ফরিদপুরের মল্লিকপুরে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের একটি বাঁকে ভুল নির্দেশনাকে (রং মার্কিং) দুর্ঘটনায় প্রাণহানির প্রধানতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে জাতীয় তদন্ত কমিটি।
নিয়ম অনুযায়ী মহাসড়কে টানা সাদা দাগ থাকার কথা, যাতে চালক গাড়ির লেন পরিবর্তন করতে পারবেন না। কিন্তু মল্লিকপুরে এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে সেখানে সড়কে কাটা সাদা লাইন ছিল। এই লাইনের অর্থ- চালক সতর্কতার সঙ্গে লেন পরিবর্তন করতে পারেন। সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, সড়ক বা মহাসড়কের বাঁকে এমন নির্দেশনার জন্য হুটহাট লেন পরিবর্তন করতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হয় যানবাহন।
গত ১৫ অক্টোবর দিনগত রাত ৩টা থেকে ৩টা ৩৫ মিনিটের মধ্যে ফরিদপুর সদরের কানাইপুরের মল্লিকপুর এলাকায় খাগড়াছড়ি পরিবহন ও গ্রিন এক্সপ্রেস বাসের সংঘর্ষে প্রাণ হারান ৫ জন, আহত হন ২৫ জন। ওই ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের অধীনে গঠিত এই জাতীয় তদন্ত কমিটি সড়কের ভুল নির্দেশনার ঘটনা দেখতে পায়।
সম্প্রতি সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে জমা পড়েছে সেই প্রতিবেদন। প্রতিবেদনে গ্রিন এক্সপ্রেস বাসের অতিরিক্ত গতি, চালকের ওভারটেকিং করার প্রবণতা, মহাসড়কের পাশে যথাযথ পরিসর (ট্রাভার্সাল ক্লিয়ারিং জোন) না থাকার কথাও দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ফরিদপুরের মল্লিকপুরে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের ওই অংশটি পড়েছে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) অধীনে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিহতদের চারজন খাগড়াছড়ি পরিবহন বাসের যাত্রী। একজন গ্রিন এক্সপ্রেস বাসের। সাতক্ষীরার শ্যামনগর থেকে ৩৫ থেকে ৪০ জন ইটভাটা শ্রমিক খাগড়াছড়ি পরিবহনের বাসে ঢাকায় যাচ্ছিলেন। গ্রিন এক্সপ্রেসের বাসটি ঢাকার আব্দুল্লাপুর থেকে ঝিনাইদহ যাচ্ছিল। পথে এই দুর্ঘটনা ঘটে। এ সময় অধিকাংশ যাত্রী ঘুমিয়ে ছিলেন।
জাতীয় তদন্ত কমিটিতে সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ হিসেবে রয়েছেন বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এআরআই) সহকারী অধ্যাপক ড. আরমানা সাবিহা হক। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে গত ১৫ অক্টোবর ভোরে যে দুর্ঘটনা ঘটে, তার প্রধান কারণ মহাসড়কের সর্পিল বাঁক (স্পাইরাল কার্ভ) অনিরাপদ ছিল। মহাসড়কে এসব বাঁক খুব ভয়ংকর। এমনই একটি ভয়ংকর বাঁকে লেন আলাদা করতে যে ধরনের মার্কিং করার কথা, সেটি ছিল ভুল। মল্লিকপুরের কার্ভে সলিড মার্কিং (সোজা সাদা দাগ) না করে কাটা কাটা মার্কিং করা হয়েছে। এটি চালককে নিয়মবহির্ভূতভাবে লেন পরিবর্তনের অনুমোদন দিয়েছে। আমরা স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি সড়কের ওই অংশে গাড়িগুলো অতিরিক্ত গতিতে নিয়মিতভাবে ওভারটেক করে। মহাসড়কে যানবাহনের গতি পরিমাপ করে দেখেছি, ঢাকাগামী যানবাহনগুলোর গতি থাকে অতিরিক্ত। তার মানে ওই সড়কের জ্যামিতিক নকশাই অনিরাপদ। ভুল মার্কিংকে এ দুর্ঘটনার বড় কারণ হিসেবে দেখছি।’
