দেশের বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের নামে ইজারা থাকা হাটবাজার, বালুমহাল ও খেয়াঘাট এখন স্থানীয় বিএনপিসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এগুলো ইজারা দেওয়া হয়েছিল। ইজারার মেয়াদকাল এক বছর। চলতি বছরের ১৪ এপ্রিল থেকে মেয়াদ শুরু হয়েছে এবং আগামী বছরের (২০২৫ সাল) ১৩ এপ্রিল (বাংলা সন ১৪৩১) শেষ হবে।
গত ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর থেকে আওয়ামী লীগের প্রায় সব নেতা-কর্মী আত্মগোপনে আছেন। এর মধ্যে হাটবাজার ইজারা গ্রহণকারীরাও গা ঢাকা দিয়েছেন। প্রকৃত ইজারাদার না থাকায় যারা হাসিল আদায় করছেন তারা সেই টাকা নিজেদের পকেটে ভরছেন। অনেক ইজারাদার আত্মগোপনে থেকেও হাটবাজার বেদখলের বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও থানাসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানিয়েছেন। কিন্তু কোনো সুরাহা হয়নি।
রাজধানীর কেরানীগঞ্জে একটি হাট দখলের ঘটনাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে খবরের কাগজের প্রতিনিধিদের পাঠানো প্রতিবেদনে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতিনিধিরা হলেন ময়মনসিংহের কামরুজ্জামান মিন্টু, রাজশাহীর এনায়েত করিম, খাগড়াছড়ির দিদারুল আলম রাজু, পাবনার পার্থ হাসান ও ঝিনাইদহের মাহফুজুর রহমান।
ঢাকা: ঢাকার কেরানীগঞ্জের হযরতপুর পশুর হাটটি সর্বোচ্চ ডাকে ৩ কোটি ৬২ লাখ টাকায় ইজারা পান স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন আয়নালের ছোট ভাই মজিবুর রহমান। গত ৪ আগস্ট পর্যন্ত হাটের নিয়ন্ত্রণ তার দখলে ছিল। ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর তিনি হাটটির নিয়ন্ত্রণ হারান। স্থানীয় একটি রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা হাটটি জোরপূর্বক দখল করেন বলে অভিযোগ করেন।
১৫ আগস্ট ইউএনও বরাবর ডাকযোগে পাঠানো অভিযোগপত্রে তিনি উল্লেখ করেন, হাট দখলকারীরা ১০ আগস্ট তাকে প্রাণনাশের হুমকি দিলে তিনি এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যান। এই সুযোগে দখলকারীরা হাট থেকে অবৈধভাবে হাসিল আদায় করে সব টাকা নিয়ে যাচ্ছেন। এ অবস্থায় সরকারের রাজস্ব হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
ময়মনসিংহ: গত ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর ময়মনসিংহের হাটবাজার ইজারা নেওয়া আওয়ামী লীগ নেতারাও গা ঢাকা দেন। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বিএনপির কিছু অসাধু নেতা-কর্মী ওই সব হাটবাজারের দখল নেন বলে অভিযোগ ওঠে। এই দখলবাজির ঘটনায় বিএনপির দুই গ্রুপের নেতা-কর্মীরা নিজেদের মধ্যেই সংঘর্ষে জড়ান। এতে একজন নিহত হন। তবে স্থানীয় বিএনপির শীর্ষ নেতারা এসবের দায় অস্বীকার করেছেন।
গত ৭ আগস্ট বেলা আড়াইটার দিকে উপজেলার যুবদল কর্মী জসিম উদ্দিনের নেতৃত্বে তার সমর্থকরা পৌর শহরের নতুনবাজার ম্যাক্সি স্ট্যান্ড দখল করতে যান। সেখানে যুবদলের আরেক পক্ষ সুমনের সমর্থকদের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় সুমনের সমর্থকরা জসিম উদ্দিনকে কুপিয়ে হত্যা করেন। সংঘর্ষে যুবদলের পাঁচ কর্মী আহত হন। পরে এ হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবিতে জসিম উদ্দিনের লাশ নিয়ে পৌর এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল করেন বিএনপির একাংশের নেতা-কর্মীরা। বিক্ষোভকারীরা বিএনপির কয়েকজন নেতা-কর্মীর বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেন।
এদিকে ভালুকা উপজেলার কাচিনা বাজারের ইজারা জোরপূর্বক প্রকৃত ইজারাদার ও আওয়ামী লীগ নেতা শফিকুল ইসলাম ফকিরের কাছ থেকে ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে লিখে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বাবুল সরকারের বিরুদ্ধে। বাবুল উপজেলা বিএনপির নেতা মিজানুর রহমান মিজানের রাজনৈতিক অনুসারী।
