জুলাই অভ্যুত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে দেশ এক পরিবর্তিত পরিস্থিতির মধ্যদিয়ে যাচ্ছে। এখন অনেক কিছুই নতুন করে ভাবা ও করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বিদ্যমান নীতি-কৌশলগুলো সময়োপযোগী করে নেওয়ার এখনই সময়। অতিতে অনেকবারই রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রাম হয়েছে। কোনো কোনোবার সরকার পরিবর্তিনও হয়েছে। ’৭১ সালে রাষ্ট্রেই পরিবর্তন হলো। কিন্তু এবারকারটি একবারেই ভিন্ন। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সরকারের জন্য রাষ্ট্র কাঠামোগত সংস্কার ও বিদ্যমান নীতি-কৌশলগুলো ঢেলে সাজানোর চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসেছে, যা বর্তমান পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি।
দুই। জনআকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে নীতি-কৌশলগুলো পরিবর্তন এবং পরিমার্জন করতে যদি না পারা যায়, তাহলে জুলাই অভ্যুত্থানের উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে পারে। অতীতে জ্বালানি খাত পরিচালনা ও উন্নয়নে যেসব নীতি-কৌশল অনুসরণ করা হয়েছে, তাতে জ্বালানি নিরাপত্তার চরম বিপর্যয় ঘটেছে।
তিন। দেশের জ্বালানি তথা গ্যাস-কয়লা রপ্তানি দেশের মানুষ জীবন ও রক্ত দিয়ে প্রতিহত করলেও সে সম্পদ অনুসন্ধান ও উত্তোলনের পরিবর্তে বিগত সরকার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), তরল জ্বালানি ও কয়লা আমদানির প্রতিই বেশি আগ্রহী হয়। এমন আগ্রহ জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে রীতিমতো সাংঘর্ষিক। ২০১০ সালে প্রণীত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন ২০১০-এর আওতায় বিগত সরকারের আমলে প্রতিযোগিতাবিহীন ব্যক্তি খাত বিনিয়োগে বিদ্যুৎ ও প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহ একদিকে বৃদ্ধি অব্যাহত থাকে, অন্যদিকে সরবরাহ ব্যয় দ্রুত বৃদ্ধিতে সরকারি ভর্তুকি ও ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যহার দ্রুত বৃদ্ধি পায়। ভারত ও মায়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমাসংক্রান্ত বিরোধ আন্তর্জাতিক আদালতে দীর্ঘদিন হলো নিষ্পত্তি হয়েছে। অথচ সমুদ্রের তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি।
চার। আগে জ্বালানির মূল্যহার নির্ধারণ করা হতো বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) আইনের আওতায় বিইআরসির দ্বারা গণশুনানির ভিত্তিতে। এতে অংশীজনদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হতো। কিন্তু বিইআরসি আইন লঙ্ঘন করে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ নিজেই অংশীজনদের অংশগ্রহণ ব্যতীত তরল জ্বালানির মূল্যহার নির্ধারণ করা অব্যাহত রাখে। ফলে তরল জ্বালানির মূল্যহার নির্ধারণ সম্পর্কিত তিনটি প্রবিধানমালা জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ কর্তৃক ২০১২ সাল থেকে আটকে রাখার বিরুদ্ধে এবং ৩ নভেম্বর ২০২১ তারিখে তরল জ্বালানির (ডিজেল ও কেরোসিন) কর্তৃত্ববহির্ভূতভাবে নির্ধারিত মূল্যহার বিইআরসি আইনের ধারা ২২ ও ৩৪ অনুযায়ী রিভিউয়ের আদেশ প্রদানের জন্য ক্যাবের দায়েরকৃত ১০৫০৮/২০২১ নম্বর রিট মামলায় মহামান্য হাইকোর্ট রুলনিশি ইস্যু করেন। মামলাটি এখন নিষ্পত্তির অপেক্ষায়।
পাঁচ। এমতাবস্থায় বাংলাদেশের এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (সংশোধন) আইন ২০২৩-এর দ্বারা সরকার তথা বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় বিদ্যুৎ ও প্রাথমিক জ্বালানির মূল্যহার নির্ধারণের ক্ষমতা হাতে নেয়।
ছয়। বর্তমান সরকার কর্তৃক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) (রহিতকরণ) অধ্যাদেশ-২০২৪ জারি করায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন-২০১০ রহিত হয়।
জ্বালানি তথা জ্বালানি নিরাপত্তার ঘাটতি, অর্থাৎ যেকোনো মৌলিক চাহিদার (অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা চিকিৎসা, বাসস্থা) ঘাটতি যতটা না বিপজ্জনক, এর থেকেও জ্বালানি ঘাটতি অত্যাধিক ভয়াবহ বিপজ্জনক। তাই এ ঘাটতি সৃষ্টি করা সংবিধানে প্রদত্ত মৌলিক অধিকার খর্ব করার শামিল। সুতরাং, দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য ন্যায্য ও যৌক্তিক মূল্যে জ্বালানি প্রাপ্তি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব।...
