাধ্যম শাখায় যোগাযোগ করা হয়েছিল। কিন্তু পুলিশ সদর দপ্তরে এই জাতীয় কোনো তথ্য আলাদাভাবে সংরক্ষণ করা নেই বলে জানান দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা।
মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আইন ও বিচারের পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের মানবাধিকার বিষয়ে গতকাল কথা হয় সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদের সঙ্গে। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘মব ভায়োলেন্সের মাধ্যমে ব্যাপক আকারে জনমনে ভয় সৃষ্টি এই সরকারের আমলেই সবচেয়ে বেশি ঘটেছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুর্বলতা এই মব ভায়োলেন্স বন্ধ করার ক্ষেত্রে কিছুটা সরকারকে বেকায়দায় ফেলেছে। শক্তিশালী আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থাকলে এ ধরনের ঘটনা ঘটত না। এটাও সরকারের একটি ‘পলিসিও’ থাকতে পারে। কেননা, মব ভায়োলেন্সকে সরকারি কর্মকর্তারাও বলেছেন এটা একটি ‘ক্ষোভ’। সরকারি মনোভাব যদি এমন থাকে তখন এই জাতীয় অপরাধ স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়। এতে করে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে ভীতি ছড়িয়েছে। মবের মাধ্যমে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন হয়েছে।
মব ভায়োলেন্স-সংক্রান্ত হতাহতের বিষয়ে আইনগত দিকগুলো সম্পর্কে জানতে চাইলে মনজিল মোরসেদ বলেন, মব সৃষ্টির মাধ্যমে নির্যাতন করলে সেটি হত্যার উদ্দেশ্যে পেনাল কোডের ৩০৭ ধারায়, অস্ত্র ব্যবহার করে গুরুতর জখম করলে ৩২৬ ধারায়, বাড়িঘর ভাঙলে ৩৮৫ ধারায় এবং হত্যা করলে ৩০২ ধারায় বিচার হবে। ফলে অপরাধ করলে ওই সব আইনে বিচারের ব্যবস্থা আছেই। কিন্তু গত এক বছরে তো এই জাতীয় অপরাধের বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা বিচার দেখিনি। বরং উল্টো দেখেছি, চট্টগ্রামের পটিয়ায় মবের মাধ্যমে থানার ওসিকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। ধানমন্ডিতে মব সৃষ্টি করে ওসিকে ধমকিয়ে চাঁদাবাজদের ছাড়িয়ে নেওয়া হয়। মব ঠেকানোর একমাত্র ঘটনা চোখে পড়েছে রংপুরে জি এম কাদেরের বাড়িতে। এখানে বাড়িটি পোড়ানোর জন্য যে মব সৃষ্টি করা হয়েছিল সেটা ঠেকিয়েছিল সেনাবাহিনী। কিন্তু এখানেও জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
মানবাধিকার সংস্থা- আসকের সিনিয়র সমন্বয়কারী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির খবরের কাগজকে বলেন, ‘এক বছরে (২০২৪ সালের আগস্ট থেকে গত জুলাই পর্যন্ত) সারা দেশে উচ্ছৃঙ্খল জনতার মাধ্যমে সংঘটিত ‘মব সন্ত্রাস’ এর ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। রাজনৈতিক প্ররোচনায় বা সামাজিক উত্তেজনার পরিপ্রেক্ষিতে এমন সহিংস কর্মকাণ্ডে বহুসংখ্যক মানুষ নিহত ও আহত হয়েছেন। এই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলো এসব ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে, যা মানবাধিকারের জন্য এক গুরুতর উদ্বেগের বিষয়।’
আবু আহমেদ ফয়জুল কবির জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছর পূর্তি হিসেবে এই সময়ের মানবাধিকার পরিস্থিতি ও অপরাধসহ নানা বিষয়ে আসকের পক্ষ থেকে গতকাল একটি বিবৃতি প্রকাশ করা হয়। সেখানে মব সন্ত্রাসসহ বিভিন্ন বিষয়ে মূল্যায়ন তুলে ধরা হয়েছে বলে জানান তিনি।
এসব প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম গতকাল বিকেলে মুঠোফোনে খবরের কাগজকে বলেন, ‘মব ভায়োলেন্স শতভাগ বন্ধে পুলিশ কাজ করছে। শুধু মব ভায়োলেন্স নয়, সব অপরাধের বিরুদ্ধেই বর্তমানে পুলিশ সজাগ রয়েছে।’
তথ্য বিশ্লেষণে জানা যায়, গত ৩ জুলাই কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার বাঙ্গুরা বাজার থানার আকবপুর ইউনিয়নের কড়ইবাড়ি গ্রামে মোবাইল চুরি ও মাদকসংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলে স্থানীয়দের একটি দল প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে মব সৃষ্টির মাধ্যমে একজন মা, তার ছেলে ও মেয়েসহ পরিবারের তিনজনকে নির্মমভাবে হত্যা করে। নিহতরা হলেন- রোকসানা আক্তার রুবি (৫৫), তার ছেলে রাসেল মিয়া (২৮) ও মেয়ে জোনাকি আক্তার (২২)।
এর আগে ৩১ মে রাজধানীর দারুস সালামের দ্বীপনগর এলাকায় মাইকিং করে তানভীর ও ফাহিম নামের দুই তরুণকে পিটিয়ে ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যা করে একদল স্থানীয় বাসিন্দা। স্থানীয়রা দাবি করেছিলেন, নিহতরা মাদক কারবারি। এলাকাবাসী ক্ষিপ্ত হয়ে তাদের পিটিয়ে হত্যা করে। পরদিন একই এলাকার রাস্তায় পড়ে থাকা অবস্থায় রাসেল নামে আরও এক কিশোরের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
অপরদিকে গত বছরের ১৩ আগস্ট চট্টগ্রাম নগরের পাঁচলাইশ এলাকায় নেচে, গেয়ে ও উল্লাস করতে করতে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যার মতো বিকৃত-বীভৎস ঘটনা ঘটে। পরে বিকৃত উল্লাসের এই ঘটনাটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। গত ১৮ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় চোর সন্দেহে মো. মামুন নামে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। তার জের ধরে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে পাহাড়ি-বাঙালি সংঘর্ষে একাধিক হতাহত ও অনেক ঘরবাড়িতে হামলা এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এর আগে ৮ সেপ্টেম্বর রাজশাহীতে ‘গণপিটুনি’ দিয়ে হত্যা করা হয় পঙ্গু সাবেক ছাত্রলীগ নেতা আবদুল্লাহ আল মাসুদকে। এ সময় তিনি পানি পান করার জন্য আর্তনাদ করলেও প্রাণে রক্ষা পাননি।
এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে ফজলুল হক মুসলিম হলে তোফাজ্জল হোসেন নামে এক যুবককে চোর সন্দেহে আটক করে কয়েক দফা পেটানো হয়। রাতে হলের ক্যান্টিনে বসিয়ে তাকে ভাতও খাওয়ানো হয়। এরপর আবারও মারধর করা হয় তাকে। একপর্যায়ে মারা যান তোফাজ্জল। এই মর্মান্তিক মৃত্যুতে মানুষের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। আর একই তারিখে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) সাবেক ছাত্রলীগ নেতা শামীম মোল্লাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।