‘আমরা খুব কঠিন সময় পার করছি। আমাদের কাজগুলোও কঠিন হয়ে পড়ছে। আমি কোনো আশা অথবা স্বপ্ন দেখছি না।’ কথাগুলো কপ২৯ (কনফারেন্স ফর পার্টিজ) সম্মেলনের উদ্বোধনী দিনে বলেছেন সিমন স্টিয়েল। তিনি জাতিসংঘের পরিবেশ প্রধান। সম্মেলনটি এবার অনুষ্ঠিত হচ্ছে আজারবাইজানের রাজধানী বাকুতে।
স্টিয়েল এরপর ৮৫ বছর বয়সী বৃদ্ধা ফ্লোরেন্সের কথা শোনালেন। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে তার ঘরবাড়ি ঝড়ে উড়ে গেছে। এরকম লাখ লাখ মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবের শিকার হচ্ছে বলে জানিয়ে স্টিয়েল বলেন, ‘পৃথিবীর প্রতিটি দেশের প্রতিটি মানুষ কোনো না কোনো ভাবে ফ্লোরেন্সের মতো বিপর্যয়ের মুখোমুখি হচ্ছে। এখন দরকার বৈশ্বিক সহযোগিতার মধ্য দিয়ে এই সংকট থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য জেগে ওঠা। আসুন, আমরা সকলে জেগে উঠি।’
গতকাল জাতিসংঘের এই পরিবেশ সম্মেলনটি শুরু হয়। চলবে ২২ নভেম্বর পর্যন্ত। এবারের কপ২৯ জলবায়ু সম্মেলনে আলাপ-আলোচনা-পর্যালোচনা হবে অর্থায়ন ও বাণিজ্য নিয়ে। অনুন্নত দেশগুলো কতটা অর্থ পাবে, সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হবে।
সম্মেলনটি উদ্বোধন করেন আজারবাইজানের পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদ মন্ত্রী মুখতার বাবায়েভ। তিনি কপ২৯ সম্মেলনের সভাপতি।
উদ্বোধনী ভাষণে তিনি জোর দেন প্যারিস চুক্তির প্রতিশ্রুতি পূরণের ওপর। বেশ আবেগঘন ভাষণে তিনি বলেন, ‘প্রিয় সতীর্থ, আমরা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছি। সমস্যা ভবিষ্যতের নয়, এখনই জলবায়ু বদলাচ্ছে। আপনারা দেখতে পাচ্ছেন না, তবে অন্ধকারের মধ্যে মানুষ মৃত্যুবরণ করছে।’
জলবায়ু পরিবর্তনের দ্বারা বিপর্যস্ত মানুষের কথা উল্লেখ করে মুখতার আরও বলেন, ‘এখন প্রার্থনা করে অথবা কাগুজে দলিলপত্র না তৈরি করে প্রয়োজন সহমর্মিতার। মানুষ এখন নেতারা কী করেন তা দেখার জন্যে রীতিমতো অশ্রুপাত করছে। নতুন পথ খুঁজে পাওয়া ছাড়া পৃথিবীর মানুষের আর গত্যন্তর নেই।’
কিন্তু কী করণীয়? কীভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে বাঁচানো যাবে? উপায় হচ্ছে একটাই- অর্থায়ন। পরিবেশবাদীরা দাবি করছেন বছরে পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলার দিতে হবে। এই দাবিই জানিয়ে রেখেছে অনুন্নত দেশগুলো। কিন্তু এই অর্থের সংস্থান হবে না। কত অর্থায়ন করা যাবে, এবারের সম্মেলনের প্রধান আলোচ্য বিষয় হচ্ছে সেটাই। বলা বাহুল্য, এই অর্থ দেওয়ার সক্ষমতা আছে উন্নত দেশগুলোর। সেই আবেদনই জানাবেন সম্মেলনে অংশগ্রহণ করা ২০০টি দেশের বিশ্ব নেতারা। এই দেশগুলোই ১৯৯২ সালে জাতিসংঘের ‘ইউনাইটেড নেশনস ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন ক্লাইমেট চেঞ্জ’ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল। বাংলাদেশ থেকে এই সম্মেলনে যোগ দিচ্ছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
দরিদ্র দেশগুলোর আক্রান্ত মানুষদের বাঁচানোর জন্য প্রয়োজনীয় যে অর্থের দরকার হবে তার পরিমাণ হিসাবে জাতিসংঘ বলছে, একদিনের জন্য এক বিলিয়ন বা ১০০ কোটি ডলার। কিন্তু দুঃখজনক হলো, এই অর্থের সংস্থান একেবারেই হবে না।
