ঢাকা ৯ আষাঢ় ১৪৩৩, মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
নতুন ও প্রথম আয়কর রিটার্ন  দাখিলকারীর প্রতি পরামর্শ সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় জিএম কাদেরের নিন্দা ও উদ্বেগ অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ডব্লিউইএফ প্রেসিডেন্টের সাক্ষাৎ ওয়ান ব্যাংক থেকে নগদে তাৎক্ষণিক টাকা পাঠানোর সেবা চালু Wisdom of King Soloman বিষয়ক Story Writing নিয়ে আলোচনা, ২য় পর্ব, এইচএসসির ইংরেজি ১ম পত্র শুধু সাফল্য নয়, অনিয়মও তুলে ধরুন—সাংবাদিকদের প্রাণীসম্পদ মন্ত্রী উন্নত স্বাস্থ্যসেবা ও বিশেষ সুবিধা নিশ্চিতে মাস্টারকার্ড ও অ্যাসেন্ট হেলথ লিমিটেডের অংশীদারিত্ব ক্যালিফোর্নিয়ার আকাশে বাংলাদেশের রং নায়িকা ববি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে বললেন বাশার তার স্বামী নন ইউল্যাবে জেন্ডার সমতা, সামাজিক ন্যায়বিচার বিষয়ক প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত পানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে এশিয়ার দেশগুলোর সম্মিলিত উদ্যোগের তাগিদ স্পিকারের সাহিত্যের খেলা প্রবন্ধর ৪০টি জ্ঞানমূলক প্রশ্ন ও উত্তর, ১ম পর্ব, এইচএসসির বাংলা ১ম পত্র প্রাইভেট ব্যাংকে চাকরির সুযোগ সিয়াটলে যাওয়ার অনুমতি পেল না মিশর ডিবি পরিচয়ে ব্যবসায়ীর বাড়িতে তাণ্ডব, আসবাবপত্র ভাঙচুরের পর লুটপাট জর্ডান ম্যাচে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত স্কালোনির লক্ষ্মীপুরে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যের প্রতিবাদে যুবদলের বিক্ষোভ পোড়া ক্ষত সারাতে তেলাপিয়া মাছের চামড়া, চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন সম্ভাবনা দাউদকান্দি পৌরসভার ৪৩ কোটি টাকার উন্মুক্ত বাজেট ঘোষণা ব্র্যাকের প্রশিক্ষণ শেষে নারীরা পেলেন পেশাদার চালকের সনদ সিএনজি সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য: জিম্মি যাত্রীরা বিপৎসীমার ওপরে তিস্তার পানি, নিম্নাঞ্চলে বন্যার আশঙ্কা সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী অসামান্য গদ্যশৈলীর রূপকার টেকনাফে যাত্রীবাহী বাস খাদে পড়ে আহত ১০ মুক্তমঞ্চে খেলা দেখা নিয়ে শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ রোবোটিক্স প্রতিযোগিতায় চ‍্যাম্পিয়ন লিডিং ইউনিভার্সিটি দল আখাউড়ায় ‘পার্টনার কংগ্রেস’ গোল্ডেন বুট নিয়ে ভাবছেন না কিলিয়ান এমবাপ্পে সাবেক ভূমিমন্ত্রীসহ ৩৬ আসামির মামলায় আরও ৭ সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ অস্তিত্ব সংকটে মমতার তৃণমূল

পেশাজীবীদের কারণে রাষ্ট্র ও জনগণের বিপুল ক্ষতি

প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৪, ০১:১৭ পিএম
আপডেট: ০৯ অক্টোবর ২০২৪, ০১:২৪ পিএম
পেশাজীবীদের কারণে রাষ্ট্র ও জনগণের বিপুল ক্ষতি
খবরের কাগজ গ্রাফিকস

দলীয় রাজনীতির কারণে বিভক্ত হয়ে পড়ছেন পেশাজীবীরা। শিক্ষক, আমলা, সাংবাদিক, আইনজীবী, ডাক্তার, প্রকৌশলীসহ বিভিন্ন পেশাজীবীরা দলীয় লেজুড়বৃত্তির কারণে সমালোচিত হচ্ছেন। আবার দলীয় পরিচয়ে বিভিন্ন অনিয়ম, সুযোগ-সুবিধা নেওয়ার ফলে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে হয়ে পড়ছেন কোণঠাসা। অথচ নিরপেক্ষ ভূমিকার মাধ্যমে এসব পেশায় নিয়োজিতদের দেশের আর্থসামাজিকসহ নানা ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখার সুযোগ রয়েছে। এই বিভক্তির কারণে এসব পেশা থেকে সর্বস্তরের জনসাধারণ যেভাবে উপকৃত হওয়ার কথা ছিল, সেটি ব্যাহত হচ্ছে। পেশাজীবীদের রাজনৈতিক বিভক্তিকে রাষ্ট্রের বিপুল ক্ষতি হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ রিসার্চ অ্যান্ড ইনোভেশনের পরিচালক এবং লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোবাশ্বের মোনেম খবরের কাগজকে বলেন, ‘পেশাজীবীদের দলীয় পরিচয়ে বিভক্তি পেশার জন্য অশুভ। যদি রাজনৈতিক বিভক্তি না থাকত, তাহলে তারা সম্মিলিতভাবে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে যেকোনো সরকারের সঙ্গে দর-কষাকষি করতে পারতেন। যৌক্তিক দাবি উপস্থাপন করতে পারতেন। কিন্তু এখন দলীয় পক্ষ থাকার কারণে সরকার অন্য পক্ষের যৌক্তিক দাবিও আমলে নেয় না। এই বিভক্তির কারণে তারা নিজ পেশায় যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্রেরও ক্ষতি হচ্ছে।’

শিক্ষকদের লেজুড়বৃত্তির কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অস্থিরতা ও শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে শিক্ষকদের হেনস্তার ঘটনা ঘটে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে প্রান্তিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও এ থেকে বাদ যায়নি। অনেককে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। যারা এসব কাজে যুক্ত ছিলেন তাদের বক্তব্য হলো- তারা অতীতে রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। অনেক শিক্ষককে একাডেমিকভাবে বয়কটের ঘোষণা দেওয়া হয়। বর্তমানে শিক্ষার সব স্তরেই লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি বন্ধের কথা বলা হচ্ছে। শিক্ষকদের লেজুড়বৃত্তির কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অস্থিরতা বিরাজ করছে এবং শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিক্ষকতাও মহান পেশা। মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষকরা। তারা হবেন শিক্ষার্থীদের আইডল। তাদের অবশ্যই রাজনৈতিকভাবে সচেতন থাকতে হবে, দলীয় কর্মীর চরিত্র ধারণ করা কোনোভাবেই উচিত নয়। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে আওয়ামী লীগ, বিএনপি-জামায়াত, প্রগতিশীল (বামপন্থি) শিক্ষকরা নীল, সাদা, হলুদ, গোলাপিতে এখনও বিভক্ত। অন্যদিকে কলেজ, স্কুল পর্যায়ের শিক্ষকদের সংগঠনেও দলীয় লেজুড়বৃত্তি আছে। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোরও রয়েছে শিক্ষক সংগঠন। শিক্ষকরা দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠতে না পারায় মর্যাদা ক্ষুণ্ন হচ্ছে। শিক্ষকদের এসব বিভক্তির কারণে শিক্ষানীতি, শিক্ষাক্রমসহ শিক্ষার নীতিনির্ধারণী বিষয়গুলোতেও চরম মতবিরোধ দেখা যাচ্ছে।

আমলাদের বিভক্তিতেই তৈরি প্রশাসনিক জটিলতা
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সরকারের নির্বাহী বিভাগের অংশ হলেন আমলারা। সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের চাবিকাঠি হিসেবে ধরা হয় তাদের। আমলারা যদি নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করেন, তাহলে সুশাসন নিশ্চিত হয় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। 

