জীবিকার তাগিদে তিনি উবারের ট্যাক্সি চালান। কিন্তু বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার মধ্যে পেটে গুলিবিদ্ধ হন। ঘটনাটি ঘটেছিল ১৯ জুলাই। এরপরই বদলে যায় তার জীবন। উবারের এই চালকের নাম মিরাজ শরিফ (৪৫)। তার আয়েই সংসার চলত। সংসারের সদস্য সংখ্যা ছয়।
পেটে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর গত পাঁচ মাসে মিরাজ শরিফের (৪৫) কোনো আয়-রোজগার নেই। স্ত্রী রূপা খানম (৩৫), তিন সন্তান ও মাকে নিয়ে তিনি ভীষণ বিপাকে পড়েছেন। মিরাজ নিজেও দিশেহারা। কী করবেন ভেবে পাচ্ছেন না।
স্ত্রী রূপা খানম বলেন, ‘প্রতিদিন ১ হাজার ৫০০ টাকার ওষুধ লাগে। বাসা ভাড়া, দুই মেয়ের পড়ার খরচ, ছয়জন মানুষের খাওয়ার খরচ। কীভাবে চলে এ সংসার?’
দীর্ঘশ্বাস ফেলে রূপা বলেন, ‘আগে মিরাজ গাড়ি চালাত। যা আয় করত তা দিয়েই সংসার চলত। এখন পাঁচ মাস হলো কোনো কাজ করতে পারে না। পরিবারের কারও কোনো আয় নেই। কিন্তু খরচ তো হচ্ছেই। এ নিয়ে ভীষণ দুশ্চিন্তায় আছি। আমার পরিবারের কী হবে? কীভাবে চালাব স্বামীর চিকিৎসার খরচ? ঋণইবা কীভাবে শোধ করব?’
তিনি বলেন, ‘ইতোমধ্যে মিরাজের শরীরে চারবার অপরেশন করা হয়েছে। আগামী ১২ জানুয়ারি আবার সিএমএইচে ভর্তি হতে বলেছেন চিকিৎসকরা। আরও একবার অপারেশন করাতে হবে। মিরাজের পেটে গুলি লাগার কারণে খাদ্যনালী ফেটে গেছে। কোনো খাবার হজম করতে পারে না। তাই পেট কেটে আলাদা মলদ্বার তৈরি করে দিয়েছেন চিকিৎসকরা। এ ছাড়া পেটের ভেতরে চার জায়গায় নাড়ি ছিঁড়ে গেছে।’
সম্প্রতি রাজধানীর তেজগাঁওয়ের নিকেতন বাজার গেটের বাসায় সাংবাদিকের সঙ্গে আলাপকালে সীমাহীন যন্ত্রণার কথা জানাতে গিয়ে মিরাজ শরিফ ও তার স্ত্রী রূপা খানম কান্নায় ভেঙে পড়েন।
মিরাজ দম্পতির দুই মেয়ে ও এক ছেলে। বড় মেয়ে মারজুবা আক্তার (১৯)। সে তেজগাঁও মহিলা কলেজ থেকে আগামী বছর এইচএসসি পরীক্ষা দেবে। ছোট মেয়ে অলিভা আক্তার বৃষ্টি মহাখালী মডেল হাইস্কুল থেকে আগামী বছর এসএসসি পরীক্ষা দেবে। এ ছাড়া চার বছর বয়সী ছেলে আল হাবিব এবং মা ফিরোজা বেগমকে (৬৫) নিয়ে দুঃসহ স্মৃতি ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে মিরাজের পরিবার। মিরাজের বাবা সাইদুল শরিফ ছয় বছর আগে মারা গেছেন।
মিরাজ শরিফের বাড়ি বরিশাল সদর উপজেলার ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম সাগরদী গাবতলার টিয়ারখালী রোডে। স্ত্রী, তিন সন্তান, অসুস্থ মাকে নিয়ে তার সংসার। পরিবারের তিনিই একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। অথচ এখন ঘরবন্দি। চিকিৎসার খরচ আর সংসার চালানো নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাদের।
