সবিতা হকের দুটি কিডনিই অচল। সপ্তাহে তিন দিন ডায়ালাইসিস করতে হয়। একবার ডায়ালাইসিসে খরচ হয় ৬ হাজার টাকা। যাওয়া-আসা, বিভিন্ন ধরনের ওষুধপত্র, ইনজেকশনসহ বছরে সবিতা হকের চিকিৎসা খাতে বছরে খরচ ১০ লাখ টাকা ছাড়িয়েছে। সবিতা হকের চাকরিজীবী স্বামী মাহমুদ হক খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমি সাধারণ চাকরি করি। এই ব্যয়বহুল চিকিৎসা খরচ চালিয়ে নিতে ধারদেনা করেছি, জায়গা-জমি বিক্রি করেছি। জানি না সামনের দিনগুলোতে কীভাবে খরচ চালাব।’
এই চিত্র শুধু একা সবিতা হকের পরিবারের না। বাংলাদেশে এমন প্রায় চার কোটি রোগী আছে। এদের অনেকেই সাধারণ পরিবারের। নিম্নবিত্ত পরিবারও আছে। কয়েকটি সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ডায়ালাইসিসের জন্য সরকারি হাসপাতালের ফি কিছুটা কম হলেও বেসরকারি হাসপাতালে তা কয়েক গুণ বেশি। প্রতি ডায়ালাইসিসের জন্য সরকারি হাসপাতালে ফি সাধারণত হাজার টাকার আশপাশে হলেও বেসরকারি হাসপাতালে তা অনেক বেশি। কোনো কোনো বেসরকারি হাসপাতালে ডায়ালাইসিসের ফি ৮ হাজার টাকা থেকে শুরু। পরিবহন ও অন্যান্য ব্যয় যুক্ত হয়ে এ খরচ দাঁড়ায় মোটা অঙ্কে। কিডনি ডায়ালাইসিসের জন্য দেশে সরকারি সুবিধা অনেকাংশে কম। একই সঙ্গে সেবামূলক ডায়ালাইসিস কেন্দ্রের সংখ্যা নেই বললেই চলে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে একবার কিডনি ডায়ালাইসিস করতে খরচ ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা। ইউনাইটেড হাসপাতালে ৬ থেকে ১০ হাজার টাকা। বারডেম জেনারেল হাসপাতালে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা। ল্যাবএইড হাসপাতালে ৪ থেকে ৬ হাজার টাকা। এভারকেয়ার হাসপাতালে খরচ হয় ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা। স্কয়ার হাসপাতালে একবার কিডনি ডায়ালাইসিস করতে খরচ ৮ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা। খরচের এত চাপ নিতে না পেরে পথে বসেছে অনেকে।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী সাগুফতা আফরোজ খবরের কাগজকে বলেন, ‘আম্মুর কিডনি নষ্ট হওয়ার পর আর্থিক ও পারিবারিকভাবে অনেক ভেঙে পড়ি। প্রতি সপ্তাহে তিনবার করে ডায়ালাইসিস করাতে হতো। একপর্যায়ে রক্ত অনেক কমে আসছিল তখন আবার রক্তও দেওয়া হয়েছে। প্রতি মাসে লাখের বেশি টাকা খরচ হতো। এমনকি বাসায় মাকে পুরোপুরি সময় দেওয়ার জন্য বাবা কাজ বন্ধ রেখেছিলেন। জমানো টাকা থেকেই মোটা অঙ্কের টাকা খরচ হয়েছে। অন্যদিকে, ডায়ালাইসিসের তেমন সুবিধা নেই। উল্টো আম্মুর স্বাস্থ্যের আরও অবনতি হতে থাকে। প্রায় তিন মাসের মতো চিকিৎসার পর তিনি মারা যান।’
বেসরকারি চাকরিজীবী সাহেদ আরজু খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমার আব্বার কিডনি নষ্ট হয়। চিকিৎসার খরচ চালাতে জমি বিক্রি করে দিতে হয়েছে। এরপরও আব্বাকে বাঁচানো যায়নি। এখন আমার পরিবার নিঃস্ব। দেশে সরকারি উদ্যোগে কিডনি ডায়ালাইসিসের ব্যবস্থা করা খুব জরুরি। তাহলে আমাদের মতো পরিবার বেঁচে যাবে।’