স্বাধীনতার পর থেকে নব্বই সাল পর্যন্ত অনেকটা এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা ছিল, যা আমলানির্ভর। নব্বইয়ের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পর নাগরিক রাষ্ট্রের প্রত্যাশা থাকলেও উল্টো আমলাদের মধ্যে রাজনৈতিক বিভাজনের প্রবণতা তৈরি হয়, যা মূলত দুই দলকেন্দ্রিক। অন্য দলের সমর্থক আমলাদের ওএসডি করার প্রক্রিয়াও বাড়তে থাকে। সেই থেকে ক্ষমতাসীনরা নিজেদের সমর্থকদের বাইরের আমলাদের কোণঠাসা করে রাখেন। ক্ষমতার পালাবদলেও চিত্র থাকে একই। পদোন্নতির ক্ষেত্রেও ব্যক্তির কাজের মূল্যায়নের চেয়ে মুখ্য হয়ে ওঠে দলীয় আনুগত্য। এসব কারণেই গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সচিবালয়ে তৈরি হয় বিশৃঙ্খলা। বিগত সময়ে নিজেদের বঞ্চিত দাবি করে কর্মসূচি পালন করেন কর্মকর্তারা। তাদের অনেককে পদোন্নতি দেওয়া হয়। 

রাজনৈতিক এই বিভক্তির প্রভাব পড়ে ক্যাডারভিত্তিক সংগঠনগুলোর নেতৃত্বেও। অনেকটা দলীয় বিবেচনায় তারা এসব সংগঠনের নির্বাচনে অংশ নেন। দলীয়ভাবেই মন্ত্রণালয়সহ সর্বস্তরের একটা চেইন তৈরি করে ফেলেন। ফলে ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানের মৌলিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।

অন্যদিকে বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে সব ক্যাডার নিয়োগ হলেও সরকারের বিভিন্ন কাজে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিই বেশি। এই ক্যাডারে পদোন্নতি আর সুযোগ-সুবিধা অন্য ক্যাডারগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। ফলে দীর্ঘদিন ধরে বিরাজ করছে আন্তক্যাডার বৈষম্য। সব ক্যাডারের মধ্যে সমতা বিধানের দাবিও জোরালো হচ্ছে। 

এই দলীয় পরিচয়ই আমলাদের অনিয়ম করার সুযোগ তৈরি করে দেয় বলে মনে করেন প্রশাসনসংশ্লিষ্টরা। ফলে সম্প্রতি সরকার পরিবর্তনের পর আমলাদের নানা অপরাধ সামনে আসছে। অনেক আমলাকেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এমনটা আগে দেখা যায়নি। 

আইনজীবীদের বিভক্তিতে প্রভাব বিচারালয়ে 
আদালত অঙ্গনেও রাজনৈতিক বিভক্তি প্রকট। এর প্রভাব পড়ছে বিচারালয়েও। রাজনৈতিক আদর্শের ওপর ভিত্তি করে আইনজীবীদের একাধিক সংগঠন রয়েছে। এমনকি, একই দলীয় আদর্শের দুটি সংগঠনও রয়েছে। বর্তমানে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ, গণতান্ত্রিক আইনজীবী সমিতি, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম, ইসলামিক ল’ ইয়ার্স ফোরামের কার্যক্রম রয়েছে। এ ছাড়া আইনজীবীদের আরও চার থেকে পাঁচটি সংগঠন রয়েছে।

দলীয় বিভক্তির কারণে আদালত প্রাঙ্গণও উত্তপ্ত থাকে। অনেক সময় রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘিরে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। আইনজীবীদের দলীয় মতাদর্শের ভিত্তিতে বিভক্তির কারণে বিচারকাজেও প্রভাব পড়ে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

দ্বিধাবিভক্ত সাংবাদিকরা, দাবি আদায়ে সমন্বয়হীনতা, ক্ষতিগ্রস্ত সাংবাদিকতা
সাংবাদিকতা পেশাকে বলা হয়ে থাকে ‘মহান পেশা’। অন্যতম কারণ এই যে অন্য পেশাজীবীদের পক্ষে যেটা সম্ভব না, সে রকম কর্মসম্পাদন করা যায় সাংবাদিকতার মাধ্যমে। বিবদমান দুই পক্ষের মধ্যে সাংবাদিকতার মাধ্যমে চাইলে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বিরাজে ভূমিকা রাখা যায়। কিন্তু এখন উল্টো সাংবাদিক সমাজের মধ্যে নানা ধরনের বিভক্তি। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাংবাদিকতা। পেশাদার সাংবাদিক সংগঠন থাকলেও রাজনৈতিক আদর্শের কারণে একাধিক সাংবাদিক সংগঠনের পাশে লিখতে হয় ‘একাংশ’। জাতীয় প্রেসক্লাব, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির পাশাপাশি দেশে রয়েছে বহু সাংবাদিক সংগঠন। রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত রয়েছে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে) ও বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে)। অন্যদিকে বিটভিত্তিক সাংবাদিক সংগঠনেও রয়েছে বিভক্তি। এমনকি একটি বিটকে কেন্দ্র তিনটি সংগঠনও রয়েছে।

পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, দেশে সংবাদপত্র ও অনলাইন পোর্টালের তালিকা যেভাবে বড় হয়েছে, তেমনিভাবে সাংবাদিকদের সংখ্যাও বেড়েছে। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে অনেকেই রাতারাতি সাংবাদিক বনে যাচ্ছেন, ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির লক্ষ্যে সাংবাদিকতাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন। ফলে সাংবাদিকদের মধ্যে ঐক্য তৈরি হচ্ছে না। এই দ্বিধাবিভক্তির কারণে নিজেদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর টেকসই উদ্যোগ কেউই নিতে পারছেন না। আবার কোনো সাংবাদিক আহত বা আক্রান্ত হলেও পাশে থাকতে পারছে না সাংবাদিকদের পুরো সমাজ। গত দেড় দশকে সাংবাদিক নির্যাতন কিংবা হত্যার ঘটনায়ও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে দেখা যায়নি বিভিন্ন সংগঠনকে। ফলে এখনো অধরা সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনীর হত্যার বিচার। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. সাইফুল আলম চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, ‘এই বিভেদটা দীর্ঘদিনের। প্রেসক্লাবকে কেন্দ্র করে বিভেদ এমন পর্যায়ে গেছে যে অনেক জেলায় দু-তিনটা প্রেসক্লাব রয়েছে। এমনকি একই ভবনেও। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে গণামাধ্যম নিয়ে সুনির্দিষ্ট পলিসি নিতে হবে। বর্তমানে গণমাধ্যম নিয়ে ৬০টির মতো পলিসি রয়েছে। কিন্তু একটি পলিসির (আমব্রেলা পলিসি) মাধ্যমে সেখানে শাখাভিত্তিক পলিসি নিতে হবে। এ জন্য এমন একটি সংস্থা বা কমিশন গঠন করা যেতে পারে যেখানে সাংবিধানিক পদ থাকবে, যা হবে দল নিরপেক্ষ। যারা বার কাউন্সিলের মতো সাংবাদিকদের যাবতীয় বিষয় নির্ধারণ করবে। এই পেশায় দলীয় লেজুড়বৃত্তি বন্ধ করতে হবে।’

স্বাস্থ্য খাতে স্বাচিপ বনাম ড্যাব, ব্যাহত চিকিৎসা সেবা
স্বাস্থ্য খাতে ডাক্তারদের রাজনৈতিক বিভক্তিও চরমে। ক্ষমতার পালাবদলে চলে আওয়ামী লীগপন্থি স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ) এবং বিএনপিপন্থি ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)-এর দাপট। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে স্বাস্থ্য খাতের সবকিছুই ছিল স্বাচিপের নিয়ন্ত্রণে। কোথাও ছিল অভ্যন্তরীণ বিরোধ। ২০১৩ সালে শিশু হাসপাতালে তৈরি হয়েছিল অচলাবস্থা। গত ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর স্বাচিপের জায়গায় ড্যাবের ডাক্তারদের কর্মতৎপরতা বেড়েছে। আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পদে থাকা ডাক্তাররা হাসপাতাল ছাড়েন। কোয়ার্টারও ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যান অনেকেই। এর ফলে দারুনভাবে ব্যাহত হয়েছে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা সেবা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন প্রখ্যাত চিকিৎসক বলেন, ‘রাজনৈতিক সংস্কৃতি কত নিম্নপর্যায়ে গেলে ডাক্তারের মতো মানবিক পেশার লোকজনকেও হাসপাতাল ছাড়তে হয়। দলীয় লেজুড়বৃত্তি বাদ দিয়ে নিজের পেশাগত কাজে সক্রিয় থাকলে এসব পেশাজীবী দেশের সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হতেন।’

