রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়ালসহ চার নির্বাচন কমিশনারকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করার পরামর্শ দিয়েছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের ২৭ দিন পর গত রবিবার নিজেদের করণীয় সম্পর্কে জানতে রাষ্ট্রপতিকে টেলিফোন করেন সিইসি। রাষ্ট্রপতি তখন সিইসিকে চার কমিশনারসহ স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করে মানসম্মান নিয়ে চলে যাওয়ার পরামর্শ দেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন নির্বাচন কমিশনার গতকাল সোমবার খবরের কাগজকে জানিয়েছেন, পদত্যাগে সম্মত হওয়ার বিষয়টি রবিবারই রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে নিশ্চিত করেছেন সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়াল। তারা (সিইসি ও চার নির্বাচন কমিশনার) আগামীকাল বুধবার অথবা পরের দিন বৃহস্পতিবার পদত্যাগ করতে পারেন। সিইসি তার সহকর্মী চার নির্বাচন কমিশনারের মতামত নিয়ে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে করণীয় সম্পর্কে জানতে রাষ্ট্রপতিকে টেলিফোন করেন বলে জানা গেছে।
রাষ্ট্রপতির সঙ্গে কথোপকথনের বিষয়ে জানতে গতকাল সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়ালের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তার মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া গেছে। তবে সিইসি গতকাল অফিস করেছেন। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সঙ্গে কথোপকথন সম্পর্কে সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়াল চার নির্বাচন কমিশনারকে রবিবারই বিস্তারিত অবহিত করেছেন বলে জানা গেছে। এ সময় রাষ্ট্রপতির বক্তব্য উদ্ধৃত করেন সিইসি।
তিনি জানান, রাষ্ট্রপতি তাকে বলেছেন মানসম্মান নিয়ে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করে চলে যান। তিনি নিজেও সংকটে আছেন।
নির্বাচন কমিশনার মো. আলমগীর গতকাল খবরের কাগজকে বলেন, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সঙ্গে সিইসি টেলিফোনে কথা বলেছেন কি না, সে সম্পর্কে তিনি কিছু জানেন না। একই ধরনের কথা বলেন নির্বাচন কমিশনার মো. আনিছুর রহমান। রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সিইসির গত রবিবারের টেলিফোন আলোচনা কিংবা কমিশনের পদত্যাগের বিষয়ে এখনো তিনি অবহিত নন বলে জানিয়েছেন।
কাজী হাবিবুল আউয়াল ও নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. আহসান হাবিব খান, বেগম রাশেদা সুলতানা, মো. আলমগীর ও মো. আনিছুর রহমানকে সদ্য ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে নিয়োগ দেওয়া হয়। ২০২২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি নিয়োগ পাওয়া সিইসি ও অন্য চার নির্বাচন কমিশনারের ব্যাপারে তীব্র আপত্তি ছিল বিএনপিসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর। তাদের অধীনে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বিএনপিসহ প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো এ নির্বাচন বর্জন করে। কারচুপি ও অনিয়মের মধ্যে অনুষ্ঠিত একতরফা এই সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে টানা চতুর্থবারের মতো আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে।
গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। তার পরই সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়ালসহ চার নির্বাচন কমিশনারকে পদত্যাগ করার জন্য বিভিন্ন মহল থেকে আহ্বান জানানো হয়েছে।
কিন্তু পদত্যাগ না করে সিইসি গত ২৪ আগস্ট একটি জাতীয় দৈনিকে এক নিবন্ধে সংবিধান আংশিক অথবা পুরোপুরি স্থগিত রাখার প্রস্তাব দেন। সেই নিবন্ধ থেকে জানা গেছে, সেখানে কাজী হাবিবুল আউয়াল অভিযোগের সুরে বলেন, ‘সংসদ অসাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় ভেঙে দেওয়া হয়েছে।’
শুধু তা-ই নয়, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সংবিধান স্থগিত না করেই যেভাবে অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যক্রম চলছে, তাতে জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের বাধ্যবাধকতার কারণে নির্বাচন কমিশন ‘সাংবিধানিক সংকটে’ পড়বে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
প্রকাশিত নিবন্ধে সিইসির এই মন্তব্যের পর তাদের পদত্যাগের দাবিটি আরও জোরালো হয়েছে।
সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১১৮-এর ৩ দফায় নির্বাচন কমিশনারদের মেয়াদকাল সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘এই সংবিধানের বিধানাবলী-সাপেক্ষে কোনো নির্বাচন কমিশনারের পদের মেয়াদ তাঁহার কার্যভার গ্রহণের তারিখ হইতে পাঁচ বৎসরকাল হইবে।’
সিইসি ও নির্বাচন কমিশনারদের অপসারণ সম্পর্কে একই (১১৮) অনুচ্ছেদের দফা ৫-এ বলা হয়েছে, ‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারক যেরূপ পদ্ধতি ও কারণে অপসারিত হইতে পারেন, সেইরূপ পদ্ধতি ও কারণ ব্যতীত কোনো নির্বাচন কমিশনার অপসারিত হইবেন না।’
উল্লেখ্য, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অপসারণ সম্পর্কে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৯৬-এর দফা ২-এ বলা হয়েছে, ‘প্রমাণিত অসদাচরণ বা অসামর্থ্যের কারণে সংসদের মোট সদস্য সংখ্যার অন্যূন দুই-তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতার দ্বারা সমর্থিত সংসদের প্রস্তাবক্রমে প্রদত্ত রাষ্ট্রপতির আদেশ ব্যতীত কোনো বিচারককে অপসারিত করা যাইবে না।’
নির্বাচন কমিশনারদের পদত্যাগ সম্পর্কে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১১৮-এর দফা (৬)-এ বলা হয়েছে, ‘কোনো নির্বাচন কমিশনার রাষ্ট্রপতিকে উদ্দেশ্য করিয়া স্বাক্ষরযুক্ত পত্রযোগে স্বীয় পদ ত্যাগ করিতে পারিবেন।’
এর আগে ১৯৯০, ১৯৯৬ এবং ২০০৬ সালে আন্দোলন-অস্থিরতার মধ্যে সরকার পরিবর্তনের পর প্রথমেই নির্বাচন কমিশনারদের পদত্যাগ করতে হয়েছিল। এবার আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের চাপে প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানকে পদত্যাগ করতে হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারও বিদায় নিয়েছেন। দেশের বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরাও পদত্যাগ করেছেন।