চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষে (চউক) প্রায় দুই দশক ধরে প্রধান প্রকৌশলী, প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, উপপ্রধান নগর পরিকল্পনাবিদের মতো চারটি গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য রয়েছে। অথচ চট্টগ্রামকে বলা হয় বন্দরনগরী। আবার বাণিজ্যিক রাজধানী নামেও অভিহিত করা হয়। গুরুত্বপূর্ণ পদে লোকবল না থাকার কারণে নগরবাসী ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। গড়ে উঠছে অপরিকল্পিত নগরী।
চউক নিয়ন্ত্রিত এলাকা
১৯৯৫ সালের স্ট্রাকচার প্ল্যান অনুযায়ী চউকের সীমানা উত্তরে সীতাকুণ্ডের বাঁশবাড়িয়া, দক্ষিণে সাঙ্গু নদী, পূর্বে রাঙ্গুনীয়ার ইছাখালী এবং পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর। ১১৫২ বর্গকিলোমিটারের এই বিশাল এলাকা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য চউক যেন ঢাল-তলোয়ার বিহীন নিধিরাম সরদারের মতো ভূমিকাই রাখছে।
চউক সূত্র জানায়, দীর্ঘ আড়াই মাস বন্ধ ছিল চউকের ইমারত নির্মাণ কমিটির সভা। গত ১০ আগস্টের পর সভা হয়েছে গত বুধবার। অথচ অফিশিয়াল নির্দেশনা রয়েছে ১৫ দিন অন্তর একটি সভা করতে হবে। যে কারণে ভোগান্তিতে পড়ছেন সেবা প্রার্থীরা। কারণ ইমারত নির্মাণ কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ। ২০২২ সাল পর্যন্ত স্থপতি শাহীনুল ইসলাম খান ভারপ্রাপ্ত নগর পরিকল্পনাবিদের দায়িত্ব পালন করেন। তার অবসরের পর ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস্ ভারপ্রাপ্ত প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ হিসেবে ইমারত নির্মাণ কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু গত ৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পর তাকে প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদের পদটি ছেড়ে দিতে হয়। এরপর থেকে শুরু হয় সংকট। যে কারণে ইমারত নির্মাণ কমিটির সভা বন্ধ হয়ে যায়।
গত ২ সেপ্টেম্বর প্রকৌশলী নুরুল করিম সিডিএ চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করে পাঁচ নির্বাহী প্রকৌশলীকে চলতি দায়িত্ব দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী করেন। সেখান থেকে সর্বশেষ অর্থাৎ যার নাম তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) হিসেবে পাঁচ নম্বরে আছে তাকে ইমারত নির্মাণ কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে গত ২১ অক্টোবর নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর গত বুধবার কমিটির সভা হয়েছে। যেখানে চউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী নুরুল করিমও উপস্থিত ছিলেন। গত দুই দিনে প্রায় দেড় শ নকশা অনুমোদন হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রধান পদগুলো শূন্য থাকার কারণে চউককে বিভিন্ন সময় এ ধরনের সংকটে পড়তে হয়। এতে দুর্ভোগ পোহাতে হয় সেবাপ্রার্থীদের। সংকট নিরসনে বিভিন্ন সময় নানা প্রস্তাব দেওয়া হয়। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি।
তদন্ত প্রতিবেদন
সর্বশেষ ২০২১ সালে চউক একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। ওই কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন বোর্ড সদস্য জসিম উদ্দিন। সদস্য হিসেবে ছিলেন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. আশরাফুল আলম, বোর্ড সদস্য কে বি এম শাহজাহান, মো. জসিম উদ্দিন শাহ এবং সদস্যসচিব চউকের নির্বাহী প্রকৌশলী এজিএম সেলিম। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সরকারের বিধিবিধান বহির্ভূতভাবে ভারপ্রাপ্ত, চলতি দায়িত্ব এবং অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে এসব পদে একেক জন কর্মকর্তা একাধিক দায়িত্ব পালন করে আসছেন। যে কারণে শিক্ষিত, দক্ষ, সৎ এবং নিষ্ঠাবান কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছে চরম হতাশা। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা চাকরি ছেড়েছেন। এসব কারণে পদ-পদবির বিপরীতে সৎ, নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে দায়িত্বহীনতা-দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়াসহ, জবাবদিহির জায়গা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। যথাসময়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় অসৎ, ভালো-মন্দ সব কিছু হয়েছে একীভূত। ফলে বৃদ্ধি পেয়েছে স্বেচ্ছাচারিতা, দায়িত্ব ও কর্তব্য-কাজে অবহেলা, অনিয়ম, বিঘ্নিত হচ্ছে জনস্বার্থ। চউকে সৃষ্টি হয়েছে জেনারেশন গ্যাপ।
