সচিবালয়ে অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে কঠোর গোপনীয়তা অবলম্বন করা হচ্ছে। আগুনে পুড়ে যাওয়া ৭ নম্বর ভবনের ষষ্ঠ তলা থেকে নবম তলা পর্যন্ত শনিবার তদন্ত কার্যক্রম চালিয়েছে সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শনিবার (২৮ ডিসেম্বর) কঠোর গোপনীয়তায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে সেনাবাহিনীর ৪ সদস্যের একটি দল। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে সিটিটিসির (কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম) বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট ও মোবাইল মনিটরিং টিম। এ ছাড়া সিআইডির ফরেনসিক বিভাগ গতকাল অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আলামত সংগ্রহ করেছে।
গত বুধবার দিবাগত রাত ১টা ৫১ মিনিটে সচিবালয়ের ৭ নম্বর ভবনে আগুন লাগে। এতে ৫টি মন্ত্রণালয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এদিকে ঘটনা তদন্তে ডিএমপি (ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ) পাঁচ সদস্যের পৃথক একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
জানতে চাইলে সিআইডির ফরেনসিক বিভাগের (অপরাধ তদন্ত বিভাগ) ডিআইজি জমশের আলী খবরের কাগজকে বলেন, সচিবালয়ের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার দিন থেকেই সিআইডির ফরেনসিক বিভাগ আলামত সংগ্রহ করছে। গতকালও আমরা আলামত সংগ্রহ করেছি।
তিনি বলেন, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর মাঝে দুদিন সাপ্তাহিক ছুটির দিন থাকায় সব রুম খোলা যায়নি। কিছু রুম এখনো বন্ধ রয়েছে। গতকালও এগুলোর চাবি পাওয়া যায়নি। রবিবার সচিবালয় খোলা হবে ও আশা করা যাচ্ছে বাকি তালবদ্ধ রুমগুলো খোলা সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, ঘটনাস্থল থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। সেগুলোর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। এই মুহূর্তে ফলাফল জানানোর মতো তেমন কিছু আমাদের হাতে নেই। তবে আশা রাখেন, আগুন লাগার কারণ জানা যাবে।
ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মো. ইসরাইল হাওলাদার খবরের কাগজকে বলেন, ‘সচিবালয়ের আগুনের ঘটনা তদন্তে ডিএমপি ৫ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে। অগ্নিকাণ্ডের দিন থেকেই সেখানে সিটিটিসির বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট, মোবাইল মনিটরিং টিম কাজ করছে। এ ছাড়া সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে সব বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত চলছে। আমরা দিন-রাত একভাবে কাজ করছি। অচিরেই সব প্রশ্নের উত্তর বেরিয়ে আসবে।’
শনিবার বিকেল ৪টার পরে সেনাবাহিনীর ৪ সদস্যের একটি টিম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বলে জানা যায়। এ বিষয়ে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের মিডিয়া সেলের একজন কর্মকর্তা (আইএসপিআর) খবরের কাগজকে জানান, তদন্ত টিমের বিষয়ে কিছু জানা নেই। তবে সচিবালয়ের নিরাপত্তা থেকে শুরু করে যেকোনো অপ্রত্যাশিত ঘটনা এড়াতে সেনাবাহিনী কাজ করছে।
শনিবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, সচিবালয়ের সব কটি প্রবেশপথ বন্ধ। তবে এমন পরিস্থিতির মধ্যেও বেলা সাড়ে ৩টায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সরকারের গঠিত উচ্চপর্যায়ের ৮ সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি এক সভায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার তদন্ত কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যালোচনায় বসেছিলেন।
সচিবালয়ে শনিবারও কঠোর নিরাপত্তাবলয় লক্ষ্য করা গেছে। মোতায়েন রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য। এর মধ্যে সচিবালয়ের মূল প্রবেশপথ ১ নম্বর গেটের দায়িত্বরত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে তদন্তের অগ্রগতি বিষয়ে জানতে চাইলেও কেউ কোনো কথা বলতে রাজি হননি। এ বিষয়ে প্রধান প্রবেশপথে দায়িত্বরত পুলিশের ইন্সপেক্টর ফিরোজ আলম এই প্রতিবেদকের সঙ্গে এ-সংক্রান্ত বিষয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি। বারবার প্রশ্ন করার পর পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমি কিছু দেখিনি, তাই কিছু জানি না।’
এদিকে সচিবালয়ের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার তদন্তে নিয়োজিত পুলিশের (সিটিটিসি) এক সদস্য জানান, আগুন লাগা ভবনটি পূর্ব-পশ্চিমে লম্বালম্বিভাবে অবস্থিত। এখানে যখন অগ্নিকাণ্ড ঘটে তখন পশ্চিম দিকের কিছু কক্ষ, মাঝের কয়েকটি কক্ষ আবার পূর্বদিকের কিছু কক্ষ ভস্মীভূত হয়েছে। এর মাঝে আবার কিছু কক্ষ অক্ষত রয়েছে বা আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, আগুন কী কারও কথা শোনে যে, কোথায় পুড়তে হবে আবার কোথায় পুড়তে হবে না। এভাবে চলতে পারে না। আগুন লাগলে তো ধারাবাহিকভাবে পুড়িয়ে ফেলবে। কোথাও কোথাও আগুনের পছন্দ অনুযায়ী পুড়বে না। এমন কেন হলো, তা একজন অশিক্ষিত মূর্খ লোকও বুঝবে। তাই আপনিও বুঝে নেন কীভাবে আগুন লেগেছে বা অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে সচিবালয়ের একটি সূত্র জানায়, সকালেই সচিবালয়ে সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট, ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চের (ডিবি) একটি বিশেষজ্ঞ দল অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত স্থানগুলো পরিদর্শন করেছে। তা ছাড়া ডিএমপির বোম্ব ডিসপোজাল টিমও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। এ ছাড়া বিকেল ৪টার পর সেনাবাহিনীর একটি দল ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের ফ্লোরগুলো পরিদর্শন করেছে বলেও সূত্র জানিয়েছে।