বলা হয়েছে অর্থ ব্যয় হবে তিনটি কাজে- সুরক্ষা, খাদ্য নিরাপত্তা এবং বৈরী পরিবেশকে বাগে আনা। কিন্তু প্রতিশ্রুতি পাওয়া যেতে পারে ওই অর্থের দশ ভাগের মাত্র এক ভাগ। অর্থাৎ আনুমানিক ৭৫ মিলিয়ন ডলার। এদিকে বিপর্যয়ের মাত্রা যে দ্রুতগতিতে বাড়ছে, তাতে এই অর্থ সিন্ধুতে বিন্দুর মতোই প্রতীয়মান হচ্ছে জাতিসংঘের পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের কাছে। এমনকি জাতিসংঘের মহাসচিবের কণ্ঠেও এক ধরনের হতাশার সুর শোনা গেল। ‘প্রাকৃতিক বিপর্যয় নতুন ধরনের বাস্তবতা, এবং আমরা তার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারছি না। ফলে, বিপর্যয় ঘটেই চলেছে। সুরক্ষার বিষয়টি আমরা বাতিল করতে পারি না। আমাদের অবশ্যই মানিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।’
গুতেরেস যথার্থই চিহ্নিত করেছেন, পরিবেশের এই যে ধ্বংস, সেটা ঘটছে ফসিল ফুয়েল দ্বারা চালিত শিল্পকারখানার জন্যে। এসব কারখানা থেকে বিপুল পরিমাণ মুনাফা অর্জিত হয়, কিন্তু সুরক্ষার জন্য পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। উন্নত দেশগুলোই এই কারখানা চালায়, তারাই মুনাফা করে, কিন্তু অর্থব্যয়ে আগ্রহ নেই তাদের। অথচ টাকাটা দরকার বিশ্বে পরিবেশ রক্ষার জন্যেই।
প্রথমত, কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে আনা। দ্বিতীয়ত, বিপর্যস্ত পরিবেশের প্রশমন ঘটিয়ে পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে চলা। তৃতীয়ত, যে ধ্বংস ও ক্ষতি হয় সেসব পুষিয়ে নেওয়া।
২০২১ সালে গ্লাসগোর কপ২৬ সম্মেলনে ২০২৫ সালে পরিবেশ সুরক্ষা ও ক্ষতির মোকাবিলা করার জন্যে ৩৮ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হবে বলে লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছিল। অর্থ হয়তো পাওয়া যাবে, কিন্তু সেটা প্রয়োজনীয় ২৩০ বিলিয়ন ডলার থেকে বেশি এবং ৪১৫ বিলিয়ন ডলারের চাইতে অনেক কম। এই বাস্তবতায় মুখ রক্ষা করার মতো কিছু অর্থ সংগ্রহের ব্যবস্থা করা যায় কি না, বাকু সম্মেলন থেকে সেটাই আশা করা হচ্ছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হচ্ছে, ধনী দেশগুলো বছরে ১০০ বিলিয়নের ব্যবস্থাও করতে পারবে না। অর্থাৎ তারা এই অর্থ দেবে না। অথচ তাদের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার অর্থ দেওয়া উচিত। যুক্তিটা স্পষ্ট, তোমাদের প্রয়োজনে তোমরা ফসিল জ্বালানি ব্যবহার করছো, ক্ষতি হচ্ছে অনুন্নত দরিদ্র দেশগুলোর, সুতরাং তোমরাই অর্থ দেবে। এই দায় তোমাদের।
কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হচ্ছে, এই সম্মেলনে শীর্ষ ধনী দেশগুলোর অধিকাংশ রাষ্ট্রপ্রধান যোগ দিচ্ছেন না। যুক্তরাষ্ট্রের জো বাইডেন বা ডোনাল্ড ট্রাম্প থাকছেন না। যাননি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। কানাডার প্রেসিডেন্ট জাস্টিন ট্রুডো, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, চীনের প্রেসিডেন্টও থাকবেন না। সম্মেলনটা তাই খুব একটা ফলপ্রসূ সম্মেলন হবে বলে মনে হচ্ছে না।
এই প্রেক্ষাপটেই প্রখ্যাত সুইডিশ পরিবেশবাদী গ্রেটা থুনবার্গ আজারবাইজানের প্রতিবেশী দেশ জর্জিয়ার তিবিলিসিতে গতকাল রাতে প্রতিবাদ র্যালির আয়োজন করেছিলেন। শুধু থুনবার্গ নন, আরও বেশ কিছু পরিবেশবাদী সংগঠন উন্নত দেশগুলোকে দায়ী করে প্রতিবাদ জানিয়েছে। সম্মেলন চলাকালে এই প্রতিবাদ তীব্র থেকে তীব্রতর হবে বলে মনে হয়। থুনবার্গ প্রতিবাদের ডাক দিয়ে বলেছেন, গ্রিন এজেন্ডার নামে যে সম্মেলন হচ্ছে তা ভাঁওতাবাজি ছাড়া কিছু নয়। উন্নত দেশগুলো ক্ষমতাশালী হয়ে উঠছে আর বিভিন্ন অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়িয়ে চলেছে। এটা হচ্ছে পশ্চিমের সম্মিলিত কর্তৃত্ববাদী কর্মকাণ্ড। আজ থেকে লক্ষণীয় হয়ে উঠবে সম্মেলনটিতে কী কী বিষয়ে আলোচনা হয়, কীভাবে অগ্রসর হয়।