যে বয়সে এক দুরন্ত শৈশব পার করার কথা ছিল, সেই বয়সে ময়লা চটের ঝোলা কাঁধে নিয়ে প্লাস্টিকের বোতল টোকায় রকিব। বয়স কত জানে না। তবে আন্দাজ করা যায় ১৩ বা ১৪ হবে। মানুষ তাকে টোকাই নামে ডাকে। বাবা-মা ছাড়া রকিব থাকে কমলাপুর রেলস্টেশনে। তার সঙ্গে আরও অনেক শিশু থাকে। স্টেশনই তাদের ঘর যেন। যে বয়সটা তাদের কাটিয়ে দেওয়ার কথা ছিল খেলাধুলা করে, সে বয়সে টিকে থাকার জন্য তাদের যুদ্ধ করতে হচ্ছে জীবনের সঙ্গে।
কিন্তু রকিবের খেলতে ইচ্ছা করে। এই বয়সে অন্যান্য শিশুর মতো সেও চায়, ঘুম থেকে ওঠার পর ছোট মাথায় দুই বেলা খাবার জোগানোর চিন্তা থাকবে না। ছেঁড়া জামা আর ময়লা চটের বস্তা কাঁধে নিয়ে বের না হয়ে একটা পরিষ্কার জামা ও বল হাতে খেলতে বের হবে সমবয়সীদের সঙ্গে। কিন্তু খেলতে বের হলে বোতল টোকাবে কখন? বোতল না টোকালে যে, তার কপালে খাবার জুটবে না!
খেলাধুলা শুধু সাময়িক আনন্দের অনুষঙ্গ না। শিশু বিশেষজ্ঞরা বলেন, একটি শিশুর সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার জন্য খেলাধুলার কোনো বিকল্প নেই। মানুষের মেধা-মননের সুস্থ গঠনের জন্য একটি শিশুর খেলাধুলা করা দরকার। শরীর ভালো রাখার জন্য একটি শিশুর জন্য দরকার শরীরচর্চা করা। আর শরীরচর্চার একটা মজাদার মাধ্যম হতে পারে খেলাধুলা। পরিচ্ছন্ন বিনোদন ও খেলাধুলায় যে শিশু বেড়ে ওঠে, তার পক্ষে সফল মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠা সম্ভব।
বাংলাদেশে শিশুদের অধিকার নিয়ে কাজ করা অনেক সংগঠন শিশুদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশে খেলাধুলার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। সেভ দ্য চিলড্রেনের পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন খবরের কাগজকে বলেন, ‘খেলাধুলা শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের পাশাপাশি সামাজিক বিকাশেও সাহায্য করে। শারীরিক ক্ষেত্রে দৌড়ঝাঁপ করার ফলে পেশি গঠন, অস্থি গঠনসহ শারীরিক বৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করে। একই সঙ্গে খেলাধুলার ফলে মানসিকভাবেও শিশু চাঙা থাকে, চিন্তামুক্ত থাকে। সামাজিক দক্ষতার ক্ষেত্রে খেলাধুলা আত্মবিশ্বাস বাড়ায়, দলগতভাবে কাজ করার মানসিক দক্ষতা বাড়ায়, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করার দক্ষতা বাড়ায়, নানা ধরনের মানসিক চাপ কীভাবে মোকাবিলা করবে, তা শেখায়। পাশাপাশি দলগতভাবে কাজ করার দক্ষতা অর্জনের গুণগুলো এই খেলাধুলা তৈরি করে দেয়। সুতরাং এটা বলা যায়, শিশুদের বেড়ে ওঠার জন্য খেলাধুলা অপরিহার্য।’
চলতি বছরের মার্চ মাসে প্রকাশিত বাংলাদেশের পথশিশুদের ওপর ইউনিসেফের গবেষণা ‘স্ট্রিট সিচুয়েশন ইন বাংলাদেশ ২০২৪’-এর তথ্যানুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৩০ লাখ ৪০ হাজারের বেশি পথশিশু রয়েছে। এদের শিশুকাল থেকেই সংগ্রাম করে চলতে হয় জীবনের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে। জীবিকার তাগিদে ছোট বয়সেই বন্ধ হয়ে যায় তাদের স্বপ্ন দেখার আকাঙ্ক্ষা। শুধু খেয়ে-পরে বেঁচে থাকাই এই শিশুদের মূল লক্ষ্য। ফলে অল্প বয়সেই মানসিক অবসাদে ভোগে পথশিশুরা। হতাশাগ্রস্ত হয়ে বেছে নেয় মাদকের পথ। এমতাবস্থায় শিশু বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, হতাশা কাটাতে একটি মাধ্যম হতে পারে খেলাধুলা।
পথশিশুদের নিয়ে কাজ করা স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান পথশিশু সেবা সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবী রাশেদ ইসলাম খবরের কাগজকে তার অভিজ্ঞতার কথা জানান। তিনি প্রতি শুক্রবার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে পথশিশুদের নিয়ে ফিল্ডওয়ার্ক করে থাকেন। এই ফিল্ডে শিশুদের অনানুষ্ঠানিক প্রাথমিক শিক্ষা, প্রাথমিক চিকিৎসা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, খেলাধুলা করা ও স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতাবিষয়ক শিক্ষা দেওয়া হয়। এ ছাড়াও শিশুদের মননের বিকাশের জন্য শিক্ষামূলক কার্টুন ও ভিডিওক্লিপ দেখানো হয়। রাশেদ জানান, শিশুরা সবচেয়ে বেশি উপভোগ করে খেলাধুলা। সারা সপ্তাহজুড়ে বিভিন্ন কারণে তাদের যে মানসিক অবসাদ জমা হয়, এক দিনের ফিল্ডে খেলাধুলার মাধ্যমে মানসিকভাবে উৎফুল্ল থাকে তারা। রাশেদ হাসান আরও বলেন, ‘শুধু শারীরিক খেলাধুলাই না, শিশুদের মানসিক বিকাশের জন্য বিভিন্ন রকম ব্রেন-স্পোর্টসেরও আয়োজন করা হয়। এর মধ্যে পাজল, সুডুকো, সংখ্যার খেলা শিশুরা বেশি পছন্দ করে। সারা সপ্তাহ শেষে এক দিন মন ভরে খেলতে পারবে বলে এদিন শিশুরা দলে দলে ছুটে আসে এই ফিল্ডে।’
তবে একটি শিশুর সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার জন্য শুধু খেলাধুলা নয়, দরকার অন্যান্য সুস্থ বিনোদনের মাধ্যমও। বই পড়া, ছবি আঁকা, গান শোনা, ভালো সিনেমা দেখা ও কার্টুন দেখা শিশুর জীবন গঠনে কার্যকর ভূমিকা রাখে। একটি শিশুর বেড়ে ওঠা প্রয়োজন আপাদমস্তক ইতিবাচক ও সৃজনশীল পরিবেশে। তবে রকিবের মতো পথশিশুদের সে সুযোগ কোথায়?