সাত। পৃথিবীর জ্বালানির প্রায় সর্বাংশের উৎস সূর্য হলেও পৃথিবীজুড়েই ভূমি ও সাগরের অভ্যন্তরে যে পরিপূরক জ্বালানি সম্পদ রয়েছে, তার মালিকানা রাষ্ট্র তথা জনগণের। লুণ্ঠনমুক্ত জ্বালানি খাত উন্নয়নের লক্ষ্যে ক্যাব বিইআরসি আইনের আমুল সংস্কার চায় এবং ক্যাব প্রস্তাবিত জ্বালানি রূপান্তর নীতি ২০২৪-এর ভিত্তিতে বাণিজ্যিক নয়, সরকারি সেবা খাত হিসেবে জ্বালানি খাত উন্নয়ন ও পরিচালনার জন্য জাতীয় জ্বালানি নীতি চায়।
আট। জ্বালানি আমদানি, অনুসন্ধান ও উৎপাদন বিষয়ক ব্যয়ের ন্যায্যতা ও যৌক্তিকতা খতিয়ে দেখার ক্ষমতা আইনে বিইআরসিকে দেওয়া হয়নি। অর্থাৎ সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যতীত সম্পূর্ণ সাপ্লাই চেইন রেগুলেটরি সংস্থা বিইআরসির আওতাবহির্ভূত। ভোক্তার জ্বালানি অধিকার যথাযথভাবে সংরক্ষণ নিশ্চিত হতে হলে সমগ্র সাপ্লাই-চেইন বিইআরসির আওতায় আনা আবশ্যক।
নয়। জ্বালানি মানব জীবনের জন্য একটি আবশ্যিক পণ্য বা সেবা। জ্বালানি তথা জ্বালানি নিরাপত্তার ঘাটতি, অর্থাৎ যেকোনো মৌলিক চাহিদার (অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা চিকিৎসা, বাসস্থা) ঘাটতি যতটা না বিপজ্জনক, এর থেকেও জ্বালানি ঘাটতি অত্যাধিক ভয়াবহ বিপজ্জনক। সুতরাং, দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য ন্যায্য ও যৌক্তিক মূল্যে জ্বালানি প্রাপ্তি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব।
দশ। রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবয়ব, বিশেষ করে জ্বালানি খাত যদি লুণ্ঠনমূলক শোষণের চিত্র ধারণ করে, তাহলে দুটি বিষয় অত্যন্ত নির্মমভাবে প্রকাশিত হয়ে পড়ে। এর একটি জ্বালানি অবিচার এবং অন্যটি জ্বালানি দারিদ্র্য। জ্বালানি অবিচার এবং জ্বালানি দারিদ্র্য অত্যন্ত নিবিড়ভাবে সম্পর্কযুক্ত। অর্থাৎ জ্বালানি অবিচার থেকে জ্বালানি দারিদ্র্যের সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশে দারিদ্র্য বিমোচনের ক্ষেত্রে জ্বালানি নিরাপত্তাকে বিবেচনায় নেওয়া হয় না। ফলে দারিদ্র্য বিমোচনের ধারণা অসম্পূর্ণ।
এগারো। জ্বালানি মানুষের মৌলিক অধিকার। কোনো ভোক্তা প্রাপ্ত বিদ্যুৎ বা অন্য কোনো জ্বালানি দিয়ে কী করবেন তা আলাদাভাবে বাছাই করার সুযোগ নেই। একজন ভোক্তা প্রাপ্ত বিদ্যুৎ দিয়ে ঘরের বাতি জ্বালাতে পারেন অথবা ঘরের হিটিং চালাতে পারেন অথবা বিদ্যুৎ ব্যবহার করে অন্য কোনো কাজ করতে পারেন, এটি একান্তই তার নিজস্ব সিদ্ধান্তের ব্যাপার।
বারো। সাধারণ মানুষের জন্য জ্বালানি সরবরাহ ও ব্যবহার নিশ্চিত করা না গেলে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। আমরা মিলেনিয়াম ডেলেভপমেন্ট গোল (এসডিজি) অর্জন করতে চাই। আমরা চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে রাষ্ট্রীয়ভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ।