ঈশ্বরগঞ্জ সদরে পানের হাট দখলে নিয়েছেন বিএনপির নেতা-কর্মীরা। ক্ষমতার পালাবদলের পর শিল্পাঞ্চল এলাকা হিসেবে পরিচিত ভালুকায় একটি পক্ষ জুট ও শ্রমিক পরিবহনের ব্যবসা হস্তগত করতে তৎপর হয়।
অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা বিএনপির সদস্য মিজানুর রহমান বলেন, ‘ইজারাদার শফিক ফকির তার আত্মীয় বাবুল সরকারকে বাজারের ইজারা লিখে দিয়েছেন। এতে আমি জড়িত নই। আমাকে রাজনীতির মারপ্যাঁচে ফেলতে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে।’
ময়মনসিংহের পুরান ব্রহ্মপুত্র নদের বালুমহালের ইজারা পেয়ে বৈধ ও অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছিলেন আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। বর্তমানে সেখান থেকেই বিএনপির কিছু নেতা-কর্মী অবৈধভাবে কোটি কোটি টাকার বালু তুলে বিক্রি করে সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এসব অবৈধ কর্মকাণ্ডের দায় নিতে নারাজ স্থানীয় বিএনপির শীর্ষ নেতারা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে গফরগাঁও উপজেলা বিএনপির এক নেতা খবরের কাগজকে বলেন, এই উপজেলায় বিএনপির রাজনীতি অন্তত পাঁচটি উপদলে বিভক্ত। নিজেদের মধ্যে দখল ও ভাগবাঁটোয়ারা নিয়ে ওই দুটি খুনের ঘটনা ঘটেছে। এসবের দায় নেবেন না বিএনপির স্বচ্ছ-ক্লিন ইমেজের কোনো নেতা।
একই উপজেলার বিএনপি আহ্বায়ক ফখরুদ্দিন আহমেদ বাচ্চু বলেন, ‘আমাকে ভুল বুঝে দল বহিষ্কার করেছে। তাই আমি দলের হাইকমান্ডের সঙ্গে কথা বলছি। নিশ্চয়ই পদ ফিরে পাব।’
বিএনপির ময়মনসিংহ বিভাগীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক আবু ওয়াহাব আকন্দ বলেন, গফরগাঁওয়ে নিহত দুজনই যুবদলের কর্মী। এতে রাজনৈতিক কোনো বিষয় ছিল না। দলের সুযোগসন্ধানী কোনো কর্মীর পক্ষে নেতারা নেই। কারণ তারা দলকে ভালোবাসে না।
টেন্ডার ছাড়া সরকারি বালু বিক্রির সুযোগ নেই উল্লেখ করে ময়মনসিংহের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) শিহাব উদ্দিন আহমেদ বলেন, টেন্ডার প্রক্রিয়া চলমান আছে। এর আগে কেউ বালু বিক্রি করলে তা হবে বেআইনি। লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
রাজশাহী: উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ রাজশাহী সিটি হাটের ইজারাদার আতিকুর রহমান কালু। তিনি মহানগর আওয়ামী লীগের বোয়ালিয়া থানা শাখার সাধারণ সম্পাদক। সম্প্রতি একটি হত্যা মামলার আসামি হয়ে তিনি পলাতক আছেন। একই অবস্থা রাজশাহীর খড়খড়ি হাটের। এই হাটের ইজারাদার আওয়ামী লীগ নেতা এমদাদ আলীও এখন পলাতক। এ ছাড়া রাজশাহী জেলা যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক রফিকুল ইসলামসহ অন্যরা নিলামে রাজশাহী নগরীর লক্ষ্মীপুর, সাহেব বাজার, কোর্ট বাজারসহ বিভিন্ন হাট ইজারা নিয়েছিলেন। সরকার পতনের পর তারাও এখন পলাতক। এ হাটগুলো এখন বিএনপি নেতাদের দখলে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
পাবনা: জেলার অন্যতম বড় হাট ঈশ্বরদী উপজেলার আওতাপাড়া হাট। ২ কোটি ৬৭ লাখ ৪১ হাজার টাকায় এক বছরের জন্য হাটটি সরকারিভাবে ইজারা পান আব্দুল কুদ্দুস ফকির। ইজারা পাওয়ার পর থেকে হাটের খাজনা আদায় করে আসছিলেন তিনি। কিন্তু হঠাৎ করেই শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর হাটটি অবৈধভাবে দখলে নিয়েছেন সাহাপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রমজান আলী, ইউনিয়ন বিএনপির প্রচার সম্পাদক টিক্কা মণ্ডল ও বিএনপি নেতা রতন।
ইজারাদারদের অভিযোগ, গত ৭ আগস্ট সাহাপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রমজান আলীর নেতৃত্বে স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মীরা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হাটে প্রবেশ করে ইজারাদার ও হাট কমিটির সদস্যদের মারধর করে বের করে দেন। লুট করে নেন ১২ লাখ টাকা। তার পর থেকে প্রতি হাটে অবৈধভাবে খাজনা আদায় করছেন তারা। আর খাজনা আদায় করতে না পারায় বিপুল অঙ্কের টাকার ক্ষতির মুখে পড়েছেন ইজারাদাররা। এমন পরিস্থিতিতে হাট ফিরে পেতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন তারা।
