বুকভরা এক সোনালি স্বপ্ন নিয়ে এ বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের লামার বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রামে পড়তে যান নুর উদ্দিন। সবকিছুই ঠিক ছিল। পড়ালেখা শেষ করতে পারলে পাশ্চাত্যের ডিগ্রি নিয়ে দেশে বা বিদেশে ভালো চাকরি জুটে যাবে। এক সুন্দর নিশ্চিত ভবিষ্যৎ। পরিবারের প্রত্যাশা পূরণের পাশাপাশি সমাজে তার মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। কিন্তু এক সেমিস্টার পার হওয়ার পরই তার মনে দুশ্চিন্তা ভর করেছে। পড়ালেখা শেষ করতে পারবে তো? স্বপ্ন তার পূরণ হবে তো?
এ দুশ্চিন্তার কারণ হলো, নিজ দেশে ডলারসংকটের কারণে তার দ্বিতীয় সেমিস্টারের ফি জমা দেওয়ার বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে গেছে। একইসঙ্গে তার নিজের থাকা-খাওয়া ও অন্যান্য ব্যয় নির্বাহ করার জন্যও ডলার প্রয়োজন। সেটিও যাবে দেশ থেকে। এখন সবই অনিশ্চিত। ডলারসংকট চলছে। এ সংকটের অবসান কবে হবে তাও অনিশ্চিত।
বছরে প্রায় ৫০ থেকে ৮০ হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যায় উচ্চশিক্ষার জন্য। তাদের সবারই কমবেশী একই অবস্থা।
ডলারসংকটের কারণে বড় বিপদে আছেন বিদেশে উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী, অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা। চলমান ডলারসংকটে প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করতে চড়া দাম দিতে হচ্ছে তাদের। তারপরও ডলার পাওয়া যাচ্ছে না। যদিও বা ডলার পাওয়া যায়, তা পাঠাতে করতে হয় বাড়তি খরচ। হয় নানা হয়রানি ও ঝক্কি-ঝামেলা।
এ ধরনের ব্যয়ের অর্থ পরিশোধের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের সুস্পষ্ট কোনো নির্দেশনা বা সার্কুলার নেই। এসব শিক্ষার্থীকে ডলার সরবরাহে অগ্রাধিকার দেওয়ারও কোনো বিধান নেই। একটি গাইডলাইন বা দিকনির্দেশনা ব্যাংকগুলোকে দেওয়া আছে যেটি অনুসরণ করা সময়সাপেক্ষ ও হয়রানিমূলক বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট অভিভাবকরা। এজন্য বিকল্প পথ হিসেবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে হুন্ডির আশ্রয় নেন তারা।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি, মেডিকেল টেস্ট, টিউশন ফিসহ নানা ফি পরিশোধের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যাংকগুলোকে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি গাইডলাইন বা দিকনির্দেশনা দেওয়া আছে। এ নির্দেশনায় বৈদেশিক মুদ্রায় ফিগুলো যাচাই-বাছাই শেষে কেবলমাত্র বিদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে পরিশোধের ব্যবস্থা নিতে পারবে ব্যাংকের নিজস্ব বা অনুমোদিত অথরাইজড ডিলার (এডি) শাখা। সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থী প্রয়োজনীয় সব ডকুমেন্ট সরবরাহ করবে। তবে এডি শাখা কোনো ব্যক্তির অনুকূলে এ অর্থ ট্রান্সফার করতে পারবে না।
টিউশন ফি ও অন্যান্য অনুমোদিত খরচের মধ্যে একজন শিক্ষার্থীর জীবনযাপন ব্যয় অন্তর্ভুক্ত নেই। আবার বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী টিউশন ফি ও অনুমোদিত অন্য ব্যয়ের বাইরে এক টাকাও পাঠানোর সুযোগ ব্যাংকিং চ্যানেলে দেওয়া হয়নি। এ পরিস্থিতিতে সব শিক্ষার্থীর অভিভাবক টাকা পাঠাতে ভিন্ন পথের আশ্রয় নেন। এর বেশির ভাগই হুন্ডিতে পাঠানো হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশিত গাইডলাইন ফর ফরেন এক্সচেঞ্জ ট্রানজেকশন (জিএফইটি) ২০১৮ (ভলিউম-১, চ্যাপ্টার ১১, প্যারা ১০) এ বর্ণিত নিয়ম অনুযায়ী বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ বাবদ ব্যয়ের কোনো সর্বোচ্চ সীমা উল্লেখ নেই। এক্ষেত্রে বিদেশের সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চাহিদাপত্র ভেরিফাই করে সিদ্ধান্ত নেবে ব্যাংকের এডি শাখা।
বিদেশে ভ্রমণ বা ব্যক্তিগত কেনাকাটার ব্যয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ নির্দেশনা অনুযায়ী, একজন বাংলাদেশি বছরে সর্বোচ্চ ১২ হাজার মার্কিন ডলার সমমূল্যের অর্থ ব্যয় করতে পারবে।
চিকিৎসা ক্ষেত্রে এ ব্যয়সীমা প্রায় একইরকম। চিকিৎসার ক্ষেত্রে এককালীন ১০ হাজার মার্কিন ডলার সমমূল্যের অর্থ পাসপোর্টে এনডোর্স করার অনুমোদন আছে যা পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনসাপেক্ষে বাড়ানোর সুযোগ পাওয়া যাবে বলে জিএফইটি ২০১৮ তে বলা হয়েছে।
কিন্তু উচ্চশিক্ষার ব্যয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা নেই। সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটগুলোর তথ্য বলছে, কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পুরো গ্র্যাজুয়েশন কোর্সের ব্যয়ের পরিমাণ ১ লাখ মার্কিন ডলারও পেরিয়ে যায়। আবার কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে তা ৫০ হাজার ডলারে হয়ে যায়। মাস্টার্স প্রোগ্রামের ব্যয়ও ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত হয়ে থাকে। তবে মাস্টার্স প্রোগ্রামে স্কলারশিপ পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু এ সুবিধা মেলে শুধু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে।
এরপরও টিউশন ফি ও জীবনযাপন ব্যয় নির্বাহ করতে অভিভাবকদের যে যার মতো করে টাকা পাঠিয়ে থাকেন।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা গেছে যুক্তরাষ্ট্রে একজন শিক্ষার্থীর বই ও অন্যান্য উপকরণ বাবদ বার্ষিক ৯০০-২০০০ ডলার, যাতায়াতে ৩০০-৭০০ ডলার, আবাসনে ৯৮০০-১১১০০ ডলার, স্বাস্থ্য বীমার জন্য ৭০০-১১০০ ডলার, জামা কাপড় বাবদ ৫০০ ডলার ন্যূনতম প্রয়োজন। এর সঙ্গে যুক্ত হয় মাসিক বিদ্যুৎ বিল ১০০ থেকে ১৫০ ডলার, খাবার অন ক্যাম্পাস ২৫০ ডলার, অফ ক্যাম্পাস ৪০০-৬০০ ডলার, ফোনের বিল ৫০ ডলার, ইন্টারনেট ৪৫-৫০ ডলার, পানি ও অন্যান্য ৫০-৭৫ ডলার।
চলমান ডলারসংকটে প্রয়োজনীয় ব্যয়ের অর্থ পাঠাতে বাড়তি টাকায় ডলার সংগ্রহ করতে হচ্ছে। তাও আবার পাওয়া যাচ্ছে না। একবার ডলার সংগ্রহ হলো তো তা পাঠাতে হচ্ছে আবার হুন্ডিতে। এতেও বাড়তি খরচ। এ যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা।
কানাডার অন্টারিওতে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যাচেলর প্রোগ্রামের শিক্ষার্থী আবিদুন নবী। তার নিকট আত্মীয় চিশতী হোসাইনের মাধ্যমে কথা হয় ওই শিক্ষার্থীর বাবার সঙ্গে। খবরের কাগজকে তিনি জানান, টিউশন ফি পাঠাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি লাগে। টিউশন ফি-এর বাইরে এক টাকা পাঠানোর সুযোগ নেই। এখন কোথাও ক্যাশ ডলার পাওয়া যাচ্ছে না। এ কারণে তার জন্য ফি পাঠাতে সমস্যা হচ্ছে। এ ছাড়া তার থাকা-খাওয়া, পরিবহন ও অন্যান্য ব্যক্তিগত প্রয়োজনের খরচও শেষ হওয়ার পথে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ভার্জিনিয়া কমিউনিটি কলেজ থেকে এক বছরের কোর্স সম্পন্ন করে এসেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থী মোতাসিম বিল্লাহ নাইম। বর্তমানে মাস্টার্স প্রোগ্রামে ভর্তির জন্য আবেদন করছেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে। ডলার সংকটের কথা জানিয়ে তিনি খবরের কাগজকে বলেন, আমার আবেদনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় ভেদে ৫০-১০০ ডলার প্রয়োজন। কিন্তু ব্যাংকে এখন ডলার পাওয়া যাচ্ছে না। কোনো ধরনের ক্যাশ ডলার নেই বলা হচ্ছে। এটিএম এ থাকলেও প্রতি ডলারের বিনিময়ে ১২০ টাকা করে রাখা হচ্ছে। এতে তার কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করতে গিয়ে বাড়তি ব্যয় হচ্ছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের হিসাব অনুযায়ী, বছরে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পড়তে যাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। আর বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের মোট ৫৫টি দেশে উচ্চশিক্ষার জন্য যাওয়া এ সংখ্যা ৫০ থেকে ৮০ হাজার পর্যন্ত। তবে, ইউনেস্কোর ইনস্টিটিউট ফর স্ট্যাটিসটিকস এর তথ্য বলছে এ সংখ্যা ৫০ হাজারের ওপরে।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাংলাদেশ থেকে যারা নিজস্ব ফান্ড নিয়ে দেশের বাইরে উচ্চশিক্ষার জন্য যান, তাদের ব্যাংক স্টেটমেন্ট দেখাতে হয়। এ ছাড়া, প্রথম সেমিস্টারের ফি সঙ্গে নিয়ে যেতে হয়। বর্তমানে ডলারসংকটের কারণে প্রতিবার সেমিস্টার ফি পরিশোধের ক্ষেত্রে এসব শিক্ষার্থীকে দুর্দশা পোহাতে হচ্ছে। তারা পড়ালেখা সময়মতো শেষ করতে পারবেন কি না তা নিয়ে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব দ্য ওয়েস্ট অব ইংল্যান্ডে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত রেজোয়ান শাওন খবরের কাগজকে বলেন, ডলার সংকটের কারণে সবাইকেই ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। কম কম করে ম্যানেজ করতে হচ্ছে। এ কারণে বিভিন্ন রকম দামে কিনতে হচ্ছে।
সংকট সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. আবদুল হালিম। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, আমাদের দেশে যখন যেটা প্রয়োজন সেটার কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়। ছাত্ররা পড়ালেখা করতে যাবে, সংকট যেন দীর্ঘদিন না থাকে সে ব্যবস্থা করা উচিত।
সালমান