স্বাধীনতার পর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে কোনো অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ঘটনা এবারই প্রথম ঘটেছে। এই সরকারের কাছে সর্বস্তরের মানুষের প্রত্যাশাও অনেক। অন্তর্বর্তী সরকারও বিপুল কাজের ভার কাঁধে তুলে নিয়েছে।
সরকারের কর্মপরিধির মধ্যে রয়েছে রাজনীতি, অর্থনীতি, সংবিধান, বিচার বিভাগ, পুলিশ, জনপ্রশাসন, নির্বাচন, দুর্নীতি দমন, নারী অধিকার, শ্রম, স্থানীয় সরকার, গণমাধ্যম, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ইত্যাদি। মোটা দাগে বাদ যায়নি কোনোখাতই। এসব উদ্যোগ ঠিক কত দিনে শেষ করা সম্ভব হবে তা জানাতে পারেননি সরকারের দায়িত্বশীলরাও।
সরকারের বন ও পরিবেশবিষয়ক উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসান বলেছেন, সরকার কতদিনে কাজ শেষ করতে পারবে, বলা যাবে না। আরেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলম বলেন, এই সরকারের দায়িত্ব অনেক।
অন্তর্বর্তী এই সরকার কতদিন ক্ষমতায় থাকবে তার কোনো সুনির্দিষ্ট মেয়াদের কথা কোথাও বলা নেই। কেউ বলছেনও না। বরং বিএনপিসহ রাজনৈতিক দলগুলোর তরফ থেকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে নির্বাচন দেওয়ার চাপ রয়েছে। কিন্তু গ্রহণ করা কাজগুলো সরকার কত দিনে শেষ করতে পারবে, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়েছে।
সবাই চাইছেন, অন্তবর্তী সরকার সফল হোক। কিন্তু সরকারের মেয়াদ এবং সংস্কারকাজের জন্য প্রয়োজনীয় সময়ের মধ্যে যে ফারাক রয়েছে, সে বিষয়টি সম্প্রতি সামনে এনেছেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) চেয়ারম্যান রেহমান সোবহান।
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার যে উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে তা বাস্তবায়নের জন্য ৪ বা ৫ বছর দায়িত্বে থাকা প্রয়োজন হবে।’
তিনি বলেন, ‘তবে বর্তমান সরকারের প্রতিশ্রুতি হচ্ছে, যৌক্তিক সময়ে নির্বাচিত সরকারের হাতে দায়িত্বভার ছেড়ে দেওয়া, সম্ভবত এটি ১৮ মাস বা দুই বছর হতে পারে। এ অবস্থায় সংস্কারের বেশির ভাগ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। ফলে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, অন্তর্বর্তী সরকার যেসব সংস্কারকাজে হাত দিয়েছে, তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব কার ওপরে পড়বে।’
অভ্যুত্থান-পরবর্তী নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় চলে আসবে এমন একটি ধারণা জনমনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সংস্কার ও নির্বাচনের সময় নিয়ে তাই এই দলটিও সোচ্চার। রাজনৈতিক দল ছাড়াও সুধীসমাজের প্রতিনিধিরা এ বিতর্কে যুক্ত হচ্ছেন। বিএনপি বলছে, সব সংস্কার অন্তর্বর্তী সরকারের করার প্রয়োজন নেই। এগুলো নির্বাচিত সরকার করবে।
অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের তরফ থেকে বলা হচ্ছে, সংস্কার সম্পন্ন না হলে দেশে আবার ফ্যাসিবাদের উত্থান হবে। মেয়াদ, সংস্কার ও নির্বাচন নিয়ে এই বিতর্কের কারণে সরকার তার কাঙ্ক্ষিত মেয়াদ পূর্ণ করতে পারবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বলা হচ্ছে, সব সংস্কার সরকার সম্পন্ন করে নির্বাচন দেবে, না কি জরুরি সংস্কারগুলো শেষ করে অবশিষ্ট সংস্কারের বিষয়গুলো নির্বাচিত সরকারের জন্য রেখে দেবে?
ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর অন্তর্বর্তী সরকার ৮ আগস্ট দায়িত্ব গ্রহণ করে। কোন খাতে কী সংস্কার করা হবে, তা জানতে ও সম্পন্ন করতে ১৫টি স্বতন্ত্র সংস্কার কমিটি গঠন করা হয়। তাদের কাজের পরিধি সম্পর্কে বলা হয়েছে, তারা সংস্কার প্রস্তাব জমা দেওয়ার পর রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সেসব সংস্কার চূড়ান্ত করা হবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা সৈয়দ রিজওয়ানা হাসান এ প্রসঙ্গে খবরের কাগজকে বলেন, ‘বর্তমান সরকারের ওপর অনেক দায়িত্ব। আমরা কাজ করে চলেছি। কতদিনে এসব কাজ শেষ হবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। সংস্কারের জন্য প্রস্তাবগুলো পাওয়ার পর রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারব যে, বর্তমান সরকার সব শেষ করবে না কি, নির্বাচিত সরকারের জন্য রেখে দেওয়া হবে।’
প্রশ্ন উঠেছে, এসব প্রস্তাব কতদিনে বাস্তবায়ন করা হবে? অন্তর্বর্তী সরকার সব সংস্কার সম্পন্ন করে নির্বাচন দেবে, না জরুরি সংস্কারের পর বাকিটা নির্বাচিত সরকারের জন্য রেখে দেওয়া হবে? এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ও উপদেষ্টা মাহফুজ আলম খবরের কাগজকে বলেন, ‘ছাত্র জনতার আন্দোলনের ফলে ফ্যাসিবাদের পতনের পর গঠিত হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। এই সরকারের ওপর অনেক দায়িত্ব। সব দায়িত্ব কতদিনে শেষ করা সম্ভব হবে, তা এখনই বলা সম্ভব না।’
তিনি বলেন, ‘ডিসেম্বরের মধ্যে বিভিন্ন কমিটির কাছ থেকে সংস্কার প্রস্তাব পাওয়ার কথা রয়েছে। এরপর এসব প্রস্তাব নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা হবে। এখনই বলতে পারছি না, সংস্কারগুলো বর্তমান সরকার শেষ করবে, নাকি পরবর্তী নির্বাচিত সরকার করবে। আবার এও বলা যাচ্ছে না যে, সংস্কারের কতটা শেষ করে নির্বাচন হবে অথবা জরুরি সংস্কার শেষে নির্বাচন হবে।’
প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে পাঠানো প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে জানা যায়, অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মপরিকল্পনার অন্যতম দিকটি হচ্ছে অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের মধ্য দিয়ে নির্বাচিত সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করা। ইতোমধ্যে সার্চ কমিটির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়েছে। এই কমিশন ভোটার তালিকা হালনাগাদ করার কথা বলেছে। নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইন পরিবর্তন, স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রতীক বাদ দেওয়া, প্রবাসীদের ভোট দেওয়ার বিধান চালু, ইভিএম বাতিলসহ বেশ কিছু আইন পরিবর্তনের জন্য আলোচনা করছে নির্বাচন সংস্কার কমিশন। এসব চূড়ান্ত হলে বাস্তবায়নের দায়িত্ব পড়বে বর্তমান সরকারের ওপর।
সংবিধান সংস্কারবিষয়ক কমিশন কাজ শুরুর পর বিভিন্ন মহল থেকে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ চালু, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আনা, প্রাদেশিক সরকারব্যবস্থা, আনুপাতিক নির্বাচন চালুসহ বেশ কিছু প্রস্তাব এসেছে। এসবের কতটা বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তাবে রাখা যায়, তা নিয়ে কমিশন কাজ করছে। এসব প্রস্তাব গৃহীত হলে বাস্তবায়নের ভার পড়বে অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর।
বিভিন্ন উদ্যোগ থেকে আরও জানা যায়, অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের চেষ্টায় বর্তমান সরকার কাজ করছে। নেওয়া হয়েছে ব্যাপক পরিকল্পনা। এই পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে- বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করা, শ্রমিক অসন্তোষ নিরসন, রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের দেশে বিনিয়োগে উৎসাহিত করা প্রভৃতি। অর্থনৈতিক কর্মপরিকল্পনার মধ্যে আছে মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানি তেলের দাম কমানো, পরিবেশ দূষণ রোধ করার মতো পদক্ষেপ। এরই মধ্যে সরকারের আয় বাড়াতে রাজস্ব খাতের সংস্কারে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি কাজ শুরু করেছে। সেই কাজগুলো শেষ হলে বাস্তবায়নে যাবে বর্তমান সরকার।
দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি আবদুল আউয়াল মিন্টু খবরের কাগজকে বলেন, ‘বর্তমান সরকার যেসব সংস্কারের কথা বলছে, বিশেষভাবে অর্থনীতি পুনর্গঠনের কথা বলছে, তার সবটা তাদের পক্ষে শেষ করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এত সময় কি তাদের হাতে আছে? একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করাই তো অনেক বড় আয়োজন। এরপর অন্য কাজ তারা কীভাবে শেষ করবে? একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য অনেকে অপেক্ষা করছেন। নির্বাচিত সরকারের জন্য তাই কিছু রেখে দেওয়া যেতে পারে। এতে নির্বাচিত সরকারও তার ভবিষ্যতের অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়নের আইনি সুযোগ পাবে।
সরকারের আরেকটি সংস্কার চলমান আছে। দেশের ব্যাংক খাতের ব্যাপক সংস্কারের কাজ শুরু করেছে সরকার। অন্যদিকে বিগত সরকারের আমলে পাচার হওয়া ১২ বিলিয়ন থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলার ফিরিয়ে আনতে কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা এ বি এম মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, “পাচারের অর্থ ফেরত আনার আইনি পদক্ষেপগুলোয় দীর্ঘসূত্রতা আছে। প্রথমে দেখতে হবে- কে, কতটা অর্থ, কোন দেশে পাচার করে কী কিনেছে সেটা খুঁজে বের করতে হবে। এরপর এসব উদ্ধারের জন্য দেশে-বিদেশে ‘ল’ ফার্ম নিয়োগ দিতে হবে। প্রথমে দেশের আদালতে জিততে হবে। এরপর বিদেশের আদালতে বিষয়টি প্রমাণ করতে হবে। এসব শেষ করে বর্তমান সরকার কতদিনে পাচারের অর্থ ফেরত আনতে পারবে, তার সময়সীমা জানানো কঠিন।”
অন্যদিকে খেলাপি ঋণের অর্থ-আদায়ের লক্ষ্যে দেশে-বিদেশে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ জব্দ করে বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। বিগত সরকারের প্রভাবশালীদের ফাঁকি দেওয়া করের অর্থ আদায়েও সরকার কাজ করছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস জাতির উদ্দেশে দেওয়া তার সর্বশেষ ভাষণে বলেছেন, ‘বিগত সরকারের আমলের দুই শর বেশি প্রভাবশালী ব্যক্তির দুর্নীতির অনুসন্ধান করা হচ্ছে। করের অর্থ আদায়েও কাজ চলছে।’
তিনি আরও বলেন, গত ১৫ বছরের সব অপকর্মের বিচার করব। অক্টোবর পর্যন্ত ১ হাজার ৬০০ গুমের তথ্য পাওয়া গেছে। এই সংখ্যা ৩ হাজার ৫০০ ছাড়িয়ে যাবে।
সরকার আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় নিতেও কাজ করছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, চীন, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ব্রাজিল, তুরস্ক, রাশিয়া, ফিনল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, লিবিয়াসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির চেষ্টা করছে সরকার। জনশক্তি রপ্তানিতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানিতে বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টার সহকারী প্রেস সচিব অপূর্ব জাহাঙ্গীর খবরের কাগজকে বলেন, ‘এই সরকার অনেকের প্রত্যাশার সরকার। যে দায়িত্বগুলো এই সরকার পালন করবে বলে জানিয়েছে, তা কত দিনে শেষ করা সম্ভব হবে, তা এখনই বলা যাবে না। রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে কাজ করতে হবে। তারা যদি সময় দেয় তবে বর্তমান সরকার সব বাস্তবায়ন করবে। কাজ করার সময় না দিলে করবে না।’
সামগ্রিক সংস্কার ও করণীয় সম্পর্কে জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার খবরের কাগজকে বলেন, ‘হাতে নেওয়া সব কাজ সরকার শেষ করতে পারবে কি না, এটা সময়ই বলে দেবে। সময় কতটা পাওয়া যাবে তার ওপর সেসব নির্ভর করছে।’
তিনি বলেন, ‘তবে দেশে আইনের শাসন ও গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে হলে এসব সংস্কার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যে প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছে, তাতে সবকিছু স্বাভাবিক এবং প্রতিষ্ঠানগুলো ঠিক করতে হলে কর্তৃত্ববাদের রেখে যাওয়া বিধান বা ব্যবস্থায় হবে না। একদিনে স্বৈরাচারী সরকার সৃষ্টি হয়নি। বিদ্যমান ব্যবস্থার মধ্য দিয়েই সৃষ্টি হয়েছে। ফলে বিদ্যমান ব্যবস্থা বা পদ্ধতিগুলো দূর করতে না পারলে কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থা দূর হবে না। তাই সংস্কারের জন্য সরকারকে প্রয়োজনীয় সময় দিতে হবে, যাতে সময় নির্ধারণ করে সরকার দায়িত্ব পালন করতে পারে।’
সামগ্রিক বিবেচনায় সংস্কার যেমন জরুরি, তেমনি সংস্কার শেষে স্বাভাবিক নির্বাচনি ব্যবস্থায় ফেরাটাও জরুরি। সরকার তাতে সাফল্য পাবে কি না, সেটা ভবিষ্যতে বোঝা যাবে।