রাজধানীর ধানমন্ডির একটি প্রাইভেট হাসপাতালের একজন ক্যানসার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত একজন রোগীর পরার্মশপত্রে চারটি ওষুধ লেখেন। এর মধ্যে একটি ওষুধ দেশেও তৈরি হয়, আবার বিদেশি একটি কোম্পানির ওষুধও চোরাইপথে দেশে আসে। ওই চিকিৎসক রোগীর স্বজনকে পরামর্শ দেন সম্ভব হলে বিদেশি ওষুধটি কেনার। রোগীর স্বজন চিকিৎসকদের পাল্টা প্রশ্ন করে কারণ জানতে চাইলে চিকিৎসক বলেন, দেশি ওই ওষুধটির মান ভালো না। রোগীর স্বজন দ্বিধায় পড়ে যান। তিনি কষ্ট হলেও দেশিটা বাদ দিয়ে বেশি দামে বিদেশি ওষুধ কেনেন।
বেশ জনপ্রিয় ও বহুল ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিক ‘সিপ্রোফ্লোক্সাসিন’। বহু ধরনের ইনফেকশনের ক্ষেত্রে এটি ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে থাকেন চিকিৎসকরা। দেশের অধিকাংশ ওষুধ প্রস্তুতকারক কোম্পানি ওই জেনেরিকের বিভিন্ন ক্যাটাগরির ওষুধ প্রস্তুত ও বাজারজাত করে। কেউ ট্যাবলেট, কেউ ক্যাপসুল কেউবা সিরাপ করে। ওষুধটির এত চাহিদার সুযোগ নিয়ে কোনো কোনো কোম্পানি যেনতেনভাবে তা বাজারে ছাড়ে। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর গত ১১ জানুয়ারি মাকর্সম্যান ফার্মাসিটিউক্যাল লিমিটেডের তৈরি ও বাজারজাত করা সিপ্রোফ্লোক্সাসিন ৫০০ মিলিগ্রাম জেনেরিকের ‘সিপ্রোকুইন’ ব্র্যান্ডের ওষুধটি নিম্নমানের বলে শনাক্ত করে তা বাজার থেকে প্রত্যাহার ও উৎপাদন নিষিদ্ধের আদেশ জারি করে। এর আগে ওই ওষুধের নমুনা সংগ্রহ করে তা ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা হয়।
এর আগে ২ জানুয়ারি একইভাবে নিম্নমানের ওষুধ হিসেবে প্রমাণ পেয়ে বাজার থেকে প্রত্যাহার করার আদেশ দেওয়া হয় গ্লোব ফার্মাসিটিউক্যালসের ডেসলোরেটেডিন জেনেরিকের ডেসলোনা ট্যাবলেট। এটি উৎপাদন করা হয় ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে এবং মেয়াদ লেখা ছিল চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত, যা ব্যবহার হয় জ্বর ও এলার্জিজনিত সমস্যা থেকে উপশমের জন্য। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর এই ওষুধটিরও নিবন্ধন বাতিল করে।
অন্যদিকে ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য নকল ইনসুলিনও পাওয়া দেশের বাজারে। তাও আবার ডেনমার্কভিত্তিক ওষুধ কোম্পানি নভো নরডিক্সের নামে। গত বছর ৩০ অক্টোবর ‘ওজিমপিক’ ১ মিলিগ্রাম ডোজের ইনসুলিন বাজার থেকে জব্দ করে নিষিদ্ধ করেছে। ওই ওষুধটি মিসরে প্যাকিং করা হয়েছে বলে প্যাকেটের গায়ে উল্লেখ ছিল। একই দিনে সিলোরফিন নামের একটি নকল আইড্রপ নিষিদ্ধ করা হয়, যা নকল বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। এই ওষুধটির আসল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাপেক্স ফার্মা লিমিডেট।
সরকারের ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর মাঝেমধ্যে তদারকিতে নেমে এমন কিছু নিম্নমানের ও নকল বা ভেজাল ওষুধ জব্দ কিংবা নিষিদ্ধ করলেও বিশেষজ্ঞদের মতে বাজারে এমন শত শত নিম্নমানের, নকল, ভেজাল ওষুধের ছড়াছড়ি রয়েছে, যা মানুষ টাকা দিয়ে কিনে ব্যবহার করে একদিকে প্রতারিত হচ্ছেন, অন্যদিকে সুস্থ হওয়ার চেয়ে আরও বড় ক্ষতির মুখে পড়ছেন শারীরিকভাবে। দেশে এমন নিম্নমানের, নকল ও ভেজাল ওষুধ তৈরি ও বাজারজাতের পেছনে ওষুধের কাঁচামাল আমদানিকারক বিশেষ চক্রকে দায়ী করা হয়। যাদের সঙ্গে কিছু ওষুধ প্রস্তুতকারক কোম্পানি ও কাঁচামাল বিক্রেতা চক্রের জোগসাজশ রয়েছে বলে জানা যায় সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে। বিশেষ করে রাজধানীর মিটফোর্ড এলাকায় এই চক্রের মাধ্যমেই বড় বেচাকেনা চলে বছরের পর বছর। মাঝেমধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সেখানে অভিযান চালালেও কিছুদিন পরেই আবার যেমনটা তেমন পর্যায়ে চলে যায়। এমনকি তিন বছর আগে এমন এক অভিযানের সময় ঘেরাওয়ের মুখে পড়েছিলেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্নিনিক্যাল ফার্মেসি ও ফার্মাকোলজি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. মুনীরউদ্দীন আহমদ খবরের কাগজকে বলেন, ওষুধ সেক্টরে খুবই বিশ্রী অবস্থা চলছে। এখানে দুভাবে ওষুধ তৈরি হচ্ছে। বিদেশি রপ্তানির ওষুধে আন্তর্জাতিক মান রক্ষা করে তৈরি করা হয়। কিন্তু দেশের বাজারে থাকা ওষুধের মানে কঠোর কোনো মনিটরিং ব্যবস্থা নেই, যা খুবই দুঃখজনক। ওষুধ কখনো দুই রকম হতে পারে না।
ওই বিশেষজ্ঞ বলেন, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর যখন অভিযান চালায় তখন যে ওষুধ জব্দ করে এবং নিষিদ্ধ করে। কিন্তু সেই ওষুধ এর আগে যত দিন বাজারে ছিল তার দায় কে নেবে! যারা ওষুধ খেয়েছে এবং ক্ষতি হয়েছে তার কী হবে! কেউ যদি মারা গিয়ে থাকে সেটা কে দেখবে!