সরকার চট্টগ্রামের গুরুত্ব বিবেচনা করে ভৌত অবকাঠামো উন্নয়নে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প চউকের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পগুলোর গুণগত মান অক্ষুণ্ন রেখে টেকসই বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রকল্পের প্রাক-মূল্যায়ন, মধ্যবর্তী মূল্যায়ন ও বাস্তবায়নত্তোর মূল্যায়ন অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। এসব কর্মকাণ্ড মনিটরিং করার জন্য চউকের সাংগঠনিক কাঠামোতে প্রকল্প বিভাগ নামে একটি আলাদা শাখা রয়েছে, যার দায়িত্ব পালন করতেন একজন জ্যেষ্ঠ নির্বাহী প্রকৌশলী। চট্টগ্রামের উন্নয়নে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিরাট কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়নাধীন থাকা সত্ত্বেও চউকের নিজস্ব মনিটরিং ইভাল্যুশন সেলকে পুরোপুরি নিষ্ক্রীয় রেখে শুধু মন্ত্রণালয়ে রিপোর্ট পাঠানোতে সীমাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। অথচ নির্বাহী প্রকৌশলী (প্রকল্প) এই শাখাটি চউকের রিসার্স উইং বলা হয়ে থাকে। যে শাখা নিরপেক্ষভাবে কর্তৃপক্ষ সমীপে প্রকল্পগুলোর সার্বিক বিষয় তুলে ধরে। এ ছাড়া বাস্তবায়িত এবং বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পের বিভিন্ন সমস্যা ও সমাধানের উপায় ও কারিগরি দিকগুলো সঠিকভাবে কাজ করছে কি না, তা নিবাহী প্রকৌশলীর (প্রকল্প) অধীনে প্রকল্প মনিটরিং এবং ইভাল্যুশনের মাধ্যমে সম্ভব। সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও টেকসই প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের স্বার্থে চউকের সাংগঠনিক কাঠামোতে নিজস্ব মনিটরিং শাখা, নির্বাহী প্রকৌশলীকে (প্রকল্প) শক্তিশালী ও অ্যাকটিভেট করা প্রয়োজন বলে তদন্ত কমিটি মনে করে।
নগরবিদ ও বিশিষ্টজনের বক্তব্য
জানতে চাইলে বিশিষ্ট নগরবিদ ও পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের নেতা প্রকৌশলী সুভাষ বড়ুয়া খবরের কাগজকে বলেন, সরকারের উচিত ছিল চউককে পরিকল্পনাবিদনির্ভর একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা। কারণ নগর পরিকল্পনা করাই এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান কাজ। অথচ সেখানে প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ নেই। এই প্রতিষ্ঠানে যোগ্য নগর পরিকল্পনাবিদ নিয়োগ দেওয়া অতীব জরুরি। কারণ এই প্রতিষ্ঠানের সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমেই একটি পরিকল্পিত মহানগরী গড়ে উঠতে পারে।
ইঞ্জিনিয়ারর্স ইনস্টিটিউট চট্টগ্রামের সাবেক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেন মজুমদার খবরের কাগজকে বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠানই (চদা) চলতি দায়িত্ব, (অদা) অতিরিক্ত দায়িত্ব, (ভাপ্রা) ভারপ্রাপ্ত দিয়ে চলতে পারে না। এটা জোড়াতালির বিষয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে দীর্ঘদিন ধরে সিডিএর (চউক) বিভিন্ন পদগুলো এভাবে চলছে। একে তো সব চেয়ারে মানুষ নেই। আবার চলতি, অতিরিক্ত, ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব নিতে গিয়ে এখানে গ্রুপিংয়ের সৃষ্টি হয়েছে। একজন অপরজনকে সহ্য করতে পারে না। সৃষ্টি হয়েছে অসন্তোষ। এই অসন্তোষের কারণে সিডিএর পক্ষে সমন্বিতভাবে কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না। যেহেতু অনেকেই একাধিক পদের দায়িত্ব পালন করেন, সে কারণে তারা প্রতিটি দায়িত্বে যথাযথ মনোযোগও দিতে পারেন না। এ কারণে জনগণ সেবা থেকে বঞ্চিত হন। সে ক্ষেত্রে ক্ষতির শিকার জনগণই হয়। এই শহরের প্ল্যানিং কনট্রোল সিডিএর হাতেই থাকার কথা। ওদের কাজের মধ্যে যদি কোনো সংকট থাকে তার জন্য দুর্ভোগে পড়ে পুরো নগরী। এই সংকটের মূল্য জনগণকে দীর্ঘদিন ধরে দিতে হয়। সিডিএকে ভবিষ্যতের ৫০ বছরের কথা চিন্তা করে পরিকল্পনা করতে হবে। বর্তমান নিয়ে ভাবতেই যদি তাদের জেরবার হতে হয়, তাহলে ভবিষ্যতের কথা তারা ভাববেন কীভাবে।
চট্টগ্রাম ডেভেলপমেন্ট ফোরাম (সিডিএফ) এর মুখপাত্র মো. খোরশেদ আলম খবরের কাগজকে বলেন, চউকে অতীতে যারা ছিলেন তারা কেউ ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবেননি। যদি ভাবতেন তাহলে নিশ্চয় আজ এত দুরবস্থা হতো না। একটি প্রতিষ্ঠান নিজে পঙ্গু হলে তার দ্বারা সমৃদ্ধ নগরী গড়ে তোলা সম্ভব নয়। এই সমস্যার দ্রুত সমাধান করার দাবি জানান তিনি।
চউক চেয়ারম্যানের বক্তব্য
জানতে চাইলে চউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী নুরুল করিম খবরের কাগজকে বলেন, তিনি যোগদান করার আগে থেকেই এখানে সমস্যা। তাছাড়া সব ক্ষমতা চেয়ারম্যানের হাতে নেই। নতুন নিয়োগের ক্ষমতা এখনো মন্ত্রণালয়ের হাতে। সবকিছু মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন করে নিতে হয়। সেবা প্রার্থীরা যাতে ভোগান্তিতে না পড়েন সেই লক্ষ্যে তিনি মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিয়ে ইমারত নির্মাণ কমিটি গঠন করে দিয়েছেন। সিডিএকে জনবান্ধব এবং এই শহরকে একটি পরিকল্পিত শহর হিসেবে গ্রহণ করার জন্য অনেক কিছু করার আছে। আবার অনেক সীমাবদ্ধতাও আছে।
জানতে চাইলে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব হামিদুর রহমান খান খবরের কাগজকে বলেন, এ বিষয়ে বিস্তারিত বলতে পারবেন সিডিএ চেয়ারম্যান।