‘ড্রোনের শব্দ এত প্রচণ্ড যে আমি যেন নিজের চিন্তার আওয়াজও শুনতে পাচ্ছিলাম না। বুকের ভেতর ধড়ফড় অনুভব করছিলাম। তবু তার চেয়েও ভয়ংকর শোনাচ্ছিল ২০০ মিটারেরও কম দূরত্বে মিসাইল বিস্ফোরণের প্রচণ্ড শব্দ। প্রতিটি বিস্ফোরণে দেয়াল কেঁপে উঠছিল। ছাদের প্লাস্টার খসে পড়ছে চারপাশে। আমরা ম্যাট্রেস ঠেসে ধরে আছি জানালায়, এরই মধ্যে এক পলকে দেখে নিচ্ছি বাইরের দৃশ্য। ইসরায়েলি ট্যাংক বিল্ডিং ঘিরে রেখেছে। আমরা নিচে ইমার্জেন্সি রুমের দিকে নামলাম। কয়েক সিঁড়ি নেমে দেখি নাসের হাসপাতালের দোতলা কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যাচ্ছে। চারদিকে শুধু মানুষ আর মানুষ–সবাই জড়ো হয়েছেন নিরাপদ আশ্রয়ের আশায়। তাদের ধারণা, অন্তত হাসপাতাল চত্বরটুকু হয়তো রেহাই পাবে। চারপাশের তীব্র বিশৃঙ্খলার মধ্যে দাঁড়িয়ে আমি এমন একজন ব্যক্তির সঙ্গে গভীর এক টান অনুভব করলাম, যাকে আমি কখনো দেখিনি। তিনি আমার দাদা ডা. শামসুদ্দীন আহমদ। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় সিলেট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অধীন একটি চিকিৎসালয়ে রোগীদের চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার কারণে তাকে হত্যা করেছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনী। তার গল্প আমাকে শিখিয়েছে, যুদ্ধকালে স্বাস্থ্যসেবাকর্মী কিংবা হাসপাতাল কেউই নিরাপদ নয়। তবু মনে হলো, আমি যেন আমার পরিবারের ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছি।’
যুদ্ধভূমিতে গিয়ে চিকিৎসাসেবার এ বর্ণনা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এক মার্কিন চিকিৎসকের। তিনি একজন সিলেটি, নাম ডা. নাহরীন আহমদ। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে গত ৪ মার্চ ‘দ্য বেঙ্গল গেজেট’ ওয়েব পোর্টালে তিনি নিজের অভিজ্ঞতা লিখেছেন। ‘হাউ দ্য হিস্ট্রি অব বাংলাদেশ মেড মি এ ওয়ার জোন ডক্টর’ শীর্ষক ওই লেখায় যুদ্ধভূমিতে চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে তিনি স্মরণ করেছেন বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় সিলেটে সরকারি হাসপাতালে মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে পাক সেনাদের ব্রাশফায়ারে নিহত শহিদ চিকিৎসক ডা. শামসুদ্দীন আহমদের কথা।
সিলেট নগরীর চৌহাট্টা এলাকায় যে চিকিৎসালয়ে ব্রাশফায়ারের ঘটনা ঘটেছিল, পরে সেটির নামকরণ করা হয় শহিদ ডা. শামসুদ্দীন আহমদের নামে। এটা সিলেটের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র।
ঘটনাটি ঘটেছিল ১৯৭১ সালের ৯ এপ্রিল। ‘মুক্তিযুদ্ধে শহীদ চিকিৎসক জীবনকোষ’ (প্রকাশ : ২০০৯) এবং শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মারক ডাকটিকিট (ষষ্ঠ পর্যায়) প্রকাশ উপলক্ষে প্রকাশিত স্মরণিকায় (১৯৯৭) শহীদ ডা. শামসুদ্দীন আহমদের হত্যাকাণ্ডের উল্লেখ রয়েছে। তার স্ত্রী হোসনে আরা আহমদ সিলেট সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন। তাদের দুই ছেলে ও তিন মেয়ে। সবাই বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। ছেলে ডা. জিয়াউদ্দীন আহমদের একমাত্র সন্তান হচ্ছেন ডা. নাহরীন আহমদ।
সিলেট নগরীর আম্বরখানার হাউজিং এস্টেট আবাসিক এলাকার বাসিন্দা ছিলেন ডা. শামসুদ্দীন আহমদ। বাড়িটি এখনো আগের নির্মাণশৈলীতে সংরক্ষিত রয়েছে। তাদের প্রতিবেশী ও সিলেটের নাগরিক-পরিবেশ আন্দোলনের পরিচিত মুখ আবদুল করিম চৌধুরী কিম জানান, ডা. নাহরীন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ার ক্লিনিক্যাল মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। চিকিৎসাসেবায় নিবেদিত নাহরীন একজন পরিবেশ ও অধিকারকর্মীও।
এ বছরের জানুয়ারি মাসে তিনি দেশে এসে সিলেটে দাদার বাড়িতে ছিলেন। মানুষ ও প্রকৃতির সেবা প্রত্যক্ষ করতে সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার লাল শাপলা বিল ও পুরাকীর্তির বিভিন্ন স্থাপনা ঘুরে দেখেছেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত ফিলিস্তিনের গাজা, ইয়েমেন, সিরিয়া, ইউক্রেন, সিয়েরা লিয়ন এবং বাংলাদেশের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে চিকিৎসাসেবার অভিজ্ঞতা তিনি নিজেই বিভিন্ন সময়ে বর্ণনা করেছেন।
ডা. নাহরীনকে ‘যুদ্ধ ডাক্তার’ আখ্যা দিয়ে আবদুল করিম চৌধুরী কিম বলেন, ‘তিনি (ডা. নাহরীন) এতটাই সাহসী ও সেবাব্রতী যে মানবসেবায় নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। এমনকি বিয়েশাদিও করেননি। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বেঙ্গল গেজেটে প্রকাশিত তার লেখাটি এখন বাংলাসহ বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়ে প্রকাশ হচ্ছে। এতে ডা. নাহরীন তার দাদার মতোই একজন ‘ওয়ার জোন ডক্টর’, অর্থাৎ যুদ্ধভূমির চিকিৎসক হিসেবে আলোচিত হচ্ছেন।
‘ওয়ার জোন ডক্টর’ হিসেবে তার লেখায় উঠে এসেছে শহিদ চিকিৎসক শামসুদ্দীন আহমদের কথা। ডা. নাহরীন লিখেছেন, ‘আমার দাদাভাই ডা. শামসুদ্দীন আহমদ ছিলেন সর্বজনপ্রিয়, শ্রদ্ধেয় ও অগ্রগণ্য এক চিকিৎসক। তিনি বিশ্বাস করতেন সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবার অধিকারে। সেই বিশ্বাস থেকেই তিনি বিনামূল্যের চক্ষু চিকিৎসা ক্যাম্প পরিচালনা করতেন। এসব ক্যাম্পে চিকিৎসাবঞ্চিত অসংখ্য মানুষ বিনামূল্যে ক্যাটার্যাক্ট সার্জারির মাধ্যমে দৃষ্টি ফিরে পেয়েছেন। সহমর্মিতা ও সম্মানের সঙ্গে মর্যাদাপূর্ণ চিকিৎসাসেবা দেওয়াই ছিল তার লক্ষ্য। স্বাস্থ্যসেবা প্রদান যে কত বড় দায়িত্ব, তা তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করতেন। এমনকি রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়েও। ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের শাসনের বিরুদ্ধে উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের উত্তাল সময়ে যখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শামসুজ্জোহাকে হত্যা করা হয়, তখন দাদাভাই শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা প্রসঙ্গে সরব ছিলেন।’
যুদ্ধভূমিতে অবস্থানকালে ডা. নাহরীন স্মরণ করেন তার দাদাকে হারানোর সেই দিনটির কথা। ‘১৯৭১ সালের ৯ এপ্রিল। পাকিস্তান সেনাবাহিনী হাসপাতালে এসে পৌঁছায়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন লঙ্ঘন করে তারা স্বাস্থ্যসেবাকর্মীদের ওপর গণহত্যা চালায়, যাদের মধ্যে ছিলেন আমার দাদাভাইও। নাসের হাসপাতালকে গ্রাস করতে থাকা কালো ধোঁয়ার মধ্যে দাঁড়িয়ে আমি যেন বুঝতে পারছিলাম–কেন তিনি জানতেন মৃত্যুর ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও দায়িত্ব থেকে সরে যাননি। ভয়ের সামনে মানবতা কখনো হার মানে না। এই উপলব্ধি গাজায় কাটানো সময় থেকে আসেনি; এটি আমার উত্তরাধিকার। যুদ্ধ, নীরবতা ও বেঁচে থাকার গল্পের মধ্য দিয়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে আসা এক শিক্ষা–বাংলাদেশের রক্তাক্ত জন্মলগ্নে যার সূচনা করেছিলেন আমার দাদাভাই।’
চিকিৎসাসেবায় যুদ্ধভূমিতে তৃতীয় দফা গিয়েছেন জানিয়ে ডা. নাহরীন বলেন, তার পেশার মানবিকতার ভিত্তি বাংলাদেশ। তিনি লিখেছেন, ‘পেশাগত জীবনে আমি প্রায়ই নিজেকে অত্যন্ত স্পর্শকাতর পরিস্থিতির মুখোমুখি পাই, তা আমেরিকার কোনো হাসপাতালের আইসিইউতে মৃত্যুপথযাত্রী রোগীর পরিবারের সঙ্গে আলাপ হোক কিংবা যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে মানুষের নিরুপায় টিকে থাকার সংগ্রাম প্রত্যক্ষ করা হোক। এই অস্থির পৃথিবীতে নিজের মানবিক সত্তাটুকু টিকিয়ে রাখাই আমার জীবনের মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর সেই মানবিকতার প্রতিটি উপাদান গড়ে উঠেছে বাংলাদেশি সমাজে দশকের পর দশক ধরে প্রচলিত গল্পগুলোর মধ্য দিয়ে।’