পাট খাতের সুদিন ফিরিয়ে আনতে হলে কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি পাট কিনতে হবে। কাঁচা পাট ও পাটজাত পণ্য বেচাকেনায় মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে হবে। পাট চাষে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। কৃষকের কাছে কম দামে উন্নত বীজ সরবরাহ করতে হবে। পাট চাষে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। পাটজাত পণ্য উৎপাদনে বৈচিত্র্য আনতে হবে। কাঁচা পাট ও পাটজাত পণ্য বিক্রিতে নতুন বাজার সন্ধান করতে হবে। সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে এসব সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে হবে।
লোকসান কাটিয়ে পাট খাতকে লাভজনক করতে বর্তমান সরকার এক গুচ্ছ সুপারিশ করেছে। শিল্প খাতের সংশ্লিষ্টরা পাট খাতে সুদিন ফিরিয়ে আনতে নতুন বাজার খোঁজার পরামর্শ দিয়েছেন। সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে পাট খাতের উন্নয়নে কাজ করার কথা বলেছেন। পাট চাষে এবং পাট কারখানায় উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে বলেও তারা জানিয়েছেন।
অন্তর্বর্তী সরকার পাট খাতের সুদিন ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগ নিয়েছে। এরই মধ্যে পাটের ব্যাগের ব্যবহারের ওপর জোর দিয়েছে। বিদেশেও পাটের নতুন বাজারের খোঁজে একাধিক কমিটি করা হয়েছে। সরকারপ্রধানও বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে পাট খাতে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণসহ ওই সব দেশে পাট ও পাটজাত পণ্যের বিক্রিতে ক্রেতা সংগ্রহে আলোচনা করেছেন।
বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সেখ বশির উদ্দিন বলেন, পাট খাতের উন্নয়নে সরকার নতুনভাবে নতুন উদ্যমে কাজ করছে। আশা করি, এর সুফল পাওয়া যাবে। অতীতের মতো পাট খাতকে এ দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে আবারও নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম খবরের কাগজকে বলেন, ‘অর্থনীতির ভিত্তি মজবুত করতে হলে এ দেশের শিল্প খাতে গতি আনতে হবে। বিশেষভাবে পাট, চামড়া, তৈরি পোশাকশিল্প, জাহাজ নির্মাণ ও জাহাজভাঙা শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি খাতে গুরুত্ব বাড়াতে হবে। বর্তমান সরকার পাট খাতে গুরুত্ব দিয়েছে- তার প্রমাণ এরই মধ্যে পাটের ব্যাগ বিক্রির ওপর জোর দিয়েছে।
দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি আবদুল আউয়াল মিন্টু খবরের কাগজকে বলেন, ‘এ দেশের মাটির উর্বরা শক্তি ভালো। এখানে চাষাবাদ ভালো হয়। তবে পাটের উৎপাদন বাড়াতে হলে ভালো বীজ লাগবে। চাষবাদে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। চাষের ক্ষেত্রে প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। নতুন বাজারের খোঁজ করতে হবে। তাহলে পাট খাতে সুফল আসবে।’
বিশেষজ্ঞরা পাটজাত পণ্যের চাহিদা বাড়াতে পাটজাত পণ্যের বৈচিত্র্যকরণ এবং পাট চাষে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর সুপারিশ করেছেন।
একসময় অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনা করে পাটকে ‘সোনালি আঁশ’ নামে ডাকা হতো। সময়ের পরিক্রমায় এ খাতে ক্রমাগত লোকসান হয়। পাট খাতের সরকারি কারখানা একে একে বন্ধ করা হয়। বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজেএসএ) ৭৭টি কারখানার মধ্যে এখন ২৪টি চালু আছে। গত ছয় মাসে পাটের সুতার উৎপাদন কমেছে ৪০ শতাংশ। পাটের বস্তা ও ব্যাগের রপ্তানিও কমেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে পাটখাতে মোট রপ্তানি আয় ৮৫৫ মিলিয়ন ডলার হয়, যা আগের বছরের তুলনায় ছয় শতাংশ কম। অন্যদিকে কাঁচা পাটের দাম বেড়ে যাওয়ায় পাটের সুতার দামও বেড়েছে। এতে অনেক বিদেশি ক্রেতা তুলার সুতা ও পলিপ্রোপিলিনের (পিপি) দিকে ঝুঁকেছেন।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য বলছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছর শেষে এই প্রাকৃতিক সুতা থেকে সামগ্রিক রপ্তানি আয় ৪৯২ মিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে।
পাট ব্যবসায়ী আজহার মোল্লা খবরের কাগজকে বলেন, ‘বিশ্ববাজারে আমরা ধীরে ধীরে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হারাচ্ছি। আমরা ভারতে রপ্তানি করতাম। ভারত সরকার অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপের পর সেখানে রপ্তানি কমেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমান সরকার এ খাতের গুরুত্ব বাড়িয়েছে। বাধ্যতামূলক পাটমোড়ক আইন দেশের বাজারে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে মন্দা কাটবে বলে মনে করছি।’
চাল, গম, ভুট্টা, ডাল, আটাসহ ১৯টি নিত্যপণ্য প্যাকেজিংয়ের জন্য পাটের বস্তা বাধ্যতামূলক করে ২০১০ সালে আইন করে সরকার। তবে আইনটি ঠিকমতো বাস্তবায়ন হয়নি। প্লাস্টিকের ব্যাগের ব্যাপক ব্যবহারের ফলে পাটের ব্যাগ মার খেয়ে যায়।
অন্যদিকে উন্নত বীজ, আধুনিক পদ্ধতির চাষাবাদ ও উৎপাদনশীলতার অভাবে পাট উৎপাদন কমেছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য অনুসারে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে পাট উৎপাদন ১৮ শতাংশ কমেছে। পাটকলের মালিকরা পাটের প্রায় ৮০ শতাংশ প্রক্রিয়াজাত করে বস্তা, ব্যাগ, সুতা উৎপাদন করেন। যার প্রায় সবই রপ্তানি করা হয়।
দেশের শীর্ষ পাট রপ্তানিকারক জনতা-সাদাত জুটমিলের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা হেলাল আহমেদ বলেন, ‘তুরস্ক ও উজবেকিস্তানে পাটের সুতার চাহিদা কমেছে। সেখানকার কার্পেট নির্মাতারা এখন পাটের সুতার বিকল্প খুঁজছেন। আমাদের পাটের বাজার বাড়াতে নতুন বাজারের খোঁজ করতে হবে।’
তিনি জানান, দেশের অনেক কারখানায় একসময় দিনে তিন শিফট কাজ হয়েছে। অথচ অর্ডার কমে যাওয়ায় এখন শিফট কমানো হয়েছে। কৃষক ন্যায্যমূল্য পেলে এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করা গেলে পাটের চাষ বাড়বে। উৎপাদন বাড়লে পাটশিল্পের সংকট কাটতে পারে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এবার জুলাইয়ে কাঁচা পাট বিক্রির মৌসুমের শুরুতে মণপ্রতি দাম ছিল ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা। দুই মাসের মধ্যে তা বেড়ে আড়াই হাজার টাকা হয়। সংশ্লিষ্ট খাতের ব্যবসায়ীরা পাটের দাম বাড়ার কারণ হিসেবে মধ্যস্বত্বভ্যগীদের দৌরাত্ম্যকে দায়ী করেছেন। বর্তমানে প্রতি মণ কাঁচা পাট ২ হাজার ৬০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত বছর এ সময়ে প্রতি মণ কাঁচা পাটের দাম উঠেছিল সর্বোচ্চ আড়াই হাজার টাকা।