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কিছুসংখ্যক ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান নিজেরা সরকারের কাছ থেকে কোনো না কোনোভাবে লাইসেন্স বের করে নামমাত্র কিছু ওষুধ প্রস্তুত ও বাজারজাত করে থাকে। তাদের মূল ব্যবসা থেকে সরকারি কোটা কাজে লাগিয়ে বিদেশ থেকে স্বল্প মেয়াদের, কম দামের কাঁচামাল খুঁজে বের করে কিনে দেশে এনে অন্যদের কাছে বিক্রি করা।
ওই কর্মকর্তারা বলেন, মিটফোর্ডে যেভাবে প্রকাশ্যে যে হারে সারি দিয়ে শত শত দোকানে ওষুধের কাঁচমাল বিক্রি হয় তা কোথা থেকে সংগ্রহ করা হয় সেটা ভালো করে খুঁজে দেখা দরকার। কারণ মিটফোর্ডের খুচরা বিক্রেতাদের পক্ষে এত পরিমাণে কাঁচামাল আমদানি করা বা বৈধ আমদানিকারকদের কাছ থেকেও সংগ্রহ করা সম্ভব নয়। আবার এই কাঁচামালের ক্রেতা কারা সেটাও দেখা জরুরি। কারণ কোনো ভালো কোম্পানি মিটফোর্ড থেকে কাঁচামাল কিনে ওষুধ তৈরির জন্য ব্যবহার করে না। ভালো সব কোম্পানিই বাইরে থেকে সব কাঁচামাল নিয়ে আসে সরকারের অনুমতি নিয়েই।
আরেকটি কোম্পানির মহাব্যবস্থাপক খবরের কাগজকে বলেন, তিনি বর্তমান প্রতিষ্ঠানে যোগ দেওয়ার আগে যেখানে ছিলেন সেই কোম্পানিতে একজন কর্মকর্তা ছিলেন যার কাজ ছিল দেশের বাইরে কোথায় কবে কী ওষুধের কাঁচামালের অকশন ডাকা হয় সেগুলোর খোঁজখবর নেওয়া। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজার দর অনুসারে সবচেয়ে কম দামে কোথায় পাওয়া যায় সেটা খুঁজে বের করা হতো। সেই সঙ্গে বেশি নজর রাখা হতো মেয়াদ কম আছে এমন কাঁচামালের ওপর।
ওই কর্মকর্তা উদাহরণ দিয়ে বলেন, যে কাঁচামালের মেয়াদ এক বছর থাকে তার দাম যদি হয় ৫০ হাজার টাকা, সেখানে মেয়াদ যদি দুই মাস থাকে সেই মালের দাম নেমে যায় ১০ হাজার টাকায়, যা এক ধরনের অকশনে বিক্রি করা হয়। আমাদের দেশের একশ্রেণির কোম্পানির নিয়োগ করা কর্মীরা এই কাঁচামাল দেশে ঢুকিয়ে বাজারে ছেড়ে দেন। যারা এই কাঁচামাল কিনে ওষুধ তৈরি করেন তারা ওষুধের প্যাকেটের গায়ে লম্বা সময় উল্লেখ করেন।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৩০৪। এর মধ্যে ৬২ প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে বিভিন্ন কারণে। ১০০টির বেশি কোম্পানির লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে বিভিন্ন সময়ে। এর বাইরে ৬টি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন স্থগিত রাখা হয়েছে। ৪টি প্রতিষ্ঠান নিজেরাই অচল করে রেখেছেন মালিকরা। এসব কোম্পানির প্রায় দেড় হাজার জেনেরিকের বিপরীতে প্রায় ৩০ হাজার ব্র্যান্ড নামের ওষুধ এখন ছড়িয়ে আছে বাজারে।
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক মো. সালাহউদ্দীন আহম্মেদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমাদের ওষুধের খাত এখন যত বড় হয়েছে সেই তুলনায় পর্যাপ্ত মনিটরিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল নেই। এটা আমাদের বড় সংকট। তবু আমরা আমাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছি নিম্নমানের, নকল, ভেজাল ও চোরাই ওষুধ নিয়ন্ত্রণ করতে।’
ওই কর্মকর্তা বলেন, কিছু মুষ্টিমেয় অসাধু ব্যবসায়ী হয়তো কালোবাজারে গোপনে নিম্নমানের কাঁচামাল বেচাকেনা করে থাকেন। আমাদের সেটাও মনিটরিংয়ের চেষ্টা আছে। আমাদের টিম আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় অভিযান চালায়। মামলা করে, জেল-জরিমানাও হয়।
>চিকিৎসকরাও ওষুধ নিয়ে ভয়ে থাকি
>সরকারের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই