দুর্বল ব্যাংকের অসংখ্য গ্রাহক প্রতিদিনই চেক নিয়ে টাকা তুলতে গিয়ে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। লাখ টাকা বা ৫০ হাজার টাকার চেক দিলে ব্যাংকের শাখা থেকে সংশ্লিষ্ট গ্রাহককে বলা হচ্ছে পাঁচ বা দশ হাজার টাকা তোলার জন্য। মোটা অঙ্কের টাকা অল্প অল্প করে কয়েকদিন ধরে তোলার পরামর্শও ব্যাংক কর্তৃপক্ষ গ্রাহককে দিচ্ছে। ফলে সেই ব্যাংকগুলোর গ্রাহকদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মধ্যস্থতা ও গ্যারান্টির আওতায় দুর্বল ব্যাংকগুলোতে দেওয়া তারল্যের সঠিক ব্যবহার হচ্ছে কি না তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন গ্রাহকদের অনেকেই। তাদের অভিযোগ, প্রাপ্ত অর্থ ব্যাংকগুলো নিজেদের বেতন-ভাতা পরিশোধ ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয়ে কাজে লাগাচ্ছে। সে কারণে গ্রাহকের চাহিদামতো অর্থ সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।
নিজের টাকা তুলতে গিয়ে না পাওয়ার ২টি বেদনাদায়ক অভিযোগ খবরের কাগজের কাছে জমা পড়েছে। একটি অভিযোগ করেছেন নোয়াখালীর কানকিরহাট শাখার একটি বেসরকারি ব্যাংকের গ্রাহক তাহমিনা আক্তার। স্বামীহারা তাহমিনা স্বামীর কর্মস্থল থেকে প্রাপ্ত আর্থিক সুবিধার পুরোটাই তিনি ওই শাখায় মেয়াদি আমানত (ফিক্সড ডিপোজিট রিসিপ্ট বা এফডিআর) করে রেখেছেন। দুটি ছোট কন্যাসন্তান নিয়ে এখন তিনি বড় আর্থিকসংকটে পড়েছেন। এদিকে তার একটি নির্মাণাধীন বাড়ির কাজও শেষ করা বিশেষ প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। ওই এলাকায় সাম্প্রতিক বন্যায় তার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ অবস্থায় তাহমিনা তার এফডিআরের ৩০ লাখ টাকা ভাঙাতে ব্যাংকটির শাখায় যান। কিন্তু ওই শাখা থেকে প্রতিদিনই তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বলা হচ্ছে, ব্যাংকে টাকা নাই। একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে তাহমিনা ওই শাখায় তার একটি চলতি হিসাবে থাকা ৭৫ হাজার টাকা তুলতে চান। তাকে শাখা কর্মকর্তারা ১০ হাজার টাকা সেধেছেন।
টাকা না পেয়ে হতাশ তাহমিনা খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমি এখন বিপদে। আমার টাকা আমি চাই। অন্য কারও টাকা নয়। আমার দাবি, আমার টাকা আমাকে দিন।’
দ্বিতীয় অভিযোগটি বেসরকারি পদ্মা ব্যাংকের বিরুদ্ধে। ব্যাংকটির প্রিন্সিপাল শাখার গ্রাহক মনজুরুল ইসলাম তার স্ত্রীর কোম্পানি ‘রয়্যাল সানের’ নামে ৫০ লাখ টাকার একটি এফডিআর করেছিলেন ১০ বছর আগে। এফডিআরটির মেয়াদ পূর্ণ হয়েছে। মন্দার কারণে বর্তমানে মনজুরুল ইসলামের স্ত্রীর ব্যবসা প্রায় দেউলিয়া হওয়ার পথে। তার পরিবার ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। কিন্তু তিনি টাকা তুলতে ব্যাংকে গেলে কর্মকর্তাদের কেউ তার কথা আমলে নেন না। কান্নজড়িত কণ্ঠে তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘ওরা আমাকে এভাবে দেখে যেন আমি ওদের কাছে ভিক্ষা চাইতে গেছি।’
বিষয়টি নিষ্পত্তির আশায় তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক মুখপাত্র ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সার্ভিস ডিপার্টমেন্টের নির্বাহী পরিচালক মো. মেজবাউল হকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এতেও কোনো সুরাহা পাননি মনজুরুল ইসলাম।
সব ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ থাকলেও পদ্মা ব্যাংকের তা নেই। এই ব্যাংকটিতে কোনো নগদ টাকা নেই। আমানতকারীরা চেক নিয়ে দফায় দফায় ব্যাংকটির বিভিন্ন শাখায় ধরনা দিয়েও টাকা তুলতে পারছেন না। ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকারের শেষভাগে এসে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে সবল ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করার উদ্যোগ নেওয়া হলে এক্সিম ব্যাংকের তৎকালীন চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার পদ্মা ব্যাংককে অ্যাকুইজিশন করার ঘোষণা দেন। এরপর বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে নিয়মানুযায়ী সম্পদ ও দায়দেনা হিসাব করতে নিরীক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সরকার পতনের পর এ ব্যাপারে কোনো অগ্রগতি হয়নি। ফলে পদ্মা ব্যাংক নিয়ে অনিশ্চয়তা আপাতত কাটছে না। অন্য দুর্বল ব্যাংকগুলোর চাহিদার ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তারল্য সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু পদ্মা ব্যাংক নিয়ে এমন কোনো উদ্যোগ না থাকায় ব্যাংকটির গ্রাহকরা চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।
কয়েকটি ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ব্যাংকগুলোতে নগদ অর্থ জমা পড়ছে কম এবং এর বিপরীতে উত্তোলনের চাহিদা বেশি। প্রতিদিন প্রধান কার্যালয়ের সামান্য বরাদ্দ পেয়ে তাই দিয়ে রেশনিং করে শাখা চালাতে হচ্ছে। বেসরকারি এক্সিম ব্যাংকের একটি শাখার ব্যবস্থাপক বলেন, ‘আমরা আছি বিপদে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ শাহরিয়ার সিদ্দিকী খবরের কাগজকে বলেন ‘তারল্য সংকট যাতে দীর্ঘায়িত না হয় সেজন্যই বাংলাদেশ ব্যাংক দায়িত্ব নিয়ে আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়া ব্যাংকগুলোর চাহিদার বিপরীতে যথাসম্ভব তারল্য সহায়তার ব্যবস্থা করে দিচ্ছে। এটি একটি সাময়িক ব্যবস্থা। তারল্য সহায়তা প্রাপ্ত ব্যাংকগুলোকে নিজেদের ঘুরে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। সহায়তা পেয়েও যেসব ব্যাংক নিজেদের উন্নতি করতে পারবে না সেই সব ব্যাংকের ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংক অন্য ব্যবস্থা নেবে এবং এটি গভর্নর মহোদয় ব্যাংকগুলোর কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দিয়েছেন।’
সহকারী মুখপাত্র জানান, প্রথমবার সেপ্টেম্বরের শেষে ৪ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা ও দ্বিতীয়বার অক্টোবরের ২২ তারিখে ৯২০ কোটি টাকা মিলিয়ে দুই দফায় সাত দুর্বল ব্যাংকে ৫ হাজার ৯০৫ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এসব তারল্য সহায়তার গ্যারান্টার অর্থাৎ ব্যাংকগুলো টাকা পরিশোধে ব্যর্থ হলে বাংলাদেশ ব্যাংক তা পরিশোধ করবে। এই নিশ্চয়তার পর সরকারি-বেসরকারি মোট সাত ব্যাংক দুর্বল সাতটি ব্যাংকের পরিত্রাণে এগিয়ে আসে। অর্থদাতা ব্যাংকগুলোর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক সর্বোচ্চ ২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা দিয়েছে। অন্য ছয়টির মধ্যে দি সিটি ব্যাংক পিএলসি দুই দফায় ১ হাজার ৯০ কোটি, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক দুই দফায় ৬০০ কোটি, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক দুই দফায় ৪৫০ কোটি, ব্র্যাক ব্যাংক দুই দফায় ৪০০ কোটি, ইস্টার্ন ব্যাংক দুই দফায় ৩২৫ কোটি, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক ২২০ কোটি ও বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংক ২০ কোটি টাকা দিয়েছে।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সুপরিচিত সিনিয়র ব্যাংকার সৈয়দ মাহবুবুর রহমান এ প্রসঙ্গে খবরের কাগজকে বলেন, ‘শুধু টাকা বা তারল্য সহায়তা নিয়ে দুর্বল ব্যাংকগুলো নিজেদের উন্নতি ঘটাবে এমন ধারণা কাজে আসবে না। ওই সব ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা বিভাগ ও পর্ষদ মিলে পরিকল্পনা ও তা বাস্তবায়ন করতে হবে। সেটা হতে পারে এরকম যে, ইতোমধ্যে যেসব গ্রাহক অসন্তুষ্ট হয়েছেন তাদেরকে ফেরানোর চেষ্টা করা, রিকভারি বাড়ানো বা বিনিয়োগকৃত অর্থ পুনরুদ্ধার এবং নতুন আমানত সংগ্রহ করা। এ ছাড়া সাময়িকভাবে গ্রাহকের জন্য কার্যকর তারল্য বাড়াতে পরিচালন ব্যয় পুনর্বিবেচনা বা কাটছাঁট করা যেতে পারে।’
অপর সুপরিচিত ব্যাংকার ও বর্তমানে গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের পর্ষদ চেয়ারম্যান নুরুল আমিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘অল্প করে হলেও তারল্য সহায়তা পেয়ে দুর্বল ব্যাংকগুলো গ্রাহকের কিছুটা চাহিদা পূরণ করতে পারছে। আমি আমার নিজের ব্যাংকে রেমিট্যান্স পেয়ে তা সঙ্গে সঙ্গে প্রাপককে বিতরণ করছি। এতে ডলারের প্রয়োজনটা মিটছে। আবার যারা আমানত তুলে নিতে আসছে তাদের বুঝিয়ে শুনিয়ে সুদ বা মুনাফাটুকু পরিশোধ করছি। এ ছাড়া রিকভারি বা খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার করার চেষ্টা জোরদার করেছি।’
নুরুল আমিন আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক তারল্য সহায়তা দেওয়ায় একটা পজিটিভ ভাইভ বা ইতিবাচক আবহ বা পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। এই ধারণা হলো এমন যে, বাংলাদেশ ব্যাংক পাশে আছে। এটি গ্রাহকের আস্থা ফেরাতে দারুণ কাজে দিবে। তবে, যে পরিমাণ সহায়তা আমরা পাচ্ছি তা দিয়ে হবে না । এর পরিমাণ বাড়াতে হবে। আমি আশা করছি, আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিভিউ (পর্যালোচনা) বৈঠকে আমি এ বিষয়টি উত্থাপন করব।’
গভর্নর আহসান এইচ মনসুর সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা দেন যে, ‘ব্যাংকগুলো যাতে তারল্য-সহায়তা পায়, সে জন্য তাদের আন্তব্যাংক থেকে ধার করার সুযোগ করে দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ ক্ষেত্রে ওই সব ব্যাংকের গ্যারান্টার হবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।’