হাট দখল ও খাজনা তোলার কথা স্বীকার করে অভিযুক্তরা বলেন, আওয়ামী শাসনামলে তারা খুব নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাই সবাইকে নিয়ে তারা মানুষকে স্বস্তি দিতে নামমাত্র মূল্যে খাজনা তুলছেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জবরদখলের কোনো সুযোগ নেই। প্রমাণ হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঝিনাইদহ: হরিণাকুণ্ডু পৌরসভার অধীন পার্বতীপুরের পানহাট ২০২২-২৩ অর্থবছর (১৪৩০ বাংলা) ১০ লাখ টাকায় ইজারা পেয়েছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা খায়রুল ইসলাম। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে (১৪৩১ বাংলা) ওই হাট থেকে হাসিল আদায় করছিল পৌরসভা। পার্বতীপুরের পানহাটটি তাদের দখলে নিতে চেষ্টা চালাচ্ছেন স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মীরা। এ ছাড়া তারা জেলার অনেক হাটের বৈধ ইজারাদারের লোকজনকে সরিয়ে দিয়ে সেখান থেকে অবৈধভাবে টাকা তুলছেন। উপজেলার ভবানীপুরের পানহাট ২৫ লাখ টাকায় ইজারা নেন অহিদুল ইসলাম ও সাধারণ হাট ১৫ লাখ টাকায় ইজারা নেন আকরাম মিয়া। তাদের হাসিল আদায়ে বাধা দেওয়া হয়। পরে ইউনিয়ন বিএনপির নেতা বদর উদ্দিন মোল্লা ও রাসু কাজীর অনুসারীদের সঙ্গে ৩ লাখ টাকায় সমন্বয় করে হাটের ইজারাদার অহিদুল ইসলাম ও আকরাম মিয়া হাসিল তুলছেন। জেলার অধিকাংশ হাটবাজার বিএনপির দখলে। জেলার এমন কোনো হাট নেই যেখানে বিএনপি তাদের দখলদারত্ব করেনি।
খাগড়াছড়ি: জেলা সদরসহ ৯ উপজেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে হাটবাজারের সংখ্যা ৩৬। এর মধ্যে খাগড়াছড়ি সদরে ৩টি, পানছড়িতে ৩টি, দীঘিনালায় ৪টি, মহালছড়িতে ২টি, মাটিরাঙ্গায় ১১টি, গুইমারায় ৩টি, রামগড়ে ২টি, মানিকছড়িতে ৭টি এবং লক্ষ্মীছড়িতে ১টি হাটবাজার রয়েছে। আর এই বাজারগুলো পরিচালিত হয় খাগড়াছড়ি বাজার ফান্ড প্রশাসক কার্যালয়ের মাধ্যমে। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির শর্ত অনুযায়ী খাগড়াছড়ি বাজার ফান্ড পার্বত্য জেলা পরিষদের কাছে ন্যস্ত হওয়ায় মূলত এর নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান পার্বত্য জেলা পরিষদ।
আওয়ামী শাসনের সাড়ে ১৫ বছর ধরে প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতারাই জেলার প্রতিটি হাটবাজার নিয়ন্ত্রণ করতেন। জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি, সাবেক পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা ও তার জামাতা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক মংসুইপ্রু চৌধুরী অপু ছিলেন এই সিন্ডিকেটের প্রধান। তবে ৫ আগস্টের পর থেকে আর কেউ এলাকায় না থাকায় খাগড়াছড়ির হাটবাজারগুলো অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছে। সরকার পতনের প্রথম কয়েক দিন জাতীয় ও আঞ্চলিক কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নাম ভাঙিয়ে টোল আদায় করা হলেও পরে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপে তা বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে খাগড়াছড়ির হাটবাজারগুলোতে টোল আদায় বন্ধ রয়েছে।
খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা সুমন চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, ‘জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা ৪ আগস্টের পর আর কার্যালয়ে আসেননি। এ ছাড়া বাজার ফান্ডের যিনি প্রশাসক ছিলেন তিনিও সদ্য পদোন্নতি পেয়ে যুগ্ম সচিব হয়েছেন। শুনছি, শিগগিরই নতুন করে জেলা পরিষদ গঠন হতে যাচ্ছে। নতুন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত হাটবাজারগুলোতে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরবে না।’