রাজনৈতিক দলাদলিতে বাদ নেই প্রকৌশলীরা
প্রকৌশলীরাও দলীয় সমর্থন নিয়ে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশ (আইইবি) এবং ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্সের (আইডিইবি) নির্বাচনে অংশ নেন। এই দলীয় বিভক্তির কারণে এসব প্রতিষ্ঠানেও অচলাবস্থা তৈরি হয়। যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, তারা সেখানে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। এ সেক্টরে আওয়ামী লীগের বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদ এবং বিএনপি-সমর্থিত ‘অ্যাসোসিয়েশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (অ্যাব)’ সক্রিয় রয়েছে।

>দলদাস হওয়া যাবে না

বরিশালে অর্থনৈতিক ইউনিট বেড়েছে, পিছিয়ে কর্মসংস্থানে

প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬, ০৮:৪৪ এএম
আপডেট: ২৩ জুন ২০২৬, ০৮:৪৭ এএম
বরিশালে অর্থনৈতিক ইউনিট বেড়েছে, পিছিয়ে কর্মসংস্থানে
ছবি: সংগৃহীত

দেশে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিস্তারের ধারায় গত এক দশকে বরিশাল বিভাগে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, ক্ষুদ্র উদ্যোগ ও সেবা খাতের সম্প্রসারণের ফলে বিভাগে অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৭৮ দশমিক ২ শতাংশ। তবে অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা বাড়লেও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে দেশের অন্যান্য বিভাগের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে বরিশাল। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রকাশিত ‘অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪’-এর জাতীয় প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে বরিশাল বিভাগে মোট অর্থনৈতিক ইউনিট রয়েছে ৬ লাখ ৫৬ হাজার ৯৪৪টি। ২০১৩ সালের শুমারিতে এ সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৬৮ হাজার ৫৬২টি। সে হিসাবে এক দশকে নতুন করে যুক্ত হয়েছে ২ লাখ ৮৮ হাজার ৩৮২টি অর্থনৈতিক ইউনিট।

দেশের মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের মধ্যে বরিশাল বিভাগের অংশীদারত্ব ৫ দশমিক ৬১ শতাংশ। অর্থাৎ দেশের প্রতি ১০০টি অর্থনৈতিক ইউনিটের মধ্যে প্রায় ছয়টি বরিশাল বিভাগে অবস্থিত।

তবে কর্মসংস্থানের চিত্র তুলনামূলকভাবে ভিন্ন। শুমারির তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন অর্থনৈতিক ইউনিটে বর্তমানে ১২ লাখ ৭৯ হাজার ১২০ জন কর্মরত রয়েছেন। এটি জাতীয় কর্মসংস্থানের মাত্র ৪ দশমিক ১৮ শতাংশ। কর্মসংস্থানের দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে ঢাকা বিভাগ, যেখানে রয়েছে জাতীয় কর্মসংস্থানের ৯ দশমিক ৫১ শতাংশ।

অর্থনৈতিক শুমারির তথ্য অনুযায়ী, বরিশালের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বড় অংশই সেবা খাতনির্ভর। বিভাগে মোট ৫ লাখ ৯৬ হাজার ৩৯২টি অর্থনৈতিক ইউনিট সেবা খাতের আওতায় পরিচালিত হচ্ছে। এটি মোট ইউনিটের প্রায় ৯০ দশমিক ৮ শতাংশ। অন্যদিকে শিল্প খাতে রয়েছে ৬০ হাজার ৫৫২টি ইউনিট, যা মোট ইউনিটের ৯ দশমিক ২ শতাংশ।

প্রতিবেদনে আরও দেখা গেছে, বরিশালের অর্থনৈতিক ইউনিটগুলোর বড় অংশই ক্ষুদ্র, কুটির ও পারিবারিক পর্যায়ের উদ্যোগ। আকারভিত্তিক শ্রেণিকরণে বিভাগে কুটিরশিল্প রয়েছে ২ লাখ ৪৮ হাজার ৪১২টি এবং মাইক্রো শিল্প রয়েছে ৩ লাখ ৮৬ হাজার ৫৭৪টি। এ ছাড়া ক্ষুদ্র শিল্প রয়েছে ২০ হাজার ১৪০টি, মাঝারি শিল্প ১ হাজার ৫৬৯টি এবং বৃহৎ শিল্প মাত্র ২৪৯টি।

বরিশাল বিভাগের মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের মধ্যে স্থায়ী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৩ লাখ ৬৬ হাজার ৯৩৮টি। অস্থায়ী প্রতিষ্ঠান রয়েছে ১৯ হাজার ৯৪৬টি। আর অর্থনৈতিক খানা বা পারিবারিক অর্থনৈতিক ইউনিট রয়েছে ২ লাখ ৭০ হাজার ৬০টি।

কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও স্থায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর অবদান বেশি। এসব প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত রয়েছেন ৮ লাখ ৯৭ হাজার ৪৬৮ জন। অর্থনৈতিক খানাগুলোতে কর্মরত আছেন ৩ লাখ ৫৬ হাজার ৩৩৩ জন এবং অস্থায়ী প্রতিষ্ঠানে রয়েছেন ২৫ হাজার ৩১৯ জন।

জেলাভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, অর্থনৈতিক ইউনিট ও কর্মসংস্থান উভয় ক্ষেত্রেই শীর্ষে রয়েছে বরিশাল জেলা। জেলায় মোট অর্থনৈতিক ইউনিট ১ লাখ ৭২ হাজার ৬৭৬টি এবং কর্মরত রয়েছেন ৩ লাখ ৭১ হাজার ৫৯২ জন।

এর পর রয়েছে পটুয়াখালী। সেখানে অর্থনৈতিক ইউনিট ১ লাখ ৩২ হাজার ১৬৪টি এবং কর্মসংস্থান ২ লাখ ৪৫ হাজার ৯৬ জন। ভোলায় রয়েছে ১ লাখ ১৮ হাজার ৮৮৯টি ইউনিট এবং ২ লাখ ২১ হাজার ৬৯৪ জন কর্মরত।

পিরোজপুরে ৯৫ হাজার ৬০০টি ইউনিটে কর্মরত রয়েছেন ১ লাখ ৮৪ হাজার ৬৩২ জন। বরগুনায় রয়েছে ৭৪ হাজার ৬৭০টি ইউনিট এবং ১ লাখ ৪০ হাজার ৩৬০ জন কর্মসংস্থানে নিয়োজিত। সবচেয়ে কম অর্থনৈতিক ইউনিট রয়েছে ঝালকাঠি জেলায়। সেখানে ইউনিট সংখ্যা ৬২ হাজার ৯৪৫টি এবং কর্মরত রয়েছেন ১ লাখ ১৫ হাজার ৭৪৬ জন।

বরিশাল চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি এবায়েদুল হক চাঁন বলেন, ‘অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা বৃদ্ধি কোনো অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য, উৎপাদন ও সেবামূলক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের গুরুত্বপূর্ণ সূচক। বরিশালে গত এক দশকে এই প্রবৃদ্ধি নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি, স্থানীয় বাজার সম্প্রসারণ এবং গ্রামীণ অর্থনীতির গতিশীলতার ইঙ্গিত বহন করে।’

তবে কর্মসংস্থানের জাতীয় অংশীদারত্ব তুলনামূলক কম হওয়ায় উৎপাদনমুখী শিল্পায়ন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠা এখনো বিভাগের অন্যতম চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক জ্যোতিময় বিশ্বাস। তিনি বলেন, ‘গ্রামাঞ্চলে পারিবারিক পর্যায়ের উদ্যোগ ও ব্যবসা-বাণিজ্য বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এটিকে অতিরঞ্জিতভাবে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির প্রধান সূচক হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। ভারী শিল্প খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে পারলে অর্থনৈতিক ইউনিট বৃদ্ধির পাশাপাশি কর্মসংস্থানেও আরও বড় অগ্রগতি সম্ভব হবে।’

হাজারীবাগ থেকে হেমায়েতপুর পূর্ণতা পায়নি চামড়া শিল্পনগরী

প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৬, ০৯:৩৩ এএম
আপডেট: ২২ জুন ২০২৬, ১০:৩৩ এএম
হাজারীবাগ থেকে হেমায়েতপুর পূর্ণতা পায়নি চামড়া শিল্পনগরী
খবরের কাগজ ইনফোগ্রাফ

২৩ বছরেও পূর্ণতা পায়নি চামড়া শিল্পনগরী স্থানান্তর প্রক্রিয়া। ২০০৩ সালে রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে এই শিল্পটি স্থানান্তরের অনুমোদন দেওয়া হয়। তারপর নানা চড়াই-উৎরাই পার হয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সাভারের হেমায়েতপুরে এই শিল্পটি স্থানান্তর করার কাজ শেষ হয় ২০২১ সালে। তবে আজও সেই শিল্পনগরী অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় কেনা গাড়িগুলো পাঁচ বছর পরও পরিবহন পুলে জমা দেওয়া হয়নি।

প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ১৫৫টি চামড়া প্রক্রিয়াকরণ কারখানাকে পরিবেশসম্মত স্থানে স্থানান্তরের কাজ শেষ করার কথা ছিল ২০০৫ সালে। কিন্তু ১০ বার সংশোধন করে সময় বাড়িয়ে তা শেষ করা হয়েছে ২০২১ সালের জুনে। সময় বেশি লেগেছে সাড়ে ১৫ বছর।

‘চামড়া শিল্পনগরী’ স্থানান্তরে প্রাথামিকভাবে খরচ নির্ধারণ করা হয় ১৭৬ কোটি টাকা। পরে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে খরচ হয়েছে ৯৩৮ কোটি টাকা। চামড়াশিল্প থেকে নির্গত বর্জ্য পরিশোধনের জন্য একটি কমন ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট বা সিইটিপি স্থাপনসহ সব কিছু করা হয়েছে সাভার ও কেরানীগঞ্জ উপজেলার ৬০০ বিঘা জমিতে।

তার পরও পরিবেশগত সনদ পাচ্ছেন না ট্যানারি শিল্পমালিকরা। বিক্রেতারা পাচ্ছেন না চামড়ার দাম। হেমায়েতপুর ট্যানারিশিল্প এলাকা থেকে নির্গত বর্জ্য ধলেশ্বরী নদীতে পড়ছে। বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানা গেছে। 

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ট্যানারি শিল্পনগরী প্রকল্পটি প্রণয়ন ‘আগাগোড়া’ ছিল ত্রুটিপূর্ণ। তাই একবার নয়, দুবার নয়, ১০ বার প্রকল্পটি সংশোধন করা হয়েছে। প্রকল্প খরচও ১৭৬ কোটি থেকে বেড়ে ৯৩৮ কোটি টাকায় ঠেকেছে, বেড়েছে ৪৩৪ শতাংশ। সময় বেড়েছে ৬১৬ শতাংশ। প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২০ কোটি টাকা খরচ করে ৬০০ বিঘা জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। ৩২ কোটি টাকায় ২ লাখ ৮০ হাজার ঘনমিটার জমি উন্নয়ন, ৮ কোটি ৩৩ লাখ টাকা খরচ করে ৫ তলা প্রশাসনিক ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। ৪৭৭ কোটি টাকা খরচ করে এসটিপিসহ কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) নির্মাণ করা হয়েছে ৫১ বিঘা জমিতে। চারটি মডিউলসংবলিত এই সিইটিপি নির্মাণে একবার প্রকল্পটি সংশোধন করে ৩ বছর সময় বাড়ানো হয়।

তবে নির্মাণ সত্ত্বেও তা কার্যকর করা হয়নি। প্রকল্পটির কাজের গতি ছিল খুবই ধীর। শিল্পনগরীর অগ্নিনির্বাপন সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য ১১ কোটি ৬৯ লাখ টাকা খরচ করে নির্মাণ করা হয় সীমানা প্রাচীরসহ ফায়ার স্টেশন। নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সাড়ে ১২ লাখ টাকায় পুলিশ স্টেশন নির্মাণ করা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নে প্রায় ৬ কোটি টাকা, শিল্পনগরীর বর্জ্যপানি দ্রুত নিষ্কাশনে প্রায় ৩ কোটি টাকা খরচ করে ড্রেন নির্মাণ করা হয়। ২৭ কোটি টাকা খরচ করে পানি সরবরাহ পাইপলাইন, প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকার বিদ্যুৎ লাইন, ১ কোটি ২৯ লাখ টাকার সড়ক বাতি, ৮ কোটি টাকা খরচ করে ডাম্পিং ইয়ার্ড, ২টি গভীর নলকূপ, ৮টি সোলার প্যানেল স্থাপন করা হয়েছে। এভাবে শতভাগ কাজ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এতে খরচ হয়েছে ৯৩৮ কোটি টাকা। বিপুল অঙ্ক ব্যয়ের পরও সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন হয়নি প্রকল্পটি।

সাবেক প্রকল্প পরিচালক ব্যবহার করছেন জিপ গাড়ি

প্রতিবেদন সূত্রে (আইএমইডি) জানা গেছে, হেমায়েতপুরের হরিণধরায় চামড়া শিল্পনগরীর শতভাগ অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও প্রত্যাশিত মাত্রায় কার্যকর হয়নি। রক্ষণাবেক্ষণেও সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। বিশেষ করে সিইটিপির কার্যক্ষমতা, ড্রেনেজব্যবস্থা ও বর্জ্যব্যবস্থাপনার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এখনো কাঙ্ক্ষিত মানে পৌঁছায়নি। স্থাপিত সিইটিপির ধারণক্ষমতা দিনে মাত্র ২৫ হাজার ঘনমিটার, যা বর্তমানে উৎপন্ন বর্জ্যপানির পরিমাণের তুলনায় অনেক কম। ফলে সিইটিপি প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করছে না। এদিকে কঠিন বর্জ্য অন্য কোনো শিল্পের উপজাত হিসেবে ব্যবহার না হওয়ায় খোলা জমিতে জমা করে রাখা হচ্ছে, এর ফলে ঘটছে গুরুতর পরিবেশ দূষণ।

শিল্পনগরীতে ১৬২টি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে সেগুলোর সব কটিতে উৎপাদন কার্যক্রম শুরু হয়নি। প্রকল্পের জন্য ২টি জিপ গাড়ি ও ৩টি মাইক্রোবাস কেনা হয়। প্রকল্প শেষ হওয়ার ৫ বছর পরও তা পরিবহন পুলে জমা দেওয়া হয়নি। সাবেক প্রকল্প পরিচালক যতীন্দ্র নাথ পাল একটি জিপ গাড়ি ব্যবহার করছেন। একটি মাইক্রোবাস সাভার বিসিক ট্যানারি শিল্পনগরীতে ব্যবহার হচ্ছে। প্রকল্পটি ৫ বছর আগে শেষ হলেও এখনো ৪৭টি অডিট আপত্তি নিষ্পত্তি হয়নি।

এলডব্লিউজির সনদ না পাওয়ার কারণ

শিল্পনগরীতে নির্মিত সিইটিপি প্রয়োজনের তুলনায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। ট্যানারির সংখ্যা ও বর্জ্যের পরিমাণের তুলনায় এর কার্যকারিকতা ও অপারেশনাল দক্ষতা পর্যাপ্ত নয়। এর ফলে নিরবচ্ছিন্নভাবে বর্জ্য পরিশোধন নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। আবার অনেক ট্যানারির নিজস্ব ইটিপি নেই। প্রকল্প শেষ হলেও মানসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত হয়নি আজ পর্যন্ত। শুধু তাই নয়, শ্রমিকদের কর্মপরিবেশও পূর্ণাঙ্গ পরিবেশসম্মত হয়নি বলে মতপ্রকাশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

