ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব ঐক্যে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়েছে। নানামুখী প্রভাবে সেই ঐক্য এখন নেই। এমন মন্তব্য করেছেন বাম গণতান্ত্রিক জোটের নেতারা। সরকার পতনের পরে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় যে বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্যের তোড়জোড় শুরু হয়েছিল, সেটি নিয়েও দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে তাদের মধ্যে।
খবরের কাগজের সঙ্গে আলাপচারিতায় তারা বলেছেন, বৈষম্য বিলোপের লক্ষ্য নিয়ে ছাত্র-জনতার ঐক্যে যে নতুন অভিযাত্রা শুরু হওয়ার কথা ছিল, তাতে ছন্দপতন হয়েছে। তাই এখন ‘ফ্যাসিবাদী-স্বৈরাচারী কাঠামো’ বদলে দিতে ‘নয়া যুক্তফ্রন্ট’ গঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন তারা।
ঐক্য প্রক্রিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন বাম নেতারা
চলতি বছরের জুলাই মাসের শেষভাগে ছাত্র-জনতার বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন যখন তুঙ্গে, বাম জোটের শীর্ষ নেতারা তখন রাজপথে আরও বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠেন। এই আন্দোলনে নিজ ঘরনার নাগরিক সমাজকে সংযুক্ত করার পরিকল্পনা করেন তারা। গত ২ আগস্ট জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘দ্রোহযাত্রা’ শিরোনামে ও নাগরিক সমাবেশ থেকে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ ও বাম জোটের শীর্ষ নেতা হারুন-উর রশিদ ঘোষণা দেন, আওয়ামী লীগ সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের দুর্নিবার আন্দোলন চরমে উঠলে দাবি ওঠে সরকারের পদত্যাগের। অভিন্ন এই দাবিতে রাজনীতিকদের পাশাপাশি মাঠে নামে দেশের সুশীল সমাজ। তাতেই সরকারের পতন ত্বরান্বিত হয়।
আওয়ামী লীগ সরকার পতনের চার মাস পেরিয়ে গেছে। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও অনেকটা অন্য রকম হয়ে গেছে। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থী ও নাগরিক সমাজ থেকে অনেকটা দূরত্বে অবস্থান করছেন বাম নেতারা।
বৈষম্য, অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রতিরোধে জাতীয় ঐক্য গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয় সরকার পতনের পর। তবে সেই সম্ভাবনা এখন স্তিমিত হয়েছে বলে মন্তব্য করেন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ। তিনি বলেন, ‘সরকার পতনের আন্দোলন ছাড়াও সমাজ ও রাষ্ট্রের বৈষম্য ও পুঁজিবাদী ব্যবস্থা বিলোপ করতে একটি প্ল্যাটফর্ম গড়ে উঠেছিল সব দলের সমন্বয়ে। সেই প্ল্যাটফর্ম দুর্বল হয়ে গেছে। আমাদের সবার লক্ষ্য ছিল সমাজব্যবস্থার বদল। যে ভাবাদর্শে বৈষম্যবিরোধী প্ল্যাটফর্ম গড়ে উঠেছিল, এখন সে রকমটা দেখছি না। আমরা বলছি, রাষ্ট্রকাঠামো বদলাতে হলে ব্যবস্থার বদল করতে হবে। কেবল ক্ষমতার পালাবদল হলে রাষ্ট্রের বৈষম্য বিলুপ্ত হবে না। সে জায়গায় ব্যত্যয় হয়েছে। তাই বাম সংগঠনের ছাত্ররা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন।’
অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গেও বাম নেতাদের প্রচ্ছন্ন দূরত্ব তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন অনেক বাম নেতা। সিপিবির সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, ‘দেশীয় ও আন্তর্জাতিক কয়েকটি অদৃশ্য শক্তি প্রভাব বিস্তার করতে চাইছে। সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর পরামর্শ ও সমন্বয়ে দেশের জন্য যেসব কাজ করতে চায় তা সুষ্ঠুভাবে করতে পারছে না। মনে হয়, একটা রশি টানাটানি চলছে।’
গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম নেতা হারুন-অর রশিদ বলেন, ‘জুলাই-আগস্টের আন্দোলন-সংগ্রামকে অনেকে নানাভাবে ব্র্যান্ডিং করতে চাইছেন। গণ-অভ্যুত্থানে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের বড় ভূমিকা ছিল। কিন্তু দেখা গেল, ৫ আগস্টের পর পাহাড়ে আদিবাসীদের ওপর গুলি চালানো হলো। যে শ্রমিক ও নারীরা গণ-অভ্যুত্থানে বড় ভূমিকা রাখল, তাদের অংশগ্রহণ নেই। সবাইকে কেমন একদিকে টেনে নেওয়ার প্রবণতা রয়েছে।’
