বাপ্পি মিয়া (৩২) পিকআপ চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। বৈষম্যবিরোধীদের সঙ্গে বিজয়-উদযাপন করতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হন। এখন তিনি পঙ্গু হওয়ার পথে। বিছানায় শুয়ে-বসে দিন কাটে। তার ডান পায়ের হাঁটুর নিচের অংশে এক্সটার্নাল ফিক্সেটর (রড) লাগানো।
গত ৫ আগস্ট বিকেলে গুলিবিদ্ধ হলে তার ডান পায়ের নিচের অংশের হাড় ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়। এরপর থেকে বিছানাই তার ঠিকানা। আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের সহযোগিতা পেলে তার পরিবারের সদস্যদের মুখে ভাত ওঠে। স্ত্রী রোজি আক্তার (২২) ও তিন মেয়েকে নিয়ে কষ্টে কাটছে তার দিন। বাপ্পির পরিবারের সামনে এখন শুধুই অন্ধকার। ঘটনার পাঁচ মাস পেরিয়ে গেছে। সরকারিভাবে এখনো কোনো সহযোগিতা পাননি।
বাপ্পি মিয়ার বর্ণনা অনুসারে, গত ৫ আগস্ট বিকেল পাঁচটার দিকে ঢাকা থেকে পিকআপ গাড়ি চালিয়ে তিনি চট্টগ্রামে আসেন। নগরীর মনসুরাবাদ পুলিশ লাইনের কাছাকাছি অবস্থিত ট্রাকস্ট্যান্ডে তার গাড়িটি নিরাপদে রাখেন। এরপর টুকটাক মেরামতকাজ সেরে বাসায় ফেরার জন্য প্রস্তুতি নেন। ইতোমধ্যে ঢাকা থেকে ফেরার পথে রাস্তায় দেখেছেন অনেক বিজয় মিছিল। স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে গেছেন। সেই আনন্দে তিনি উদ্বেল ছিলেন। তিনি দেখেন ঢাকা ট্রাঙ্ক রোড হয়ে চট্টগ্রাম নগরীর দেওয়ানহাটের দিকে যাচ্ছে হাজার হাজার মানুষের একটি বিজিয় মিছিল। মিছিলের উত্তাল স্লোগানের সঙ্গে ট্রাকস্ট্যান্ডের পাশে দাঁড়িয়ে তিনিও গলা মেলান। হঠাৎ মিছিল লক্ষ্য করে পাশের একটি সুউচ্চ ভবনের ওপর থেকে এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়া শুরু হয়। ছাত্রলীগ ও যুবলীগের ছেলেরা গুলি ছুড়ছিল। তিনি পালানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু বেশি দূর এগুতে পারেননি। একটি গুলি এসে লাগে তার ডান পায়ের হাঁটুর নিচে। গুলি একপাশ দিয়ে ঢুকে অপর পাশ দিয়ে বের হয়ে যায়। গুলির আঘাতে রক্তাক্ত ও বিধ্বস্ত পা টেনে তিনি এগুতে পারছিলেন না। রক্তাক্ত অবস্থায় অনেক ক্ষণ পড়ে থাকার পর একজন ছাত্র এগিয়ে এসে তাকে উদ্ধার করে স্ত্রী রোজি আক্তারকে খবর পাঠায়।
বাপ্পি মিয়ার বাবা ইদ্রিছ মিয়া (৮২) দিনমজুরের কাজ করেন। তারা থাকেন মনসুরাবাদ মিয়াবাড়ি রোডের বাবুল কন্ট্রাক্টরের ভাড়া বাসায়। তার আরেক ছেলে সাইফুলও (২৫) এদিন মনসুরাবাদ এলাকায় বাম হাতে গুলিবিদ্ধ হন। তিনিও পিকআপ চালক। দুই সন্তানের একসঙ্গে গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় হতবিহ্বল হয়ে পড়ে ইদ্রিছের পরিবার। তবে সাইফুল এখন সুস্থ হয়েছেন। ১৫ দিন ধরে পিকআপ চালাচ্ছেন বলে জানান বৃদ্ধ ইদ্রিছ মিয়া।
সম্প্রতি বাবুল কন্ট্রাক্টরের ভাড়া বাসায় বাপ্পির স্ত্রী রোজি আক্তার একজন সাংবাদিককে বলেন, ঘটনার দিন সন্ধ্যা ৬টার দিকে একটি ব্যাটারিচালিত রিকশায় করে বাপ্পিকে নিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছাই। জরুরি বিভাগের সামনে তাকে একটি স্ট্রেচারে সাড়ে ৭টা পর্যন্ত শুইয়ে রাখা হয়। অনেক আকুতিমিনতি করার পরও কোনো চিকিৎসক বা নার্স তাকে দেখতে আসেননি। শুধুই অপেক্ষা করতে বলেছেন। রাত ৮টার দিকে জরুরি বিভাগের এক চিকিৎসক এসে পায়ে ব্যান্ডেজ দিয়ে কোনো রকমে রক্তপাত বন্ধ করেন। এভাবে জরুরি বিভাগের সামনেই ফেলে রাখা হয়।