ঘটনার বিবরণে মিরাজ বলেন, ১৯ জুলাই তার এক পরিচিত ব্যক্তি ফোন করে গাড়ি ভাড়া নিতে চান। ভাড়া নিয়ে কথা বলতে তিনি মহাখালী কলেরা হাসপাতালের সামনে যান। তখন সন্ধ্যা সোয়া ৬টা। সেই সময় সেখানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র ও পুলিশের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া চলছিল। একপর্যায়ে পুলিশের ধাওয়ায় ছাত্রদের মিছিলটি ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। এমন সময় একটা গুলি মিরাজের পেটে লাগে। তিনি আতঙ্কে দৌড়াতে থাকেন। কিছু দূর দৌড়ানোর পর তিনি রাস্তায় পড়ে যান। আন্দোলনরত ছাত্ররা তাকে কাছাকাছি হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু কোনো হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা না পেয়ে তার পরিবারের সদস্য ও বন্ধুরা তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজে নিয়ে যান।
মিরাজ আরও বলেন, ‘গুলিতে আমার খাদ্যনালী ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং পেটের নাড়ি চার জায়গায় ছিঁড়ে যায়। পরে ২০ জুলাই সকাল ১০টায় আমার শরীরে অপারেশন হয়। কিছুদিন ঠিকঠাক চলছিল। কিন্তু হঠাৎ শারীরিক অবস্থা খারাপ হলে গত ১২ সেপ্টেম্বর সিএমএইচে ভর্তি হই। এখন আমি ছয় সপ্তাহের বিশ্রামে আছি। আবার আগামী ১২ জানুয়ারি ভর্তি হব। তারপর আমার শরীরে পঞ্চম অপারেশন হবে।’
তিনি বলেন, ‘অপারেশন হলে কী হয় কে জানে। আমার কিছু হলে আমার পরিবারের কী হবে? যে অবস্থা হয়েছে চিকিৎসকরা বলেছেন, আমার খাদ্যনালী জটিল আকার ধারণ করেছে। অপারেশন করলে ভালো হবে কি না জানি না। আমার জন্য দোয়া করবেন।’
মিরাজ আহত হওয়ার পর তাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে যে ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে তা নিয়ে স্ত্রী রূপা খানম বলেন, ‘মহাখালী থেকে মিরাজকে নিয়ে যখন ঢাকা মেডিকেলে যাব তখন কোনো গাড়ি পাচ্ছিলাম না। অনেক গাড়িচালকের পায়ে ধরেছি। কিন্তু কেউ যেতে রাজি হননি। পরে কিছু রাস্তা রিকশায়, কিছু রাস্তা সিএনজিতে করে হাসপাতালে নিয়ে গেছি। ঢাকা মেডিকেলে গিয়ে আবার ঝামেলায় পড়ি। প্রথমে হাসপাতালে ভর্তি নেবে না বলে জানায়। পরে চিকিৎসকদের পায়ে ধরে অনুরোধ করার পর তারা ভর্তি নিতে রাজি হন।’
তিনি বলেন, ‘আমার স্বামীর চিকিৎসা করাতে এ পর্যন্ত প্রায় পাঁচ লাখ টাকা ঋণ হয়েছে। এ ঋণ শোধের তাড়া আছে। এ ছাড়া প্রতি মাসে বাসা ভাড়া দিতে হয় ২১ হাজার টাকা। আছে মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ। সব মিলিয়ে খুব সমস্যায় দিন কাটছে আমাদের। তবে সিএমএইচে চিকিৎসা করাতে কোনো টাকা খরচ হচ্ছে না। কিন্তু সব ওষুধ তো তাদের কাছে সব সময় থাকে না। সেটা বাইরে থেকে আনতে হয়। আবার আমাদের হাসপাতালে যাওয়া-আসায় টাকা লাগে। রোগীর খাবার কিনতে হয়। সব মিলিয়ে প্রতিদিন ১ হাজার ৫০০ টাকা লাগে।’ সহযোগিতা হিসেবে জুলাই ফাউন্ডেশন থেকে ৫০ হাজার টাকা পাওয়ার কথা জানান রূপা। কিন্তু তা একেবারেই পর্যাপ্ত নয়।
দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়ে মিরাজের মা ফিরোজা বেগম বলেন, ‘ছেলেটাকে নিয়ে ভীষণ দুশ্চিন্তায় আছি। ওর ভবিষ্যৎ কী হবে? আমার ছেলের জন্য দোয়া করবেন। ও যেন দ্রুত সুস্থ হয়ে যায়। তার অনেক স্বপ্ন সন্তান তিনটাকে লেখাপড়া করানোর। আমাদের যেন কারও কাছে হাত পাততে না হয়। আমার ছেলে যেন কাজ করে খেতে পারে। এই দোয়া করবেন সবাই।’ সূত্র: বাসস