বাংলাদেশ-মায়ানমার সীমান্তে মাদকের কারবার যেন অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। পরিস্থিতি যেমনই হোক বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যত কঠোরই হোক না কেন, মাদক কারবারিরা তা তোয়াক্কা করছেন না। স্থানীয় বাসিন্দা ও গোয়েন্দাদের তথ্যমতে, মায়ানমারের সীমান্তসহ অভ্যন্তরে বেশ কিছুদিন ধরে যুদ্ধ পরিস্থিতি বিরাজ করলেও এপারে বাংলাদেশের সীমান্তে ইয়াবার চোরাচালান আনা-নেওয়ায় কোনো সমস্যা হচ্ছে না, বরং রমরমা অবস্থা বিরাজ করছে।
তথ্য বিশ্লেষণেও দেখা গেছে অভিন্ন চিত্র। গত ২৭ ডিসেম্বর থেকে ৫ জানুয়ারির মধ্যে মাত্র ১০ দিনে মাদকের কয়েকটি চালান আটক করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও র্যাব। এসব চালানে সোয়া প্রায় পাঁচ লাখ পিস ইয়াবা জব্দ করেছে তারা। এর বাইরেও স্থানীয় থানা-পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) বিচ্ছিন্নভাবে বেশ কিছু ইয়াবা জব্দ করেছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়।
এ প্রসঙ্গে বিজিবির অতিরিক্ত মহাপরিচালক (গোয়েন্দা) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. ইয়াসির জাহান হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, ‘ইয়াবার চোরাচালান বৃদ্ধির পেক্ষাপটে আমরা সীমান্তে আরও কড়াকড়ি জারি করেছি। পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করে সার্বক্ষণিক বাংলাদেশ-মায়ানমার সীমান্ত এলাকা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। কোনোভাবেই যাতে রোহিঙ্গা এবং ইয়াবার চোরাচালান প্রবেশ করতে না পারে সে লক্ষ্যে বিজিবি তৎপর রয়েছে।’
মাদকসহ সার্বিক পরিস্থিতি জানতে গতকাল সীমান্ত এলাকার নির্ভরযোগ্য স্থানীয় বাসিন্দা ও একাধিক সংস্থার গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে এ প্রতিবেদকের কথা হয়। তারা জানিয়েছেন, ইয়াবার চোরাচালান বেড়ে যাওয়ার পেছনে রয়েছে মায়ানমার সীমান্ত দখলে রাখা আরাকান আর্মির একশ্রেণির সদস্য। তারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ইয়াবা প্রবেশের ক্ষেত্রে মাদক চক্রগুলোকে সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে।
সূত্রগুলো বলছে, মায়ানমারের সেনাবাহিনী তথা নিরাপত্তা বাহিনীর অনেক কর্মকর্তা ও সদস্য আগে ‘বাণিজ্যের’ মতো করে বাংলাদেশে ইয়াবা পাচারে ভূমিকা রাখতেন। কিন্তু বর্তমানে সেই প্রায় একই কাজ করছে আরাকান আর্মির একশ্রেণির সদস্য। আর্থিক জোগান বাড়ানোর লক্ষ্যে তারা ইয়াবার চক্রকে চোরাচালানে সহায়তা করছে বলেও জানা গেছে। এর ফলে মায়ানমার সীমান্তসহ তাদের অভ্যন্তরে যুদ্ধ পরিস্থিতি বিরাজ করলেও ইয়াবার অবাধ চোরাচালানে কোনো সমস্যা হচ্ছে না।
অন্যদিকে বাংলাদেশের টেকনাফ-উখিয়া সীমান্ত এলাকার চিহ্নিত বা তালিকাভুক্ত মাদক কারবারিরা নানা কৌশলে তৎপরতা চালাচ্ছেন। সেখানে চক্রের বাংলাদেশি সদস্য ছাড়াও টেকনাফ-উখিয়ায় আশ্রয় নেওয়া মায়ানমারের বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা নাগরিকরা ইয়াবার চালান বহন, সংরক্ষণ ও সরবরাহের কাজে নিযুক্ত আছে। টেকনাফ ও উখিয়ার বাংলাদেশ সীমান্তেও বর্তমানে ইয়াবা সিন্ডিকেটে অনেক রাঘববোয়াল জড়িত রয়েছেন।
ইয়াবার চোরাচালান বৃদ্ধি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে র্যাব-১৫-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. সাজ্জাদ হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, ‘গত বছরের এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত ইয়াবা তথা মাদকের কারবার টেকনাফ তথা বাংলাদেশ-মায়ানমার সীমান্তে অনেকটা কমেছিল। কিন্তু গত ডিসেম্বরের শুরু থেকে ইয়াবা চক্রগুলো ব্যাপকভাবে তৎপরতা বাড়িয়েছে। তবে অন্যান্য সংস্থার পাশাপাশি র্যাব-১৫ মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর তৎপরতা ও নজরদারি বজায় রেখেছে।’
