নানা পদক্ষেপ গ্রহণ ও আইন করার পর গত কয়েক বছর ধরে ক্রমান্বয়ে নারী নির্যাতনের ঘটনা কিছুটা কমে এসছে। নারী অধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিবেদনেও তেমনটা বলা হচ্ছে। তবে নারী অধিকার কর্মীরা বলছেন, নির্যাতনের ঘটনা প্রতিবছর কমছে বলা হলেও তার আসল সংখ্যা কত, কোন এলাকায় এ ধরনের ঘটনা বেশি ঘটছে তার সমন্বিত কোনো তথ্য দিতে পারছে না কোনো সরকারি-বেসরকারি সংস্থা। সে কারণে নারী নির্যাতন প্রতিরোধে সচেতনতা বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনাও করা যাচ্ছে না।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় লিগ্যাল এইড উপপরিষদে সংরক্ষিত -পরিষদে ১৩টি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে গত অক্টোবরে নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের ঘটনার সংখ্যা ছিল ২০০টি। অন্যদিকে নারী ও শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী অক্টোবরে নারী ও শিশু নির্যাতন ও হত্যার ঘটনার সংখ্যা ১৮৫টি। ১০টি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে তথ্য পর্যালোচনা করে সংস্থাটি এ তথ্য দিয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ওই মাসে নারী ও শিশু নির্যাতন, হত্যা ও ধর্ষণ সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা ১ হাজার ৫৬০টি। একই মাসে একই বিষয় সংক্রান্ত ঘটনার ভিন্ন ভিন্ন সংখ্যাই বলে দিচ্ছে তথ্যের ফারাক কতটা।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম খবরের কাগজকে বলেন, ‘নারী নির্যাতনের তথ্য সংগ্রহে আমরা দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত খবরের ওপর নির্ভর করি। পত্রিকায় যে ঘটনাগুলো আসে সেগুলোই আমরা হিসাবে পাই। আমরা পুলিশ বা প্রশাসনের কাছে এ সংক্রান্ত তথ্য বহুবার চেয়েও পাইনি। তাদের কাছে কেবল মামলার তথ্যই থাকে। এর বাইরেও প্রতিদিন অনেক ঘটনার অভিযোগ ওঠে, যা মৌখিকভাবে মীমাংসা হয়ে যায়। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, আমাদের প্রকাশিত তথ্যে সঠিক সংখ্যা উঠে আসে না। এ সংক্রান্ত সমন্বিত কোনো তথ্য আমরা সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে পাই না। সরকার চাইলে ‘তথ্য আপা’র মাধ্যমে সমন্বিতভাবে দেশের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে এ তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। এতে আমরা অঞ্চলভিত্তিক তথ্য পেতে পারি এবং জানতে পারি কোন অঞ্চলে এ ধরনের অপরাধ বেশি ঘটছে। তখন সেই অনুযায়ী আমরা সামগ্রিক একটি পরিকল্পনা করতে এবং তা বাস্তবায়ন করতে পারি।’
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্রের চেয়ারপারসন জেড আই খান পান্না খবরের কাগজকে বলেন, ‘নারী অধিকার নিয়ে কাজ করতে গিয়ে আমরা অনেকবারই প্রশাসনের কাছে এসব তথ্য চেয়েছি। কিন্তু তারা সেই তথ্য দিতে পারেনি। কেবল নারী নির্যাতন কেন, শিশু নির্যাতনের তথ্যও সমন্বিতভাবে তারা দিতে পারে না। তাই নির্যাতনের সঠিক সংখ্যা আমরা তুলে ধরতে পারি না। পত্রিকা বা পুলিশের মামলার পরিসংখ্যান তো আর সঠিক সংখ্যা নয়। তাই নারী ও শিশু নির্যাতনের আসল চিত্রটা উঠে আসছে না।’
দেশের নারী নির্যাতনের সংখ্যা নিয়ে এমন ধোঁয়াশার মধ্যেই আজ ২৫ নভেম্বর সোমবার বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস। এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘নারী-কন্যার সুরক্ষা করি, সহিংসতামুক্ত বিশ্ব গড়ি’।
যুগ যুগ ধরে হয়ে আসা নারীর প্রতি নির্যাতন ও সহিংসতা বন্ধে ১৯৮১ সালে লাতিন আমেরিকায় নারীদের এক সম্মেলনে ২৫ নভেম্বর আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়। ১৯৯৩ সালে ভিয়েনায় বিশ্ব মানবাধিকার সম্মেলনে দিবসটিকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। জাতিসংঘ দিবসটি পালনের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয় ১৯৯৯ সালের ১৭ ডিসেম্বর। বাংলাদেশে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক প্রতিরোধ দিবস উদযাপন কমিটি ১৯৯৭ সাল থেকে এই দিবস ও পক্ষ পালন করে আসছে। এ বছর ২৫ নভেম্বর থেকে ১০ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ পালিত হবে।
পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে মোট নারী নির্যাতনের মামলা হয়েছে ১ হাজার ৯৬২টি। আর এ বছর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে নারী নির্যাতনের মামলা হয়েছে ১ হাজার ৮৩৩টি। গত বছরের তুলনায় এ বছর ১২৯টি মামলা কম হয়েছে। বলা হচ্ছে নারী নির্যাতনের সংখ্যা কমেছে। মহিলা পরিষদের হিসাব বলছে, গত বছরের প্রথম দশ মাসে নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতনের ঘটনার সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৫৭৫টি। এ বছরের একই সময়ে নির্যাতনের সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ১৯৭ টিতে।
নারী নির্যাতন প্রতিরোধ ও এ ধরনের ঘটনা কমিয়ে আনতে জেড আই খান পান্না বলেন, ‘এ ধরনের অপরাধের বিচারের ব্যবস্থাকে স্থানীয় পর্যায়ে নিতে হবে এবং বিচার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে হবে। পাশাপাশি নারী বা কন্যাশিশুকে স্কুল পর্যায় থেকেই জুডো কারাতে শেখাতে হবে।’
এ বিষয়ে ফওজিয়া মোসলেম বলেন, ‘যেখানে পরিসংখ্যানই পরিষ্কার নয়, সেখানে নির্যাতনের ঘটনা কমায় আমরা সন্তুষ্ট হই কীভাবে? নারী নির্যাতনের সংখ্যা কমিয়ে শূন্যের কোঠায় আনতে হলে তিন ধরনের পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমত: রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক দায়বদ্ধতা থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত: এ ধরনের অপরাধ ঘটলে সামাজিকভাবে প্রতিরোধ করতে হবে। তৃতীয়ত: ভুক্তভোগী নারীদের জন্য বিচার দ্রুত ও সহজগম্য করতে হবে।’