সাদা টাইলসের মেঝের ওপর সারি সারি চাদর আর প্লাস্টিকের পাটি বিছানো। সেসব চাদর ও পাটিতে শুয়ে আছেন বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষ। বাদ নেই শিশুরাও। পাতানো বিছানার পাশ দিয়ে সারাক্ষণ মানুষের চলাফেরা। চারপাশে কোলাহল, চিৎকার-চেঁচামেচি। টিকে থাকাই দায়। তবু এসব তোয়াক্কা করার সুযোগ নেই জাহানারা বেগমের। মেঝের এক কোণে অল্প একটু জায়গা নিয়ে বসে আছেন তিনি। সামনে একটি পাতলা কাঁথায় শুয়ে আছে ১ মাস ১০ দিনের শিশু আয়ান। তার পাশেই শুয়ে আছে আয়ানের বড় ভাই আট বছরের সায়ান। পড়ন্ত দুপুরের দাবদাহে যেন তেঁতে যাচ্ছে শরীর। ছেলেদের একটু আরাম দেওয়ার উদ্দেশ্যে অনবরত হাতপাখা ঘোরাচ্ছেন ক্লান্ত এই মা।
রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে গতকাল বুধবার গিয়ে দেখা যায় এ রকম অনেক দৃশ্য। হাসপাতালের ভর্তি ওয়ার্ডের সামনে করিডরের পাশে ছোট এই জায়গাটাতে শিশুদের নিয়ে থাকছেন অনেক মা-বাবা। জাহানারা বেগম জানান, জন্মের পর থেকেই আয়ানের ডান পা বাঁকা। গত রবিবার সকালে নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলা হাসপাতালে যান তারা। সেখানে গিয়ে জানতে পারেন ডাক্তার আসবেন বুধবার সকালে। মাঝখানে বাকি দুই দিন। এ ক্ষেত্রে তারা যশোরে তাদের বাড়িতে ফিরে না গিয়ে এ হাসপাতালে আসেন। কিন্তু এখনো ভর্তি হতে পারেনি আয়ান। তাই উপায়ন্তর না পেয়ে মেঝেতে পেতেছেন শয্যা। এখানেই গরম আর কষ্ট উপেক্ষা করে থেকে যাবেন ডাক্তার না দেখানো পর্যন্ত।
হাসপাতালের মূল গেট দিয়ে ঢুকতেই দেখা মেলে আরেক শিশু মৌসুমির। দেড় বছর বয়সী শিশুটিকে কোলে নিয়ে অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে আছেন পঞ্চাশোর্ধ্ব নানী বিলকিস বানু। সামনে জড়ো করে রাখা ছোট-বড় মিলিয়ে পাঁচটি ব্যাগ। সঙ্গে রান্না করার হাঁড়ি-পাতিল। তিনি জানান, শ্বাসকষ্টের সমস্যায় ভুগছে মৌসুমি। ডাক্তার বলেছেন ভর্তি করাতে হবে। কিন্তু বেড খালি আছে একটি। নার্স জানিয়েছেন শুধু বাচ্চাকেই বেড দেওয়া যাবে। সঙ্গে কোনো অভিভাবক থাকতে পারবেন না। এত ছোট বাচ্চাকে একা রাখতে রাজি নন মা শারমিন আক্তার। আবার চিকিৎসা করানোও দরকার। কী করবেন বুঝতে পারছেন না তারা। তাই অন্যান্য অভিভাবকের মতোই করিডরের পাশের ছোট জায়গাটাতেই আশ্রয় নেবেন আপাতত। অপেক্ষা করবেন কখন খালি হবে কাঙ্ক্ষিত বেড।
হাসপাতালের নিরাপত্তা কর্মী রফিকুল ইসলাম জানান, এসব ঘটনা হাসপাতালের প্রতিদিনের চিত্র। প্রায় ৭০০ বেডের এ হাসপাতালে ভর্তি রোগী ছাড়াও বহির্বিভাগে প্রতিদিন চিকিৎসা নেয় প্রায় দেড় হাজার শিশু। এসব শিশুর স্বজনরা বেশির ভাগই গ্রাম থেকে আসা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। অনেকেই আসেন অনেক দূরের রাস্তা অতিক্রম করে। এত রোগীর সবাইকে ভর্তি রাখার সক্ষমতা হাসপাতালের নেই।
আবার দূর থেকে আসা রোগী ও স্বজনদের নিজ বাড়িতে ফিরে গিয়ে আবার এসে চিকিৎসা নেওয়ার আর্থিক সক্ষমতা নেই। এ ক্ষেত্রে সময় নষ্ট আর কষ্টও কয়েক গুণ বেশি। তাই তারা হাসপাতালের কম্পাউন্ডেই জায়গা করে কোনো রকম থাকেন। এসব জায়গায় ইলেকট্রিক ফ্যানের কোনো ব্যবস্থা নেই। প্রচণ্ড গরমে রোগী ও স্বজনদের হাঁসফাঁস অবস্থা হয়। তবুও বেড খালি পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করেন তারা।
হাসপাতালের ভর্তি ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায় শ্বাসকষ্ট আর খিঁচুনি নিয়ে ভর্তি আছে অধিকাংশ শিশু। এ ছাড়া জ্বর, ডায়রিয়া, পুষ্টি স্বল্পতা, নিউমোনিয়া, আরডিএসসহ অন্যান্য রোগ নিয়ে ভর্তি আছে অনেক শিশু। বেশির ভাগ ভর্তি রোগীর বয়সই পাঁচ বছরের নিচে। বহু রোগীই ভর্তির দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়িতে ফিরে যেতে পারছে। অনেকেই আবার দীর্ঘদিন ধরে ভর্তি আছে। একটি বেড খালি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ভর্তি হয়ে যাচ্ছে আরেক রোগী। অনেকেই আবার বেড খালি হবে জানা মাত্র বেডের আশপাশে পায়চারী করছেন, যেন কাঙ্ক্ষিত বেড হাতছাড়া না হয়ে যায়।
হাসপাতালের ডিউটি নার্স তানিয়া আক্তার জানান, হাসপাতালে সিটের সংখ্যা প্রায় ৬৯০টি। তবে রোগীর সংখ্যা তার কয়েক গুণ বেশি। তাই বেশি জরুরি অবস্থা না হলে রোগীকে ভর্তি রাখা সম্ভব হয় নয়। ভর্তি রোগী ছাড়াও প্রতিদিনই আউটডোরে প্রায় ৮০০ থেকে ১ হাজার ২০০ রোগী দেখা হয়। আবার রোগীর স্বজনদের অধিকাংশই আর্থিকভাবে অসচ্ছল। তাই তাদের সবার আকাঙ্ক্ষা থাকে বিনামূল্যের বেড পাওয়ার। বিনামূল্যের বিছানায় হাসপাতাল থেকে শিশু রোগীদের খাবারও দেওয়া হয়। খাবার একটু বেশি দেওয়া হয়, যাতে শিশুর মা সেই খাবার খেতে পারেন।
তবে রোগীর সঙ্গে থাকা অনেক মায়ের অভিযোগ খাবারের পরিমাণ দুজনের জন্য পর্যাপ্ত নয়। খাবারে স্বাদ নেই। খাবারের চেহারাও ফ্যাকাশে। চিকিৎসাব্যয় নিয়ে স্বজনদের অভিযোগও কম নয়। তিন মাসের শিশু মাইমুনা আক্তারের মা খুশবু বেগম খবরের কাগজকে জানান, প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট নিয়ে ভর্তি হওয়া শিশুটিকে আইসিইউতে রাখা হয়েছিল চার দিন। বিনামূল্যে বেড পাওয়ার আগে দুই দিন থাকতে হয়েছিল ভাড়া দিয়ে। এখানে এক দিনের শয্যা ভাড়া ৭০০ টাকা এবং আইসিইউ বেডের জন্য গুনতে হয় সর্বনিম্ন সাড়ে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত। বহির্বিভাগে টিকিটের দাম ৬০ থেকে ২০০ টাকা। এর বাইরে ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম ব্যয় তো আছেই।