এ বিষয়ে টেকনাফের স্থানীয় অন্তত তিনজন ব্যক্তির সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তারা জানিয়েছেন, সাবেক এমপি আব্দুর রহমান বদিকে এই অঞ্চলের একসময়ের ইয়াবার হোতা হিসেবে ধরা হলেও বর্তমানে এমন আরও অনেকেই মাদকের বড় বড় ডিলার হিসেবে এলাকায় তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। যাদের মধ্যে অনেকের নাম ছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ মাদক কারবারির তালিকায়।
এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী গত সোমবার ডিএমপির ডিবি কার্যালয় পরিদর্শনে গিয়ে গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘মায়ানমার সীমান্ত এলাকায় অপহরণ চক্রের পাশাপাশি কয়েকটি মাদক চক্র সক্রিয় আছে। শুধু বদি ধরা পড়েছেন। তবে এই চক্রের অনেক সদস্য এখনো সক্রিয় রয়েছেন। আমরা সবাইকেই আইনের আওতায় নিয়ে আসতে কাজ করে যাচ্ছি।’
এর আগে ২০২২ সালের ডিসেম্বরে ১ হাজার ২৭৫ জন মাদক কারবারিকে তালিকাভুক্ত করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেই প্রতিবেদনে আব্দুর রহমান বদি ও তার ঘনিষ্ঠ সহচরদের নাম চলে আসে। কিন্তু আওয়ামী লীগের তৎকালীন এমপি বা দলীয় নেতা হওয়ার কারণে বরাবরই ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকেন বদি। যদিও গত ২০ আগস্ট চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার হন কক্সবাজার-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও ইয়াবাসম্রাট আব্দুর রহমান বদি। তবে তার সহযোগী এবং নতুন মাদক কারবারিরা এখন বেশ তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন বলেও জানিয়েছে স্থানীয় সূত্রগুলো।
স্থানীয়দের তথ্যমতে, টেকনাফের কাটাখালীর সৈয়দ আলমের ছেলে তোফায়েল, হানিফের ছেলে রিদুয়ান, একই এলাকার রুবেল, কুতুবদিয়া পাড়ার আব্দুর রহিমের ছেলে আবছার, বকতিয়ার আহমদের ছেলে সোহেল ওরফে বদি, কানজরপাড়ার আবুল কালামের ছেলে মিজান ওরফে কালা মিজান, হ্নীলা ইউনিয়ন যুবলীগের নেতা রেজাউল করিম, আত্মসমর্পণ করা মাদক কারবারি জামাল মেম্বারের ছেলে শাহ আজম, নুরুল হুদা মেম্বার, নাজিরপাড়ার এনামুল ওরফে এনাম মেম্বার, খারাংখালীর হাসান মেম্বারের ছেলে ইউসুফসহ আরও অনেকের বিরুদ্ধে বর্তমানে মাদক কারবারে সক্রিয় থাকার অভিযোগ আছে। এমনকি এরা প্রত্যেকই একেকটি সিন্ডিকেটের প্রধান বা ডিলার হিসেবে পরিচিত। এদের প্রতিটি সিন্ডিকেটের নানা পর্যায়ে দায়িত্ব পালনের জন্য অন্তত ১৫০ থেকে ২০০ লোকবল আছে বলেও জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
১০ দিনে সাড়ে ৫ লাখ ইয়াবা জব্দ
তথ্য বিশ্লেষণে জানা যায়, গত ৫ জানুয়ারি রবিবার কক্সবাজারের টেকনাফে অভিযান চালিয়ে ২ লাখ ৩০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করে বিজিবির স্থানীয় ব্যাটালিয়ন। এ সময় মায়ানমারের মংডু জেলার বাসিন্দা আব্দুর শুক্কুরকে (২১) আটক করা হয়। একই রাতে টেকনাফ থেকে ৯৫ হাজার ১৩৫ পিস ইয়াবা, মাদক বিক্রির নগদ ৪ লাখ ২০ হাজার টাকা এবং ৫ লাখ ৫ হাজার মায়ানমার মুদ্রাসহ (কিয়াট) এক মাদক কারবারিকে আটক করে র্যাব-১৫। তার আগে গত ৩ জানুয়ারি টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ পশ্চিম নৌঘাট এলাকায় অভিযান চালিয়ে এক লাখ পিস ইয়াবাসহ মো. শফিক উল্লাহ (৩০) নামে এক মাদক কারবারিকে আটক করেছে র্যাব-১৫। এর আগে গত ৩০ ডিসেম্বর টেকনাফের উনচিপ্রাং এলাকা থেকে ৬০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধারসহ তারেকুর রহমান মানিক (২২) নামে একজনকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। গত ২৭ ডিসেম্বর টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের বালুখালী এলাকা থেকে ৪০ হাজার পিস ইয়াবাসহ করিম নামে এক মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব-১৫। তার আরও আগে গত ১৮ নভেম্বর কক্সবাজারের টেকনাফ শাহপরীর দ্বীপে অভিযান চালিয়ে ২ লাখ ১০ হাজার পিস ইয়াবা ট্যাবলেট জব্দ করে বাংলাদেশ কোস্টগার্ড। এর বাইরেও প্রতিনিয়তই ইয়াবার ছোট ছোট চোরাচালান আটক করছে সীমান্তে দায়িত্বরত বিজিবি, র্যাব, পুলিশসহ আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো।