২০০৮ থেকে ২০২৪। ১৬ বছর। এই সময়ে খুলনা মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সিটি করপোরেশনের অপসারিত মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেকের নগদ টাকা বেড়েছে প্রায় ৮৩২ গুণ। ২০০৮ সালের সিটি নির্বাচনের সময় তার কাছে নগদ টাকা ছিল মাত্র ৫৭ হাজার ৫৫০ টাকা। ২০২৩ সালে তার কাছে নগদ টাকার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৪ কোটি ৭৯ লাখ। চারটি ব্যাংকে তার জমা ছিল আরও ১ কোটি ১৮ হাজার টাকা।
জানা গেছে, সিটি করপোরেশনের মেয়র থাকা অবস্থায় নিয়ম ভেঙে ঠিকাদারি ব্যবসার সঙ্গে জড়ান তিনি। খুলনার বেসরকারি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ পদে থেকে অর্থ লোপাটের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। কয়েক বছরের মধ্যেই ঢাকা, খুলনা, বাগেরহাটে কৃষি-অকৃষি জমি, মৎস্যঘের, রাজউকের পূর্বাচল, কেডিএ ময়ূরী আবাসিক ও গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের মুজগুন্নি আবাসিকে প্লটসহ নানা অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িয়ে তালুকদার আব্দুল খালেক ‘আঙুল ফুলে কলাগাছ’ হয়ে ওঠেন।
অভিযোগ রয়েছে, খুলনা সিটি করপোরেশনে মেয়র হিসেবে প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদা ও ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের মহানগর সভাপতি থাকায় সবকিছু একক নিয়ন্ত্রণে ছিল তালুকদার আব্দুল খালেকের। অনিয়ম-দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার আর লুটপাটের মাধ্যমে শতকোটি টাকার মালিক বনে গেছেন।
সাবেক মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে মাঠে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গত ২১ জানুয়ারি দুদকের খুলনার উপপরিচালক আবদুল ওয়াদুদকে প্রধান করে অনুসন্ধান টিম গঠন করে সংস্থাটি। এর মধ্যে তালুকদার খালেক ও তার স্ত্রী হাবিবুন নাহারের আয়কর রিটার্ন, কর নির্ধারণী আদেশসহ সংশ্লিষ্ট রেকর্ডপত্র, তার ব্যবসায়িক অংশীদার হিসেবে পরিচিত ঠিকাদারদের তথ্য, মেয়র হয়ে রামপাল-মোংলায় যাতায়াতের জন্য কেসিসির গাড়ি ব্যবহার, নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির অর্থ আত্মসাতের বিষয়েও অনুসন্ধান করছেন দুদক কর্মকর্তারা।
জানা যায়, খুলনা সিটি করপোরেশনের মেয়র হয়েও প্রায়ই তিনি ব্যক্তিগত কাজে খুলনা থেকে মোংলা ও রামপাল যেতেন। তিনি খুলনার নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটিতে ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন। তার স্ত্রী হাবিবুন নাহার ছিলেন ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য। ২০১৮ ও ২০২৩ সালে দুটি নির্বাচনে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে বৈঠক করে শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের খালেক তালুকদার তার পক্ষে প্রচার চালাতে বাধ্য করেন। প্রচারকাজে ব্যয় মেটাতে প্রচুর টাকা তোলা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিল থেকে।
সিটি করপোরেশনে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান মেসার্স হোসেন ট্রেডার্স, তাজুল এন্টারপ্রাইজ ও আজাদ ইঞ্জিনিয়ার্সের সঙ্গে খালেক তালুকদারের ব্যবসায়িক সম্পর্ক রয়েছে বলে জানা গেছে। এই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ঠিকাদারি কাজের যাবতীয় তথ্য ও পরিশোধিত বিলের পরিমাণ জানতে চেয়ে দুদকের পক্ষ থেকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটিতে আর্থিক অনিয়মের বিষয়ে তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা হচ্ছে। সিটি করপোরেশনের অধিকাংশ কাজ পেয়েছেন খালেকের আস্থাভাজন ঠিকাদাররা।
২০০৮ সালের নির্বাচনে তার কাছে নগদ ৫৭ হাজার ৫৫০ টাকা থাকার তথ্য দেন। এর মধ্যে কৃষি খাত থেকে আয় ২ লাখ ১০ হাজার, ব্যাংকের সুদ থেকে আয় ২ লাখ ১৮ হাজার, বাড়ি ভাড়া থেকে আয় ১ লাখ ৯১ হাজার, সঞ্চয়পত্র থেকে আয় ৬ লাখ ৮২ হাজার, ১০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র ও ১৮ লাখ টাকার পোস্টাল এফডিআর। তার দুটি গাড়ি, ২৩ বিঘা কৃষিজমি, তিন কাঠা অনাবাদি জমি আছে। জমিসহ নগরীর কাস্টমঘাটের একটি বাড়ির অর্ধেকের মালিক তিনি, যার দাম ২ কোটি ১২ লাখ টাকা।
৫ আগস্টের পর থেকে তালুকদার খালেক আত্মগোপনে রয়েছেন। দুর্বৃত্তরা তার বাড়িতে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালিয়েছে। বর্তমানে তিনি কোথায় তা কেউ জানে না। কাস্টমঘাটের বাড়ি দখল, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। হলফনামা অনুযায়ী, ২০২৩ সালে খালেকের নগদ টাকা ছিল ৪ কোটি ৭৯ লাখ। চারটি ব্যাংকে জমা ছিল ১ কোটি ১৮ হাজার টাকা। তবে এই টাকা তিনি কীভাবে আয় করেছেন পলাতক থাকায় তার কাছ থেকে জানা যায়নি।
সচেতন নাগরিকদের সংগঠন খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, বিগত সরকারের সময় যে বা যারা কালোটাকার মালিক হয়েছে, দুর্নীতি-অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ছিল, তাদের প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনতে হবে। সিটি করপোরেশনের অপসারিত মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক ও তার স্ত্রী হাবিবুন নাহারসহ তাদের সহযোগীদের দুর্নীতি-অনিয়মের ব্যাপারে দুদক যে পদক্ষেপ নিয়েছে তাকে নাগরিক সংগঠন স্বাগত জানায়। একইভাবে প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ পদধারী ব্যক্তি তালুকদার খালেক কীভাবে ঠিকাদারি সিন্ডিকেটে জড়িত হলেন এবং তার সহযোগী আরও যারা এভাবে আয়বহির্ভূত বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন, প্রত্যেকের বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। দুর্নীতির মূলোৎপাটনে কাউকে ছাড় দেওয়া যাবে না।
দুদকের খুলনার উপপরিচালক আবদুল ওয়াদুদ খবরের কাগজকে জানান, সাবেক মেয়রের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত শুরু হয়েছে। তার ও সহযোগীদের আর্থিক সংশ্লিষ্টতার তথ্য-উপাত্ত চেয়ে বিভিন্ন সংস্থায় চিঠি দেওয়া হয়েছে।