আবারও ঋণখেলাপিদের সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগ নিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর যদিও ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বলে আসছেন। তা সত্ত্বেও এখন ঋণখেলাপিদের ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দেওয়ার উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যবসায়ীদের নানামুখী দাবির মুখে এমন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এরই অংশ হিসেবে ডাউন পেমেন্টের শর্ত শিথিল, সুদ মওকুফ ও ঋণের মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ দেওয়া হবে। তবে ইচ্ছাকৃত এবং চিহ্নিত ঋণখেলাপিরা এই সুযোগ পাবেন না। এ জন্য একটি কমিটি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
জানা গেছে, পুরো কাজটি সঠিকভাবে করতে এই বিষয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে, যার নাম দেওয়া হয়েছে বাছাই কমিটি। পুরো আর্থিক খাতের অংশীজনের সমন্বয়ে এই বাছাই কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির প্রধান হচ্ছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের অফসাইট সুপারভিশন ডিপার্টমেন্টের দায়িত্বরত নির্বাহী পরিচালক (বর্তমানে মেজবাউল হক)। তিনি এই কমিটির আহ্বায়ক। আর সদস্যসচিব হচ্ছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগের (বিআরপিডি) পরিচালক বর্তমানে (মোহাম্মদ শাহরিয়ার সিদ্দিকী)। এর বাইরে তিনজন সদস্য রয়েছেন। তারা হলেন সাবেক ব্যাংকার মামুন রশীদ, অর্থ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা এবং ব্যবসায়িক প্রতিনিধি হিসেবে এফবিসিসিআই সভাপতি (বর্তমানে প্রশাসক আবদুল হাই শিকদার)।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এটা শুধু খেলাপি ঋণের জন্য নয়। আমাদের যেসব নীতিমালা আছে- যেমন ঋণ পুনঃতফসিল নীতিমালা, সুদ মওকুফ নীতিমালা- সেগুলো পর্যালোচনা করা এবং সেই অনুযায়ী সাম্প্রতিক আন্দোলন, অগ্নিকাণ্ড, করোনা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, বন্যাসহ প্রকৃত ক্ষতির মুখে পড়া ৫০ কোটি টাকা বা তার বেশি ঋণে বিশেষ পুনঃতফসিলের প্রস্তাব যাচাই-বাছাই করে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে সুপারিশ করাই কমিটির অন্যতম কাজ। মূলত তিনটি স্তরে এই কাজটা করা হবে। প্রথমত, আমাদের যে নীতিমালাগুলো আছে, সেগুলো পর্যালোচনা করা, ৫০ কোটি টাকার ওপরে যেসব ঋণ আছে, যেগুলো মনে করা হচ্ছে যে, বিভিন্ন সময়ে সমস্যায় পড়েছে অর্থাৎ কোভিড-১৯, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং বন্যার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে- এই ঋণগুলোর ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের মাধ্যমে বাছাই কমিটির কাছে পাঠাবে। বাছাই কমিটি সেগুলো পর্যালোচনা করে একটা সুপারিশ বাংলাদেশ ব্যাংকে দেবে। বাংলাদেশ ব্যাংক সেই সুপারিশ আবারও পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নিবে। তৃতীয়ত, নিয়ন্ত্রণবহির্ভূত কারণে যেসব ঋণ শ্রেণিকৃত হবে সেগুলোর আবেদন প্রাপ্তিগুলোও পর্যালোচনা করবে। তবে যারা চিহ্নিত ঋণখেলাপি, তাদের কোনো বিষয় এখানে বিবেচনা করা হবে না।
ব্যাংক খাত-সংশ্লিষ্টরা জানান, বিগত সরকারের সময় যাচাই-বাছাই করে ঋণ বিতরণ না করায় সেই ঋণগুলো আর আদায় হচ্ছে না। ব্যাংকগুলোও আদায়ে মনোযোগ না দিয়ে তাদের নানা ধরনের সুবিধা দিচ্ছে। আগের গভর্নর আবদুর রউফ তালুকদার দায়িত্ব নেওয়ার পর পরই ব্যবসায়ীদের ঢালাওভাবে সুবিধা দেওয়া হয়। এতে ঋণখেলাপির তালিকা থেকে নাম পড়ে যায় অধিকাংশ ব্যবসায়ীর। সেই সঙ্গে বিভিন্ন নীতিছাড়ের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ কম দেখানো হচ্ছিল। আবার প্রভাবশালীরা কিস্তি না দিলেও খেলাপি দেখানো হচ্ছিল না।
তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে ৪৭০ কোটি টাকা ঋণ চুক্তির ফলে গত বছর থেকে খেলাপি ঋণের কঠিন শর্ত মানতে হচ্ছে। এর মধ্যে গত ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর অনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নেওয়া অনেক ঋণ এখন খেলাপি হতে শুরু করেছে। আগের মতো বিশেষ সুবিধা বন্ধ হয়েছে। এসব কারণে খেলাপি ঋণ দ্রুত বাড়ছে। গত বছরের ৯ মাসে খেলাপি ঋণ বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। গত সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৮৪ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা, যা ব্যাংক খাতের মোট ঋণের প্রায় ১৭ শতাংশ। লাগামহীনভাবে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির মধ্যে ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন সংগঠন ঋণ পুনঃতফসিলে বিশেষ সুবিধার আবেদন জানিয়ে আসছিল। গভর্নর ব্যবসায়ীদের কোনো অনৈতিক সুবিধা দেওয়া হবে না বললেও বাংলাদেশ ব্যাংক বিশেষ ছাড়ে পুনঃতফসিলের উদ্যোগ নিয়েছে।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. মঈনুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক যে উদ্দেশ্যে এমন উদ্যোগ নিয়েছে, সেটা হবে না। এখান থেকে খুব বেশি অর্থ আদায় হবে না। কারণ এই অর্থ দেশের মধ্যে নেই। এটা বাইরে চলে গেছে। ফলে এসব সুবিধা দিয়ে সমস্যাকে দীর্ঘায়িত করতে পারবে। কিন্তু সত্যিকারভাবে কোনো সমাধান আসবে না। এর মাধ্যমে খুব ক্ষুদ্র একটা অংশ আদায় হতে পারে। বড় অংশটা আর কখনোই আদায় হবে না। কারণ এটা দেশের বাইরে চলে গেছে। এমন অবস্থায় বাংলাদেশ ব্যাংকের করণীয় বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তাদের যেসব সম্পত্তি দেশে আছে, সেগুলো ক্রোক করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।’
এই বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র হোসনে আরা শিখা খবরের কাগজকে বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে করোনা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, বন্যাসহ নিয়ন্ত্রণবহির্ভূত বিভিন্ন কারণে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের ঋণ পুনঃতফসিলে বিশেষ ছাড়ের প্রয়োজন আছে কি না, তা যাচাই-বাছাই করার জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি সুদ মওকুফ, ঋণ পুনঃতফসিল, শ্রেণিকৃতসহ বিভিন্ন নীতি পর্যালোচনা করবে এই কমিটি। তবে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিরা এই বিষয়ে কোনো আবেদন করতে পারবে না।’
একই বিষয়ে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘সাম্প্রতিক পরিস্থিতির কারণে প্রকৃত ব্যবসায়ীদের অনেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে শুধু ক্ষতিগ্রস্তদের সুবিধা দেওয়া হলে ভালো হবে। আগের মতো কোনোভাবেই ঢালাও সুবিধা দেওয়া ঠিক হবে না।’ তিনি বলেন, ‘খেলাপি ঋণে সময় বাড়ানোর বিষয়টি ঠিক নয়। ২০১২ সালের আগ পর্যন্ত আমরা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে খেলাপি ঋণ নির্ধারণ করতাম। পরে সেখানে ছাড় দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেখানে ছাড় দেওয়ায় কী লাভ হয়েছে! ২০০৯ সালে যেখানে আমাদের খেলাপিঋণ ছিল ২২ হাজার কোটি টাকা; এখন তা বেড়ে হয়েছে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা। ফলে আলটিমেটলি আমাদের কোনো লাভ তো হয়ইনি বরং ক্ষতি হয়েছে।’
এর আগে, ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক বিবেচনায় ২০১৩ সালে নিয়ম শিথিল করা হয়। নামমাত্র ডাউনপেমেন্ট দিয়ে বিশেষ বিবেচনায় ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ চালু করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এরপর ২০১৫ এবং ২০১৮ সালে আবার ২ শতাংশ ডাউনপেমন্ট দিয়ে ঋণ নিয়মিত এবং পুনর্গঠনসহ বিভিন্ন সুবিধা দেওয়া হয়। করোনা শুরুর পর ২০২০ সালে ১ টাকা না দিলেও ঋণ নিয়মিত দেখানোর সুযোগ দেওয়া হয়। এরপর ২০২১ সালে কিস্তির ১৫ শতাংশ এবং ২০২২ ও ২০২৩ সালে অর্ধেক দিলেই নিয়মিত দেখানো যেত। আব্দুর রউফ তালুকদার গভর্নরের দায়িত্ব নিয়ে ২০২২ সালে ঋণ পুনঃতফসিলের নীতিমালায় ব্যাপক শিথিলতা আনেন। আগে যেখানে ঋণ পুনঃতফসিলে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ ডাউনপেমন্ট দিতে হতো, তা কমিয়ে আড়াই থেকে সাড়ে ৪ শতাংশ করা হয়। পটপরিবর্তনের পর এখন আবার বিশেষ বিবেচনায় পুনঃতফসিলের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।