২০২৬ সালে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৩ কোটি ৮২ লাখ মানুষ কিডনিজনিত রোগে আক্রান্ত। এ ছাড়া প্রতিবছর নতুন করে ৩০ থেকে ৪০ হাজার রোগীর কিডনি বিকল হচ্ছে। এর মধ্যে প্রায় ৪০ হাজার রোগী ডায়ালাইসিসের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন। কিডনি বিশেষজ্ঞরা দেশের মোট জনসংখ্যার ২২-২৩ শতাংশকে ঝুঁকির আওতায় রাখছেন। কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশে কিডনি রোগীর সংখ্যা দিন দিন উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে।
বিআইডিএসের গবেষণা প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, কিডনি রোগে আক্রান্ত রোগী ডায়ালাইসিস করতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন। অসংক্রামক রোগের কারণে সব শ্রেণির মানুষ মিলে গড়ে পকেট থেকে খরচ করতে হয় মোট আয়ের ৮৮ দশমিক ৬৮ শতাংশ।
গবেষণায় বলা হয়েছে, ডায়ালাইসিসের মধ্যে মোট মাসিক যে খরচ হয়, এর মধ্যে ৩৫ দশমিক ২৮ শতাংশ ডায়ালাইসিস ফিতে যায়। এ ছাড়া কনসালটেশন ফি ২ দশমিক ৪১, ওষুধ কিনতে ২২ দশমিক ৮৭ এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ১০ দশমিক ০১ শতাংশ। আরও আছে বেড ফি ২ দশমিক ৪৯, মেডিকেল ইক্যুইপমেন্ট খরচ ৪ দশমিক ০৪ এবং অন্যান্য খাতে খরচ হয় ১ দশমিক ৭০ শতাংশ। নন-মেডিকেল খরচের মধ্যে যাতায়াতে খরচ হয় ৮ দশমিক ৫৩, খাদ্যে ২ দশমিক ৭৪ এবং ঘুষ দিতে যায় শূন্য দশমিক ১২ শতাংশ। গবেষণায় বলা হয়েছে, ওয়েলথ ইনডেক্স অনুযায়ী অসংক্রামক স্বাস্থ্য ব্যয়ের মধ্যে কিডনি ডায়ালাইসিসে একজন রোগীর পকেট থেকে খরচ হয় মোট আয়ের ২৫ শতাংশ।
গবেষণাপত্র উপস্থাপনের সময় বলা হয়, কিডনি ডায়ালাইসিস হলো একটি প্রসেস বা প্রক্রিয়া। মানুষের শরীরে যখন কিডনি কাজ করে না, তখন অনেক ধরনের বর্জ্য পদার্থ জমে যায়। সে জন্য কিডনির বিকল্প হিসেবে বর্জ্যগুলো পরিশোধিত করার যে প্রক্রিয়া, সেটিকে ডায়ালাইসিস বলে।
আজ বিশ্ব কিডনি দিবস
অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও বিভিন্ন কর্মসূচিতে দিবসটি পালিত হচ্ছে। দিবসটি উপলক্ষে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে নানা কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। বিশ্বের প্রায় ৮৫ কোটি মানুষ দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে আক্রান্ত। বাংলাদেশে প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ মানুষ কোনো না কোনোভাবে এ রোগে আক্রান্ত। দারিদ্র্য, অসচেতনতা, চিকিৎসাসেবার অপ্রতুলতা এবং অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, স্থূলতা, নেফ্রাইটিস, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, ধূমপান, ব্যথানাশক ওষুধের অতিরিক্ত ব্যবহার, জন্মগত ও বংশগত কিডনি রোগ, মূত্রতন্ত্রের প্রদাহ কিডনি রোগের কারণ। প্রতিবছর প্রায় ৪০ হাজার কিডনি রোগী ডায়ালাইসিসের ওপর নির্ভরশীল হয়। এ রোগের মারাত্মক পরিণতি, অতিরিক্ত চিকিৎসা খরচ এবং চিকিৎসা ব্যয় সাধ্যাতীত হওয়ায় সিংহভাগ রোগী প্রায় বিনা চিকিৎসায় মারা যান।