তেরো। জ্বালানি আমদানি ও সরবরাহের ক্ষেত্রে লুণ্ঠনমূলক ব্যয়বৃদ্ধির কারণে মূল্যহার ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে না থাকায় ভোক্তা ও সরকার উভয়ই এখন রীতিমতো জ্বালানি অধিকার বঞ্চিত এবং জ্বালানি দারিদ্র্যের শিকার। অথচ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) আইন-২০০৩ ছাড়াও বিভিন্ন আইন ও বিধিবিধান দ্বারা জ্বালানি সুবিচার নিশ্চিত করে রাষ্ট্র তার প্রতিটি নাগরিকের জ্বালানি অধিকার সংরক্ষণ নিশ্চিত করেছে।
চৌদ্দ। সরকারের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার কারণে জ্বালানি খাতে দুর্নীতির ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি হয়। সরকার সমর্থক একটি গোষ্ঠী জ্বালানি খাতের উন্নয়ন ও জ্বালানি সরবরাহ দ্রুত বৃদ্ধির নামে বিগত সরকারের আমলে বিপুল পরিমাণ অর্থ লুণ্ঠন করেছে। বর্তমান সরকার কর্তৃক প্রকাশিত শ্বেতপত্রে এর প্রমাণ খানিকটা পাওয়া যায়। জ্বালানি সরবরাহ চেইনের পুরোটাই সরকারের নিয়ন্ত্রণে রাখা হলে তিতাস গ্যাসের মতো সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো হয়ে ওঠে দুর্নীতির অপ্রতিরোধ্য পরিচালক। এ পরিস্থিতি পরিবর্তনে জ্বালানি খাতে সংস্কার জরুরি। কিন্তু তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। ফলে জ্বালানিতে লুণ্ঠন ও দুর্নীতি চলছে, চলবে- ভোক্তাদের এমন আশঙ্কা অমূলক নয়।
পনেরো। অন্য যেকোনো অবকাঠামো খাতের চেয়ে বিদ্যুৎ খাতে নগদ অর্থ সৃষ্টির সুযোগ অনেক বেশি থাকে। বিশ্বব্যাংক বিদ্যুৎ খাতের দুর্নীতিতে তিনটি বিভাজন শনাক্ত করেছে। এগুলো হচ্ছে: (১) ছোট দুর্নীতি (যেমন- মিটার রিডার ও কারিগরি কর্মচারীদের দুর্নীতি), (২) মাঝারি দুর্নীতি (যেমন, কোম্পানি ম্যানেজার ও মধ্যস্তরের আমলা ও তাদের প্রশ্রয়ে সংঘঠিত দুর্নীতি) এবং (৩) মহাদুর্নীতি বা গ্রান্ড করাপশন (পাবলিক বা প্রাইভেট কোম্পানিকে একচেটিয়া বাণিজ্যের অধিকার দেওয়ার বিনিময়ে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক ক্ষমতা বলে গোষ্ঠীর নামে ও নিজের নামে বিশাল অঙ্কের অর্থ তুলে নেওয়া, যার বড় অংশই সুবিধাদানকারীর নির্ধারিত বৈদেশিক অ্যাকাউন্টে পাচার হয়।
ষোলো। বিগত সরকারের আমলে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ ও প্রাথমিক জ্বালানি খাতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন ২০১০-এর আওতায় প্রায় দেড় দশক ধরে মহাদুর্নীতি চলেছে। বর্তমান সরকারের আমলে ওই আইন অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে রহিত করা হলেও সেসব মহাদুর্নীতিকে এই অধ্যাদেশেই সুরক্ষা তথা দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। ’৯০-এর দশকে ইউক্রেনে সংঘটিত মহাদুর্নীতির কথা বিশ্বব্যাংকের কথায় এসেছে এবং তাতে বলা হয়েছে, ছোট ও মাঝারি দুর্নীতি যত সহজে চোখে পড়ে, মহাদুর্নীতির বেলায় তা ঘটে না। রাষ্ট্র আড়াল করে। আমাদের ক্ষেত্রেও কি রাষ্ট্র আড়াল করছে না?
লেখক: অধ্যাপক, ডিন, ফ্যাকাল্টি অব ইঞ্জিনিয়ারিং, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ও জ্বালানি উপদেষ্টা, ক্যাব