অপরদিকে লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) সনদের জন্য উপযুক্ত হতে কেমিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড, বায়োলজিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড, টোটাল ডিজলভড সলিডস (টিডিএস) মান বজায় রাখা আবশ্যক। কিন্তু এসব কিছু পূরণ হচ্ছে না। 

উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও রপ্তানি কমেছে

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্যানারির মালিকদের মধ্যে সর্বোচ্চ ৫২ শতাংশ স্নাতক পাস। সাভারে নতুন প্লটে পরিকল্পিত ট্যানারি স্থানান্তরের পর কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা অনেক বেড়েছে। তবে রপ্তানি সক্ষমতা কমে গেছে। শিল্পনগরীতে এখনো ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু হয়নি। ফলে বিদেশি ক্রেতা ও স্থানীয় উদ্যোক্তারা দ্রুত প্রয়োজনীয় সহায়তা পাচ্ছেন না।

অবকাঠামো উন্নত হলেও শ্রমিকরা এখনো বঞ্চিত

৪৯ শতাংশ শ্রমিক জানিয়েছেন, চামড়া শিল্পনগরীর কর্মপরিবেশ কিছুটা উন্নত হয়েছে। তবে ২ শতাংশ জানান, পরিস্থিতি প্রায় একই রকম আছে। ৭০ শতাংশ শ্রমিক জানান, আগের তুলনায় পরিচ্ছন্নতা কর্মকাণ্ড বেড়েছে। কাজের সময় দুর্ঘটনা অর্ধেক কমেছে। তবে অবকাঠামো উন্নত হওয়ার ৬ বছর পরও ২৮ শতাংশ শ্রমিক জানান, কারখানা থেকে তাদের কোনো ধরনের নিরাপত্তা সরঞ্জাম দেওয়া হয় না।

ট্যানারি কারখানায় কাজ করার সময় রাসায়নিকের গন্ধ ও বর্জ্যের সমস্যা আগের তুলনায় অনেক কমেছে। আগে ৫৯ শতাংশ শ্রমিক ত্বকের রোগ, চুলকানি ও অ্যালার্জি সমস্যায় ভুগলেও সাভার ট্যানারিতে এখন ভুগছেন ৩৬ শতাংশ। ৯৪ শতাংশ শ্রমিক জানান, কারখানায় কোনো স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা মেডিকেল সুবিধা নেই। কাজের সময় দুর্ঘটনায় ক্ষতি হলেও ৪০ শতাংশ শ্রমিক জানান, ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয় না।

চামড়া শিল্পনগরীর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মেহরাজুল মাঈয়ানের কাছে জানতে চাইলে তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নিয়েছি বছরখানেক হলো। প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে ৫ বছর আগে। কাজেই সেই সময়ের ঘটনা বলা সম্ভব না।’

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পটি দীর্ঘ সময় পর বাস্তবায়িত হলেও এর ফল পাওয়া যাচ্ছে না। পরিবেশের অবনতির কারণে এলডব্লিউজির সনদ পাওয়া যাচ্ছে না। ব্যাপক সম্ভাবনা থাকার পরও চামড়ার দাম পাওয়া যাচ্ছে না। রপ্তানি কমে যাচ্ছে।

বুড়িগঙ্গার মতোই ধলেশ্বরী নদী দূষণ হচ্ছে। তাই রপ্তানির বাজার ধরতে এটাকে পরিবেশবান্ধব করতে হবে। কীভাবে করতে হবে, সরকারকে সেটা ভাবতে হবে। আইএমইডির মূল্যায়নকে গুরুত্ব দিতে হবে। ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের কোনো প্রকল্প দীর্ঘ না হয় সেদিকেও নজর দিতে হবে।’

মালেশিয়ায় শ্রমবাজার খোলার আশা আছে জটিলতাও

প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৬, ০৯:১১ এএম
আপডেট: ২২ জুন ২০২৬, ১০:০৮ এএম
মালেশিয়ায় শ্রমবাজার খোলার আশা আছে জটিলতাও
ছবি: সংগৃহীত

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দুই দিনের সফরে গতকাল রবিবার মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে পৌঁছেছেন। সেখানে আজ তিনি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে প্রথমে একান্ত এবং পরে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন। বৈঠকে উভয় দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক ও দুটি ‘নোট অব এক্সচেঞ্জ’ সই হওয়ার কথা থাকলেও মূল টার্গেট থাকবে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য বন্ধ শ্রমবাজার খুলে দেওয়ার ঘোষণা। যদিও প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে তার সম্ভাবনা কম। 

এই সফরে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য ফের মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার প্রত্যাশা অনেক। কিন্তু এ রকম ঘোষণা আসার ক্ষেত্রে দুই দেশেই রয়েছে অনেক জটিল ও গভীর সমস্যা। কাজেই এই সমস্যাগুলোর স্থায়ী সমাধানও করতে হবে যৌথভাবে। কারণ মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগে বাংলাদেশের সরকারের ভেতরে ও বাইরের সিন্ডিকেট যেমন দায়ী, তেমনি মালয়েশিয়ার সরকারের ভেতরের ও বাইরের সিন্ডিকেটও সমানভাবে দায়ী।

এ ক্ষেত্রে একটি মজার বিষয় হচ্ছে, এই সিন্ডিকেট নির্মূলে দুই দেশের সরকারি পর্যায়ে জোরালো কোনো উদ্যোগও নিতে দেখা যায়নি। সিন্ডিকেট নির্মূল ও দুর্নীতি রোধে দুই দেশের যৌথ পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, কিন্তু সে উদ্যোগটি অনুপস্থিত। ফলে সিন্ডিকেটের সদস্যরা বাংলাদেশে মামলা খেয়ে মালয়েশিয়া বা অন্য দেশে অবস্থান করলেও যৌথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

আবার সিন্ডিকেটের সঙ্গে মালয়েশিয়ার নাগরিক যারা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এতে এই শ্রমবাজারের ভবিষ্যৎ কতটা স্থায়ী হবে তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। তবুও আশা, এই সফরে ইতিবাচক কিছু একটা হবে। 

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর খবরের কাগজকে জানান, মালয়েশিয়ার এই শ্রমবাজারে সিন্ডিকেট প্রথা উভয় দেশের সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শুধু বহুরূপী প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হয়। এর বিরুদ্ধে সরকারি পর্যায়ে শক্ত অবস্থান নিতে দেখা যায়নি। না দেশে, না মালয়েশিয়ায়। সিন্ডিকেটের দুর্নীতিবাজরা নানা ভিসায় গিয়ে সে দেশে অবস্থান করলেও উভয় সরকার যৌথ পদক্ষেপ নেয়নি।

দুই দেশের মন্ত্রী পর্যায়ে এবং যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের মিটিংয়ে সংকট নিয়ে ভাসা ভাসা আলোচনা হলেও কার্যকর পদক্ষেপ আজও দেখা যায়নি। কাজেই দুর্নীতিবাজদের নির্মূল না করতে পারলে যেনতেনভাবে এই শ্রমবাজারটি খুললেও ফের বন্ধ হয়ে যাবে। এই শ্রমবাজারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে শক্ত পদক্ষেপ না নিলে এই সংকট ফের তৈরি হবে এবং বাজারটি বন্ধ হয়ে যাবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ‘মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আমাদের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। নানা কারণে এই শ্রমবাজার প্রায় দুই বছর ধরে বন্ধ হয়ে আছে। শ্রমিক নিয়োগে সিন্ডিকেট, অতিরিক্ত ব্যয়, ভিসা জটিলতা এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার অনিয়ম নিয়ে সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে যে মামলা আছে, সেগুলো প্রত্যাহারসহ বহু বিতর্ক রয়েছে এখানে। এই শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের প্রতারণার হাজারও ঘটনা নিয়ে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন শ্রম সংস্থাগুলোর চাপে আছে মালয়েশিয়া সরকার।’