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুর্ঘটনার সময় খাগড়াছড়ি পরিবহনের বাসটি তার লেনেই ছিল। গ্রিন এক্সপ্রেস বাসটি উল্টো দিক এসে দ্রুতগতিতে লেন পরিবর্তন করে এই বাসটিকে আঘাত করে।
দুর্ঘটনাস্থলকে ব্ল্যাক স্পট হিসেবে চিহ্নিত করেছে জাতীয় তদন্ত কমিটি। ড. আরমানা সাবিহা হক বলেন, সড়কের এই ভয়াবহ বাঁকের অংশটি ছিল অন্ধকারাচ্ছন্ন। দুই পাশে গাছের ঘন সারি থাকায় বাসের হেডলাইটের আলো কম প্রতিফলিত হয়েছে। কোনো সড়কবাতি ছিল না। সড়কের যে বাঁক রয়েছে সেটিরও নির্দেশনা সাইন ছিল না। সড়কের উভয় পাশে ১০ মিটারের মধ্যে কোনো স্থাপনা না থাকার নির্দেশনা থাকলেও তা মানা হয়নি। তার অর্থ মূল সড়ক থেকে কোনো গাড়ি নামতে বাধ্য হলে তার জন্য যথেষ্ট জায়গা থাকতে হবে, যেটিকে ট্রাভার্সাল ক্লিয়ারিং জোন বলা হয়। সেটি ছিল না সেখানে।
জাতীয় তদন্ত কমিটির এই প্রতিবেদন সম্পর্কে জানতে চাইলে ফরিদপুর জেলা সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী খালিদ সাইফুল্লাহ সরদারকে একাধিকবার ফোন করা হলে তিনি সাড়া দেননি। পরে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. সফিকুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘মল্লিকপুরের সড়ক দুর্ঘটনার পর জাতীয় তদন্ত কমিটি সওজকে বেশ কিছু সুপারিশ দিয়েছে। আমরা সেই মোতাবেক কিছু কাজ করছি।’ সড়কে ভুল মার্কিংয়ের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, ‘তদন্ত রিপোর্ট তো মাত্র এসেছে আমাদের হাতে। আমরা কাজ করছি। কারা জড়িত, কাদের কী ভুল, এসব আমি বিস্তারিত বলতে পারব না। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এ নিয়ে কাজ করছে।’
জাতীয় তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৩০ আসনবিশিষ্ট খাগড়াছড়ি পরিবহনের বাসের আসনসংখ্যা বাড়িয়ে ৩২টি করা হয়েছিল। বাসটির ফিটনেস, ট্যাক্স টোকেন, রুট পারমিট সবই ছিল মেয়াদোত্তীর্ণ। গ্রিন এক্সপ্রেসের বাসটির রুট পারমিট ছিল শুধু। এই বাসের আসনসংখ্যা ৪১ থেকে বাড়িয়ে ৪৫-এ উন্নীত করা হয়েছিল। দুর্ঘটনার পর দুই বাসের চালকের সন্ধান পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দুই চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্সের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
এতে আরও বলা হয়েছে, খাগড়াছড়ি পরিবহনের বাসটির আসনগুলো ছিল নড়বড়ে, কোনো রকমে ঢালাই করা হয়েছিল। দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার পেছনে এটি উল্লেখযোগ্য কারণ।
জাতীয় তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাসে বেশ কয়েকটি সুপারিশ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে- সড়ক, মহাসড়কে চলাচলকারী বাসগুলোর ফিটনেস, চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্সগুলো নিয়মিত তদারকি করতে হবে। রুট পারমিটবিহীন কোনো বাস যেন সড়কে নামার অনুমতি না পায়, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। কোনো বাসচালক যেন ৫ ঘণ্টার বেশি টানা বাস চালাতে না পারেন তা নিশ্চিত করতে হবে। দূরপাল্লার বাসগুলোতে অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা রাখতে হবে এবং তা ব্যবহার করতে পরিবহন শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। মহাসড়কে থ্রি-হুইলার যানবাহন বন্ধে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে।