এমপি বা মন্ত্রী কিছুই ছিলেন না তিনি। কিন্তু এর পরও তার নাম ছিল আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের সবার মুখে মুখে। কারণ একটাই; শুধু কমিটিতে পদবাণিজ্য করে যে ভাগ্য ফেরানো যায়, এমন উদাহরণ সৃষ্টি করেছিলেন তিনি। এই তিনি হলেন দলটির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন শফিক। শুধু পদবাণিজ্য নয়, টেন্ডার-চাঁদাবাজিসহ একাধিক অপকর্মের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। আর এসব কারণে রংপুর অঞ্চলের আওয়ামী লীগের এই নেতাকে শেষ পর্যন্ত সাংগঠনিক সম্পাদকের পদ থেকে সরিয়ে দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য করা হয়।
কিন্তু জানা যায় এর পরও থেমে থাকেননি শফিক। দলের কেন্দ্রীয় পদের এই প্রভাবকেই তিনি টাকা কামানোর মেশিনের মতো ব্যবহার করেছেন। তার এসব কাজে স্ত্রী সুলতানা রাজিয়া পান্নার পূর্ণ সমর্থন ছিল। তিনি ছিলেন মহিলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। এই দুজন তাদের দলীয় ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে উত্তরাঞ্চলে বাণিজ্য করেছেন এবং অঢেল সম্পদ গড়েছেন বলে অভিযোগ আছে। অবশ্য সরকার পতনের পর অঢেল সম্পদের এই মালিক এখন পালিয়ে আছেন।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, শফিকের পদ পাওয়ার পেছনে তার স্ত্রী সুলতানা রাজিয়া পান্নার ভূমিকা রয়েছে। তিনি খুলনা বিভাগের প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা ও শেখ পরিবারের নিকটাত্মীয় একজনকে দিয়ে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের কাছে শফিকের নাম প্রস্তাব করান। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘরের কিউরেটর ও সাবেক শিক্ষা সচিব নজরুল ইসলাম খানও শফিকের পক্ষে সুপারিশ করেন। প্রভাবশালী ওই দুই ব্যক্তির সুপারিশে শফিককে প্রথমে সিলেট বিভাগ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তবে অর্থলোভী শফিক স্থানীয় আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতাদের অবহেলা করে হাইব্রিড ও অনুপ্রবেশকারীদের সঙ্গে সখ্য বাড়াতে থাকায় তাকে নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। দায়িত্ব পাওয়ার এক বছরের মাথায় তার বিরুদ্ধে পদবাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে। একই সঙ্গে লন্ডনে বসবাসকারী প্রবাসীদের কাছ থেকে তিনি বিভিন্ন অজুহাতে ‘ডলার কালেকশন’ করেছেন বলে আওয়ামী লীগের দপ্তরে অভিযোগ আসতে শুরু করে।
সূত্র জানায়, এ ধরনের একাধিক অভিযোগের কারণে শেষ পর্যন্ত অতিষ্ঠ হয়ে সিলেটের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে শফিককে রংপুর বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু এমন সিদ্ধান্তে দমে যাওয়ার পাত্র ছিলেন না শফিক। তিনি আরও দ্বিগুণ উৎসাহে পদবাণিজ্যে মনোনিবেশ করেন। এভাবেই ভাগ্যের চাকা ঘুরে যায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাবেক এই সভাপতির।
জানা গেছে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতির বাইরে তিনি শুধু একবার ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি হয়েছিলেন। আওয়ামী লীগের ভেতরে ও বাইরে তার গ্রহণযোগ্যতাও ছিল না। কিন্তু ২০১৯ সালে আওয়ামী লীগের ২১তম জাতীয় সম্মেলনে হঠাৎ করে দলের সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তার এই প্রভাবশালী হয়ে ওঠার ঘটনা অনেকের কাছে এখনো রহস্যময় হয়ে আছে। কী কারণে তিনি এক লাফে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হলেন, সে বিষয়ে দলে কারও কাছেই কোনো তথ্য ছিল না। তবে ওই সময় আওয়ামী লীগের মধ্যে আলোচনা ছিল, দলটির বিশেষ একজন নেতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল শফিকের স্ত্রী পান্নার। আর স্বামী শফিকের জন্য আওয়ামী লীগের মধ্যম পর্যায় থেকে শীর্ষ পর্যায়ের অনেক নেতার বাসায় গিয়ে সেই সময় তদবির করেন পান্না।
সূত্র জানায়, রংপুর বিভাগে দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে কমিটির পদবাণিজ্যের অভিযোগ আরও বড় হয়ে আলোচনায় স্থান পায়। এর সঙ্গে টেন্ডার-চাঁদাবাজিসহ একাধিক অপকর্মের অভিযোগ যুক্ত হয়। একপর্যায়ে শফিককে বহিষ্কারের আলোচনা ওঠে দলের হাইকমান্ডের মধ্যে। কিন্তু তার স্ত্রী পান্না প্রভাবশালী নেতাদের কাছে আবারও ধরনা দেন।
জানা যায়, শেখ পরিবারের এক সদস্য ছাড়াও দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের কাছে ফের তদবির করেন পান্না। আর ওবায়দুল কাদের শফিকের বিষয় নিয়ে শেখ হাসিনার সঙ্গে আলোচনা করেন। এমন পরিস্থিতিতে ২০২২ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে আওয়ামী লীগের ২২তম জাতীয় সম্মেলনে শফিককে সাংগঠনিক সম্পাদকের পদ থেকে সরিয়ে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য করা হয়। তবে তাতেও শোধরাননি বিতর্কিত শফিক। বরং অর্থের বিনিময়ে দুর্নীতিবাজ ব্যক্তিদের রাজনৈতিক সাপোর্ট দিয়ে যান তিনি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাখাওয়াত হোসেন শফিকের ব্যবসায়িক পার্টনার মেহেদী হাসান পাঠান ছিলেন মূল অর্থের জোগানদাতা। এই পাঠান বাংলাদেশ ক্রপ প্রোটেকশন অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক। শফিক ও পান্না দম্পতির সঙ্গে দেশ-বিদেশ ঘুরতে যেতেন এই পাঠান। তাদের সঙ্গে ছিলেন ক্রপ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এম সায়েদুজ্জামান। রাজনৈতিক এই দম্পতিকে সব ধরনের অর্থের জোগান দিতেন এম সায়েদুজ্জামান ও মেহেদী হাসান পাঠান। বিভিন্ন দেশে তাদের একসঙ্গে চলার একাধিক ছবি প্রতিবেদকের কাছে রয়েছে। বিনিময়ে সায়েদুজ্জামান ও পাঠানকে রাজনৈতিক সহযোগিতা দিতেন শফিক। এ দুজনের বিরুদ্ধে কৃষি খাতে দুর্নীতির অভিযোগের শেষ নেই। আওয়ামী লীগের আমলে কৃষি খাতে রাজত্ব গড়ে তোলেন সায়েদুজ্জামান।
বালাইনাশক আমদানি এবং বিতরণে হাজার কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে সায়েদুজ্জামান ও পাঠানের বিরুদ্ধে। সায়েদুজ্জামানের বাবা চুয়াডাঙ্গা জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি। এই সুবাদে তিনি নিজেকে কখনো শেখ পরিবারের নিকটাত্মীয়, কখনো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর পরিবারের সদস্য হিসেবে পরিচয়ও দিয়েছেন। আর এভাবেই প্রভাব খাটিয়ে তিনি কৃষক ও ভোক্তাদের ঠকিয়েছেন সমানতালে। সায়েদুজ্জামান ও পাঠান সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দেশে বালাইনাশক পণ্যের সংকট তৈরি করে পাঁচ গুণ বেশি দামে বিক্রি করেছেন বলে অভিযোগ আছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ দেওয়া হলে তা ধামাচাপা দিতে নিম্নমানের বালাইনাশক আমদানি করে কৃষকদের মাঝে বিতরণ করেন। এ নিয়ে ঝিনাইদহের শৈলকুপায় কৃষকরা মামলাও করেছেন। ২০১৮ সালে এ নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আমদানি নীতিমালা অনুসরণ করতে বললেও সায়েদুজ্জামান রাজনৈতিক ক্ষমতার বলে তা নাকচ করার সব ব্যবস্থা করেন। অনিয়মের কারণে চট্টগ্রাম পোর্টে অ্যাগ্রো কেমিক্যাল ব্যবসায়ীদের প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার পণ্য আটক করা হয়েছিল। যেখানে ব্যবসায়ীদের প্রতি এলসিতে ৪ লাখ টাকা জরিমানা ধরা হয়েছিল। কিন্তু সায়েদুজ্জামানের সিন্ডিকেট ক্ষমতার বলে জরিমানা না দিয়ে পণ্য ছাড়ার ব্যবস্থা করে। তাদের এসব অপকর্ম জানাজানি হলে কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে সায়েদুজ্জামানের মিমপেক্স অ্যাগ্রো কেমিক্যাল কোম্পানির আমদানি ও বিক্রি কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়। সায়েদুজ্জামান ও পাঠানের এসব অপকর্মে আওয়ামী লীগের অন্য নেতাদের মতো সাখাওয়াত হোসেন শফিকও মদদ দিয়েছেন। বিনিময়ে প্রতি মাসে তিনি মোটা অঙ্কের মাসোহারা নিয়েছেন।
আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হওয়ার পর উত্তরাঞ্চলে একচেটিয়া সরকারি কাজের টেন্ডার পেয়েছেন শফিক। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাজ নিয়ে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে সাব-কন্ট্রাক্টে কাজগুলো বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়েছেন তিনি। সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলকের ‘লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং’ প্রজেক্ট একচেটিয়াভাবে বাগিয়ে নেন শফিক। এ ছাড়া রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের বিভিন্ন জেলায় ওই প্রজেক্টের মূল টাকার চার ভাগের এক ভাগ দিয়ে কাজ করে দেখিয়েছেন, বাকি তিন ভাগের টাকা নিজের পকেটে ভরেছেন শফিক। এসব কাজ পেতে তার স্ত্রী পান্না সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর কাছে তদবির করতেন। এর মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ দিয়ে এই দম্পতি ঢাকা ও উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় নামে-বেনামে বাড়ি, জমি ও ফ্ল্যাট কিনেছেন। বগুড়া, নাটোর, রাজশাহীসহ বিভিন্ন স্থানে এই দম্পতির সম্পদের খোঁজ পাওয়া গেছে।
কমিটিতে পদবাণিজ্যের কারণে নেতা-কর্মীদের হাতে শফিকের হেনস্তা হওয়ার নজির রয়েছে। ২০২২ সালে সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে রংপুর বিভাগের জেলা ও উপজেলায় পদবাণিজ্য নিয়ে নেতা-কর্মীদের রোষানলে পড়েন শফিক। তাই সম্মেলনস্থলে কমিটি ঘোষণা না দিয়ে মধ্যরাতে তিনি কমিটি ঘোষণা করেন। ওই ঘটনায় অনেক উপজেলায় অর্থ লেনদেনের বিষয়টি জানাজানি হলে স্থানীয় নেতারা শফিককে হেনস্তা করেন।
২০২২ সালের ১ ডিসেম্বর কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলা আওয়ামী লীগের ত্রিবার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন শফিকের বিরুদ্ধে প্রার্থীদের কাছ থেকে পদের বিনিময়ে টাকা নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। রৌমারী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদ দেওয়ার বিনিময়ে ৩ কোটি টাকা নেন বলে অভিযোগ করেন অনেকে। তার কথিত পিএস ও গাড়িচালক বিপ্লব এসব অর্থের লেনদেন করতেন বলে জানা গেছে ।
সাখাওয়াত হোসেন শফিকের বিরুদ্ধে পদবাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে নীলফামারীর ডিমলা ও ডোমার উপজেলা, লালমনিরহাট জেলার আদিতমারী, পঞ্চগড়ের বোদা, আটোয়ারী উপজেলা এবং রংপুরের পীরগঞ্জ ও ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলায়। প্রতিটি কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন শফিক। জেলা কমিটি দেওয়ার ক্ষেত্রে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নাম কেন্দ্র থেকে ঠিক করা হলেও জেলা আওয়ামী লীগের অন্য পদগুলো শফিক টাকার বিনিময়ে হাইব্রিড ও অনুপ্রবেশকারীদের দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে এমন একাধিক অভিযোগ দিয়েছেন পদবঞ্চিতরা।
শফিকের সময়কার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রনেতাদের মধ্যে তিনজনের সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। শফিক দায়িত্ব পাওয়ার পর ওই নেতাদের রংপুর বিভাগের বিভিন্ন জেলায় দলীয় পদ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তবে জেলা কমিটিতে সাবেক নেতাদের পদ না দিয়ে টাকার বিনিময়ে হাইব্রিডদের পদ দিয়েছেন। এই অভিমানে শফিকের সঙ্গে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করেছেন ওই সাবেক ছাত্রনেতারা।