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এসব চাপ উত্তরণে উপযুক্ত পদক্ষেপ না নিলে শ্রমবাজারটি খোলার ক্ষেত্রে আরও দেরি হতে পারে। তবে আজ দুই প্রধানমন্ত্রীর একান্ত বৈঠক থেকে শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়ে বড় সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, শ্রমিক নিয়োগে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তির মেয়াদ এখনো শেষ হয়নি, তাই নতুন করে এ বিষয়ে কোনো চুক্তি হবে না। কিন্তু সফরে শ্রমবাজার পুনরায় পুরোপুরি সচল করা, নতুন কর্মী নিয়োগ বৃদ্ধি এবং অনিয়মিত বাংলাদেশি কর্মীদের বৈধতা দেওয়ার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।

মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের প্রায় আট লাখ কর্মী রয়েছেন। এর মধ্যে তিন লাখ রয়েছেন অনিয়মিত। এদের বৈধকরণের বিষয়টিও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তোলা হবে। যদিও এর আগে বিভিন্ন সময় বিদেশি কর্মীদের বৈধকরণ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে একটি বড় সমস্যা হচ্ছে দেশটি বিদেশি কর্মীদের যতবারই বৈধকরণ করেছে, ততবারই নতুন করে ট্যুরিস্ট ভিসায় বা নদীপথে অবৈধ উপায়ে বিদেশি কর্মীরা ঢুকে পড়ে অধিক সংখ্যায় অবৈধ হয়েছেন। এ কারণে ফের আনুষ্ঠানিক বৈধকরণের ঘোষণা দেবে কি না, সেটি সময় বলে দেবে।

এদিকে জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বায়রার নেতারা মালয়েশিয়া সফরের আগে সিন্ডিকেট বন্ধে প্রধানমন্ত্রীকে একটি স্মারকলিপি দিয়েছেন। সংগঠনের সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ফকরুল ইসলাম জানান, অতীতের সিন্ডিকেট ব্যবস্থার কারণে মালয়েশিয়ায় কর্মীদের অভিবাসন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

শত শত বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সি ব্যবসা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। দুর্নীতি, অনিয়ম ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বেড়েছে। সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বারবার সংকট ও বন্ধের মুখে পড়েছে। তিনি শ্রমবাজারটি সিন্ডিকেটমুক্ত করতে সব বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। তিনি আরও বলেন, নেপালসহ ১৪টি দেশ সিন্ডিকেটমুক্ত উপায়ে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠায়। নেপালেও সিন্ডিকেট করার চেষ্টা হয়েছিল, কিন্তু সে দেশের সরকার সেটি হতে দেয়নি। তাই শুধু বাংলাদেশি কর্মী পাঠাতেই কেন সিন্ডিকেট থাকবে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এই সফরের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে সফর-পরবর্তী বাস্তবায়নের ওপর। অতীতে বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের সফরে অনেক চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হলেও তার বাস্তব অগ্রগতি প্রত্যাশিত ছিল না। তাই এবার শুধু চুক্তি নয়, বরং এফটিএ চূড়ান্তকরণ, বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা দূর করা, বিনিয়োগ সহজীকরণ, ব্যবসায়িক যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং শ্রমবাজার ব্যবস্থাপনায় বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়াই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

তবে প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফর বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে রপ্তানি বাজার, নতুন বিনিয়োগ, নতুন কর্মসংস্থান এবং নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তার এই সময়ে এই সফরকে কেবল একটি রাষ্ট্রীয় সফর নয়, বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক কৌশল ও আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। 

বর্তমানে মালয়েশিয়া বাংলাদেশের অন্যতম বড় বিদেশি বিনিয়োগকারী দেশ। দেশটির বিনিয়োগ রয়েছে জ্বালানি, অবকাঠামো, পরিবহন, লজিস্টিকস এবং শিল্প খাতে। প্রধানমন্ত্রীর সফরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সেমি-কন্ডাক্টর, তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, লজিস্টিকস, বন্দর উন্নয়ন, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং উৎপাদনশীল শিল্পে নতুন বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি আসতে পারে। বাংলাদেশের ২০ কোটির বিশাল বাজার, তরুণ কর্মশক্তি, ভৌগোলিক অবস্থান এবং ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণি মালয়েশিয়ার বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।

এ ছাড়া এই সফর আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ এনে দিতে পারে। কারণ মালয়েশিয়া আঞ্চলিক সংস্থা আসিয়ানের অন্যতম সদস্যরাষ্ট্র। বাংলাদেশও আসিয়ানের সদস্য হতে চায়, এ জন্য দেশটির সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ। মালয়েশিয়াতেও রয়েছে দুই লক্ষাধিক রোহিঙ্গা। বাংলাদেশে আছে ১৩ লাখ। এসব রোহিঙ্গা মায়ানমারে প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে মালয়েশিয়ার মাধ্যমে আসিয়ানকে সম্পৃক্ত করার সুযোগ আছে। এ নিয়ে দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে আলোচনাও হবে বলে কূটনীতিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। 

ইসলামী ব্যাংক থেকে চাকরিচ্যুতদের নতুন চাকরি মিলছে না

প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৬, ০৮:০২ এএম
ইসলামী ব্যাংক থেকে চাকরিচ্যুতদের নতুন চাকরি মিলছে না
ইসলামী ব্যাংক

ইসলামী ব্যাংক থেকে চাকরিচ্যুত প্রায় ১০ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে অধিকাংশের নতুন করে চাকরি পাওয়ার বয়স চলে গেছে। কিছুসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারীর চাকরির বয়স থাকলেও তারা কোথাও সহজে চাকরি পাচ্ছেন না। ইসলামী ব্যাংক থেকে ছাঁটাইয়ের বিষয়টি নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছে। যে কারণে অনেক দক্ষ ও মেধাবী কর্মকর্তা নতুন করে চাকরি পাচ্ছেন না। 

  • অধিকাংশের চাকরির বয়স চলে গেছে
  • যাদের বয়স আছে তাদের জন্য ‘টার্মিনেটেড’ শব্দটি নতুন চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে
  • পরিবারগুলোতে আর্থিক অনটন, দাম্পত্য কলহ, মানসিক বিষণ্ণতা এবং সামাজিক মর্যাদাহানির এক ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিতে কয়েক দফায় ব্যাপক জনবল ছাঁটাইয়ের ঘটনা ঘটে। যথাযথ আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে ঢালাওভাবে চাকরিচ্যুত করার কারণে কর্মকর্তাদের জীবনে এক চরম বিপর্যয় নেমে এসেছে। অনেকের বয়স বেশি হওয়ায় যেমন নতুন কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরির সুযোগ মিলছে না, তেমনই সামাজিক অপবাদ ও ‘ট্যাগিং’য়ের কারণে অন্য কোথাও দাঁড়ানোর পথ বন্ধ হয়ে গেছে। একাধিক ভুক্তভোগীর সঙ্গে আলাপ করে এ তথ্য জানা গেছে। 

‎একাধিক চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা খবরের কাগজকে জানান, চাকরিচ্যুত কর্মকর্তাদের মধ্যে যাদের এখনো চাকরির বয়স রয়েছে তারাও চরম বিপাকে আছেন। কোথাও আবেদন করে সাড়া পাচ্ছেন না। তাদের আবেদনপত্রের সঙ্গে যখন চাকরিচ্যুতির বিষয়টি উল্লেখ করা হয়, তখন নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান তাদের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করছে। এখানে তাদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাকে মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। এ কারণে অনেক দক্ষ ও মেধাবী কর্মকর্তা নতুন করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আবেদন করেও সাড়া পাচ্ছেন না। 

ভুক্তভোগীরা জানান, আকস্মিক এই ছাঁটাইয়ে শুধু তাদের রুটি-রুজির পথ বন্ধ হয়েছে তা নয়, বরং বয়সজনিত সীমাবদ্ধতার কারণে তাদের এক অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিয়েছে। এর ফলে তাদের পরিবারগুলোতে আর্থিক অনটন, কলহ, মানসিক বিষণ্ণতা এবং সামাজিক মর্যাদাহানির এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে।

তারা জানান, আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের পেশাগত জীবনে একবার কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হওয়ার ঘটনা পরবর্তী সময়ে তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। ব্যাংকটি প্রায় ১০ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীকে টার্মিনেট করেছে। কিন্তু টার্মিনেশন লেটারে সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ উল্লেখ করেনি, যা তাদের পরবর্তী চাকরি পেতে বড় ধরনের জটিলতায় ফেলে দিয়েছে। এ কারণে ইসলামী ব্যাংক থেকে চাকরি হারানো কিছুসংখ্যক ব্যক্তির এখনো চাকরির বয়স থাকা সত্ত্বেও তারা নতুন করে চাকরি পাচ্ছেন না। যখনই নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান জানে আবেদনকারীকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে, তখন তারা সন্দেহের চোখে দেখে।

‎ইসলামী ব্যাংকের চাকরিচ্যুত সিনিয়র অফিসার সৈয়দ মোহাম্মদ ফখরুল আবেদীন (৩৪) খবরের কাগজকে বলেন, “পরীক্ষা দিয়ে মেধার জোরে চাকরি পেয়েছিলাম, অথচ আজ চোরের অপবাদ নিয়ে সমাজে মুখ লুকাতে হচ্ছে। ‎২০১৭ সালের পর নিয়োগ পেয়েছি বলেই ধরে নেওয়া হলো আমি কোনো এক বিশেষ গ্রুপের লোক। অথচ আমি শতভাগ নিয়ম মেনে, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় পাস করে চাকরিতে ঢুকেছিলাম। বৃদ্ধ মা-বাবাকে নিয়ে আমার সংসার। বয়স ৩৪ বছর হয়ে গেছে, এই বয়সে নতুন কোনো ব্যাংক বা করপোরেট প্রতিষ্ঠান আর আমাকে ইন্টারভিউতেই ডাকছে না। অনেকে তো মুখ ফুটে বলেই দেয়–‘আপনারা তো অমুক আমলের লোক, আপনাদের চাকরি দিলে আমাদের রিস্ক।’ ধারদেনা করে দিন চলছে, নিজের সম্মানটুকু হারিয়ে এখন পুরোপুরি সামাজিক ও মানসিকভাবে পঙ্গু হয়ে গেছি।”

আরেক ভুক্তভোগী মো. নওশাদ জামান (৩৯) জানান, পরিবারে যে ব্যক্তি একসময় প্রধান ছিল, সে আজ সবার বোঝা। তিনি বলেন, “ব্যাংকিং ক্যারিয়ারে দীর্ঘ ৭ বছর ৯ মাস সততার সঙ্গে পার করার পর এভাবে বিদায় নিতে হবে কখনো ভাবিনি। ৫ আগস্টের পর এক কলমের খোঁচায় আমাদের ক্যারিয়ার ধ্বংস করে দেওয়া হলো। বয়স ৩৮ হওয়ায় নতুন চাকরির বাজারে আমি সম্পূর্ণ ‘অনুপযুক্ত’। সমাজ ও আত্মীয়স্বজন এমনভাবে তাকায় যেন আমরা কোনো অপরাধ করে ব্যাংক থেকে বিতাড়িত হয়েছি। নিজের জমানো টাকা যা ছিল তা-ও শেষ। পারিবারিক মূল্যবোধ ও সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকাটাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিজের সন্তানদের স্কুলের বেতন দিতে পারছি না, এর চেয়ে বড় মানসিক নির্যাতন আর কী হতে পারে?”

চাকরিচ্যুত আরেক কর্মকর্তা জোনায়েদ মো. কামরুল হাকিম (৩৮) বলেন, ‘ব্যাংকের টার্গেট পূরণ করতে দিন-রাত এক করেছি, বিনিময়ে পেলাম বিনা নোটিশে ছাঁটাই। ‎বিজিসি ট্রাস্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ, এমবিএর ভালো রেজাল্ট নিয়ে বের হয়ে ব্যাংকে ঢুকেছিলাম। গত বছরও দিন-রাত এক করে ব্যাংকের আমানত সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করেছি। অথচ আমাদের অপরাধ আমরা নির্দিষ্ট একটি অঞ্চলের বাসিন্দা এবং নির্দিষ্ট একটি সময়ে চাকরিতে ঢুকেছি। চাকরি হারিয়ে এখন ছোটখাটো ব্যবসা বা অন্য কিছু করার চেষ্টা করেছি, কিন্তু সেখানেও ‘ব্যাংক থেকে বিতাড়িত’ তকমাটা পিছু ছাড়ছে না। পারিবারিক ও সামাজিকভাবে সম্পূর্ণ একঘরে হয়ে পড়েছি। এই বয়সে এসে নতুন করে জীবন শুরু করার কোনো পথ খোলা নেই।’

‎সাদিব সাব্বির (৩৬) নামে আরেক চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা বলেন, “যে হাত একসময় মানুষকে সাহায্য করত, সেই হাত এখন ধার নেওয়ার জন্য পাততে হয়। ‎বয়স ৩৬ বছর। ব্যাংকিং সেক্টরে আর রি-এন্ট্রি নেওয়ার কোনো আইনি বা প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ আমার নেই। হোম লোন ও পার্সোনাল লোনের কিস্তি শোধ করার জন্য এখন ব্যাংক থেকে প্রতিনিয়ত নোটিশ আসছে। যে সমাজ আমাকে একজন সফল ব্যাংকার হিসেবে সম্মান করত, সেই সমাজ এখন আমাকে এড়িয়ে চলে। বৃদ্ধ মা-বাবার ওষুধের খরচ চালাতে পারছি না। চাকরিচ্যুত হওয়ার পর থেকে পরিবারে আমার অবস্থান এখন একজন ‘ব্যর্থ’ মানুষের মতো। এই তীব্র অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবমাননা সহ্য করে বেঁচে থাকা প্রতিদিনের এক জীবন্ত যুদ্ধ।”

ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় কারাবন্দি এক ম্যাজিস্ট্রেট

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬, ০৮:৪৩ এএম
আপডেট: ২১ জুন ২০২৬, ০৯:১৬ এএম
ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় কারাবন্দি এক ম্যাজিস্ট্রেট
সাইফুল ইসলাম। ছবি: খবরের কাগজ

একসময় যিনি মাঠ প্রশাসনে রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হয়ে মানুষের বিরোধ মীমাংসা করতেন, আজ নিয়তির নির্মম পরিহাসে তিনিই বন্দি চার দেয়ালের অন্ধকারে। একটি স্বাক্ষর কীভাবে একজন মানুষের সাজানো জীবনকে ওলট-পালট করে দিতে পারে, তার জ্বলন্ত উদাহরণ ৩৭তম বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ম্যাজিস্ট্রেট মো. সাইফুল ইসলাম।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উত্তাল সময়ে নরসিংদীর এক ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের চাপে করা একটি স্বাক্ষরই আজ তাকে দাঁড় করিয়েছে আসামির কাঠগড়ায়। গত প্রায় ১৪ মাস ধরে তিনি কারাগারে। অথচ প্রত্যক্ষদর্শী ও সহকর্মীদের দাবি, ঘটনার সময় তিনি দুর্ঘটনাস্থলেই ছিলেন না। কারাগারে যখন তিনি ন্যায়বিচারের প্রহর গুনছেন, তখন বাইরে তার চার বছরের অবুঝ সন্তান আর স্ত্রী পার করছেন চরম অনিশ্চয়তা ও একাকিত্বের এক বুকফাটা আর্তনাদ।

২০২৪ সালের জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে ঘিরে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে নরসিংদী। ১৭ জুলাই জেলখানা মোড়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য তাকে পাঠানো হয়েছিল বলে আইনজীবীর মাধ্যমে দেওয়া জবানবন্দিতে জানিয়েছেন সাইফুল ইসলাম। তিনি জানিয়েছেন, সেখানে কিছু সময় অবস্থান করার পর পরিস্থিতির অবনতি হলে অন্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ফিরে আসেন।

সাইফুল ইসলামের দাবি, আন্দোলন ও গণবিক্ষোভ তীব্র আকার ধারণ করায় পরদিন ১৮ জুলাই তিনি আর জেলখানা মোড়ে যাননি। নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে তিনি জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও সার্কিট হাউস এলাকায় অবস্থান করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই দিন তিনি কোনো পুলিশি অভিযানে অংশ নেননি এবং কোনো বাহিনীকে নির্দেশও দেননি। কিন্তু ঘটনার কয়েক দিন পর একটি স্বাক্ষরই তার জীবনের গতিপথ পাল্টে দেয়।

জবানবন্দিতে এই কর্মকর্তা জানান, ২২ জুলাই রাতে তাকে পুলিশের এমসিসি ফরমে স্বাক্ষর করতে বলা হয়। তিনি প্রথমে আপত্তি জানান। কারণ তার দাবি অনুযায়ী, তিনি সংশ্লিষ্ট সময় পুলিশের সঙ্গে কোনো দায়িত্ব পালন করেননি। কিন্তু পরে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশ ও চাপের মুখে তাকে স্বাক্ষর করতে হয়। এই এমসিসি ফরম নিয়েই এখন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু।

এমসিসি বা বিপি ফরম নং-১০ মূলত পুলিশের দায়িত্ব পালনের একটি রেকর্ড। কোন ফোর্স কোথায় মোতায়েন ছিল, কখন দায়িত্ব শুরু ও শেষ করেছে, এসব তথ্য সেখানে লিপিবদ্ধ থাকে। এটি গুলিবর্ষণের আদেশ দেওয়ার কোনো আইনগত ফরম নয়। আইন অনুযায়ী, জনতা নিয়ন্ত্রণে গুলিবর্ষণের প্রয়োজন হলে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ম্যাজিস্ট্রেটকে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় নির্দেশ দিতে হয়।

সাইফুল ইসলামের পক্ষে দাবি করা হচ্ছে, ঘটনার দিন তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না। ফলে গুলিবর্ষণের নির্দেশ দেওয়ার সুযোগও তার ছিল না। তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের অবস্থান, সহকর্মীদের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে সেদিনের তথ্য যাচাই করলে বিষয়টি স্পষ্ট হতে পারে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তা মো. মোয়াজ্জেম হোসেন তার তদন্ত প্রতিবেদনে নরসিংদীর ঘটনায় কয়েকজনের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ এনেছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্দোলনের সময় ছাত্র-জনতার ওপর আক্রমণ ও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে এবং এতে বিভিন্ন ব্যক্তি জড়িত ছিলেন। সেই প্রতিবেদনে সাইফুল ইসলামের নামও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

তবে মামলার নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৮ জুলাই নরসিংদী জেলখানা মোড়ে গুলিবর্ষণের ঘটনায় নিহত কিশোর তাহমিদ ভূঁইয়ার বাবা রফিকুল ইসলাম যে অভিযোগ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে করেন, সেখানে ম্যাজিস্ট্রেট মো. সাইফুল ইসলামের নাম উল্লেখ নেই।                     

২০২৪ সালের ১০ অক্টোবর দাখিল করা ওই অভিযোগে ঘটনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হলেও পরবর্তী সময়ে তদন্ত প্রতিবেদনে সাইফুল ইসলামের নাম অভিযুক্তদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। বিষয়টি সামনে আসার পর তদন্ত প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ এবং প্রাথমিক অভিযোগপত্রে তার নাম না থাকার বিষয়টি নিয়েও সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক আলভী সরকার খবরের কাগজকে বলেন, ‘স্পটে ছিলাম। তাহমিদ (১৪) ছিল আমাদের বিক্ষোভ মিছিলের কিছু আগে। সে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দিকে ঢিল ছুড়তে ছুড়তে বেশ সামনের দিকে চলে গিয়েছিল। পুলিশ গুলি শুরু করলে সরাসরি তার বুকে লাগে। সেখানেই লুটিয়ে পরে তাহমিদ।’ পুলিশ দায়িত্বরত ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে গুলি করেছে? বা সেখানে ম্যাজিস্ট্রেট সাইফুল ইসলাম ছিল কি না? খবরের কাগজের এমন প্রশ্নের জবাবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এই মুখ্য সংগঠক বলেন, ‘না, সেখানে এই নামের কোনো ম্যাজিস্ট্রেট দেখিনি। সেখানে আন্দোলন দমন করার জন্য ৭ থেকে ৮ জন পুলিশ ছিল। তারাই গুলি করেছে এবং সেখানেই তাহমিদ নিহত হয়েছে।’

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুদ হাকিম বলেন, সারা দেশের চলমান আন্দোলনের সঙ্গে সমন্বয় রেখে ১৭ জুলাই রাতে স্থানীয় সংগঠনের পক্ষ থেকে ১৮ জুলাই বেলা ৩টা থেকে নরসিংদী জেলখানা মোড়ে ব্লকেড কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়। এদিন কর্মসূচি পালন স্থলের আশপাশে কোনো ম্যাজিস্ট্রেট ছিল না। 

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখপাত্র মুনিয়া রহমান মনিকা বলেন, ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পূর্বঘোষণা অনুযায়ী কর্মসূচি পালনের লক্ষ্যে সে সময় আমি ঘটনাস্থলে ছিলাম এবং আন্দোলনে সক্রিয় ছিলাম। আন্দোলনের একপর্যায়ে তাহমিদ নিহত হয়েছে। সে সময় সেখানে দায়িত্ব পালনরত পুলিশের সঙ্গে কোনো ম্যাজিস্ট্রেট উপস্থিত ছিল বলে আমরা দেখিনি।’ 

নরসিংদী জেলার সাবেক জেলা প্রশাসক ও বর্তমানে চট্টগ্রামের উপ-ভূমি সংস্কার কমিশনের কমিশনার (উপসচিব) পদে দায়িত্ব পালনরত কর্মকর্তা ড. বদিউল আলম খবরের কাগজকে বলেন, ‘ঘটনার দিন (১৮ জুলাই) আমি দেশে ছিলাম না। ১৯ তারিখ ভারত থেকে দেশে ফিরে আসি। তাই এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারছি না।’ সাইফুল ইসলামকে ২২ জুলাই এমসিসিতে স্বাক্ষরের জন্য ডিসি হিসেবে চাপ প্রয়োগ করেছেন–এমন অভিযোগের বিষয়ে ডিসি বলেন, ‘আমি যেহেতু ঘটনা সম্পর্কে জানি না, তাই কোনো কর্মকর্তাকে স্বাক্ষরের চাপ দেওয়ার প্রশ্ন আসে না।’

সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (শিল্পকলা শাখা) ও নরসিংদী জেলার সাবেক ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক (১৮ জুলাই) মৌসুমী সরকার রাখী খবরের কাগজকে বলেন, ‘তৎকালীন সদর উপজেলার সাবেক এসি ল্যান্ড ও ম্যাজিস্ট্রেট সাইফুল ইসলাম ঘটনার সময় জেলা প্রশাসকের কার্যালয় অথবা সার্কিট হাউসে ছিলেন বলে শুনেছি। কারণ ঘটনার সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিক্ষোভ কর্মসূচি এতটাই তীব্র ছিল, নিরাপত্তার কারণে সেখানে ম্যাজিস্ট্রেটদের উপস্থিত থাকার মতো পরিবেশ ছিল না। জেলার অধিকাংশ ম্যাজিস্ট্রেট সে সময় ডিসি কার্যালয় অথবা সার্কিট হাউসে ছিলেন।’

তিনি বলেন, ‘ঘটনার দিন ম্যাজিস্ট্রেট সাইফুল ইসলামের সঙ্গে ডিসি কার্যালয়ে আমার একাধিকবার দেখা হয়েছে।’

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে অনেকেই আরেকটি বাস্তবতার কথা বলছেন। প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ বা সমর্থক হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় অনেক কর্মকর্তা প্রশাসনিক ও আইনি চাপের মুখে পড়েছিলেন। তাদের কেউ কেউ মনে করেন, সাইফুল ইসলামের ঘটনাটিও নিরপেক্ষভাবে পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।