রোজি আক্তার আরও বলেন, বাপ্পি প্রচণ্ড ব্যথায় কাতরাচ্ছিল। আশপাশের লোকজনের কাছ থেকে ধারদেনা করে ওষুধ কিনতেই আড়াই হাজার টাকা ব্যয় হয়। তিনি বলেন, ‘আমার কাছে এমন কোনো টাকাও ছিল না যে, প্রাইভেট হাসপাতালে নিয়ে যাব। রাত ১টা পর্যন্ত অপেক্ষা করে হাসপাতালে সিট না পেয়ে স্বামীকে নিয়ে বাসায় চলে আসি। পায়ের ব্যথায় সে ঘুমাতে পারেনি। দুই দিন পর দেখি মাংসে পচন ধরে সেখান থেকে পুঁজ পড়ছে। স্থানীয়দের পরামর্শে দেওয়ানহাট এলাকার ছাত্র আন্দোলনের প্রতিনিধি ইফতেখার হোসাইনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি ৯ আগস্ট বাপ্পিকে নিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দেন। ৩১ আগস্ট পায়ে অপারেশন হয়। পরে ৩ সেপ্টেম্বর হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নিয়ে বাসায় চলে আসি। বর্তমানে বাপ্পি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের স্পোর্টস মেডিসিন অ্যান্ড অর্থোস্কোপি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. বুলবুল আহমেদের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন।’ তিনি বলেছেন বাপ্পির আরও অপারেশন লাগতে পারে।
বাপ্পি মিয়া বলেন, ‘ভাড়া বাসার একটি রুমে আবদ্ধ আমার জীবন। বড় মেয়ে নিশা আক্তার (১৪) পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী, মেজ মেয়ে টিশা আক্তার (৮) দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে। ছোট মেয়ে ইয়ামিন আক্তারের বয়স চার বছর। স্ত্রী রোজী আক্তার এখন সন্তানসম্ভবা। স্ত্রী আগে একটি গার্মেন্টসে চাকরি করত। অসুস্থতার কারণে চাকরি ছেড়ে দিয়েছে। এরপর আমার এই বিপদ।’
গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর জামায়াতে ইসলামীর কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা ও আকিজ গ্রুপ থেকে ৩০ হাজার টাকা সহযোগিতা পাওয়ার কথা জানালেন বাপ্পি। এ ছাড়া শিল্পকলা একাডেমিতে ডেকে নিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে ১০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন হাসপাতালের ডা. মো. ইরফান চৌধুরী দিয়েছেন একটি হুইল চেয়ার। কিন্তু সরকারিভাবে এখনো কোনো সহযোগিতা পাননি তিনি। সাহায্য হিসেবে পাওয়া সব অর্থ ইতোমধ্যে চিকিৎসায় শেষ হয়ে গেছে।
বাপ্পি মিয়ার এখন চিন্তা, কী করে মেয়েদের লেখাপড়া চলবে। কী করে ঘরভাড়া দেবেন, কী করে খাবারের ব্যবস্থা হবে। অভাবের তাড়নায় এক মাস ফেনীতে শ্বশুরের বাসায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। এখন আছেন বাবা-ভাইয়ের আশ্রয়ে। চলার মতো কোনো টাকাপয়সাও নেই। বাবাও যা পেরেছেন দিয়েছেন। সেব শেষ! প্রথম প্রথম প্রতিবেশী ও স্বজনরা সহযোগিতা করলেও এখন আর কেউ খবর নেন না।
অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে অনুরোধ জানিয়ে বাপ্পি মিয়া বলেন, ‘আমরা যারা স্বৈরাচারী সরকারের পুলিশ ও সন্ত্রাসী দ্বারা আক্রান্ত হয়েছি সরকার যেন তাদের পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে। আমার অনাগত সন্তানসহ পুরো পরিবারকে যেন কষ্ট সহ্য করতে না হয়।’ সূত্র: বাসস