তবে সরকারের সদিচ্ছা থাকলেও এই ঐক্য প্রক্রিয়া পুনরুদ্ধার করা সম্ভব বলে মন্তব্য করেন সিপিবির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স। তিনি বলেন, ‘আমাদের কিছু সুপারিশ নিয়ে অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মতভেদ থাকতে পারে। আবার কিছু বিষয়ে তারা একমতও হতে পারেন। তাই রাষ্ট্রকাঠামোতে বৈষম্য বিলোপের লক্ষ্যে যেসব বিষয়ে সবাই একমত হবেন, সরকারকে সেগুলোই প্রাধান্য দিতে হবে। পাশাপাশি নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কারের লক্ষ্যে সরকার কী ভূমিকা রাখবে সেটি পরিষ্কার করতে হবে।’
নয়া যুক্তফ্রন্ট গঠনের চিন্তা
মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী গণতান্ত্রিক দল ও উদারমনা ব্যক্তিদের নিয়ে ‘নয়া যুক্তফ্রন্ট’ নামে একটি নতুন মোর্চা গঠনের কথা বলেছেন মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। এই মোর্চা দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক নানা বৈষম্য দূর করতে সক্রিয় ভূমিকা রাখবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘মহান মুক্তিযুদ্ধ ও চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের চেতনায় রাষ্ট্রকাঠামো গড়তে চাই যেখানে অবাধ লুটপাট বন্ধ হবে।’
বাসদের উপদেষ্টা বীর মুক্তিযোদ্ধা খালেকুজ্জামান বলেন, ‘প্রধান দুটি বুর্জোয়া দলের বাইরে, সাম্প্রদায়িক অপশক্তির বাইরে এসে বামপন্থি ও উদারমনা শক্তিগুলোর সমন্বয়ে একটি রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তোলার সম্ভাবনা রয়েছে। আমরা ফ্যাসিবাদবিরোধী বাম মোর্চা, বাংলাদেশ জাসদ, ঐক্য ন্যাপ ছাড়াও গণফোরামের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি। শিগগিরই আমরা আলোচনায় বসব এই ঐক্য প্রক্রিয়া নিয়ে।’
ভোটের প্রস্ততি শুরু
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস নির্বাচনের দিনক্ষণ নিয়ে আভাস দেওয়ার পর বাম দলগুলো নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে বলে জানান সিপিবি নেতা রুহিন হোসেন প্রিন্স। তিনি বলেন, ‘শুরু থেকেই আমাদের কথা ছিল, নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করলে গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা কার্যকরী হবে। প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচনের আভাস দেওয়ার পরে সিপিবির প্রস্তুতি পর্ব শুরু হয়েছে। আমরা দেখব ভোট কোন প্রক্রিয়ায় হচ্ছে। আমাদের প্রার্থীরা সেভাবে প্রস্তুতি নেবেন।’
ভোটের মাঠে বামপন্থিদের অবস্থান নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। প্রার্থীদের পরিচিতি, জনপ্রিয়তা নিয়েও অনেক কথা শুনতে হয় বাম নেতাদের। এ প্রসঙ্গে প্রিন্স বলেন, ‘আমরা কখন কী বলছি, সেটা হয়তো যথাযথভাবে জনগণের সামনে তুলে ধরতে পারছি না। এটা আমাদের আত্মসমালোচনা। সাধারণ মানুষ বলছে, আপনারা আন্দোলনের জন্য উপযুক্ত কিন্তু ভোটের জন্য না। এর কারণ হলো, ভোটের মাঠে টাকা ও পেশিশক্তি আমরা দেখাতে পারি না। আমরা তাই এবার সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছি, ভোটের আগে প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারণার দায়িত্ব নেবে নির্বাচন কমিশন। তাহলে কোনো রাজনৈতিক দল আলাদাভাবে প্রভাব খাটানোর সুযোগ পাবে না।’
বাসদের উপদেষ্টা খালেকুজ্জামান বলেন, ‘বিত্তশালী রাজনীতিবিদদের প্রভাবে, প্রতিবন্ধকতায় বাম দলগুলোর কথা প্রচারমাধ্যমে যায় না, গণমানুষও জানতে পারে না আমরা কী বলতে চাই। অনেকে মনে করে, ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদও বাম দল; আর আমরাও বাম দল। কিন্তু ওদের মতো আমরা বুর্জোয়া দলগুলোর সঙ্গে কখনো আপসকামিতায় যাইনি। বুর্জোয়াদের মতো অর্থ বা পেশিশক্তির প্রভাব আমরা ভোটের মাঠে দেখাতে পারি না। নিজ শক্তি বলে এখনো রাজনীতির ময়দানে টিকে আছি। তাই আমাদের প্রতি মানুষের জনসমর্থন আছে।’