লক্ষ্মীপুরে একটি ব্রিজের অভাবে যুগ যুগ ধরে দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন সদর উপজেলার চরমনী মোহন ইউনিয়নের প্রায় ১৫ হাজার বাসিন্দা। ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ড ক্যাম্পের খালে ব্রিজ না থাকায় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে ৪, ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের। এতে করে তাদের নিত্যদিনের যাতায়াত ও স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের যাতায়াতে ভোগান্তি পোহাতে হয়।
বাঁশের সাঁকো তাদের একমাত্র অবলম্বন। তবে সেই সাঁকোটিও পার হতে না পেরে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের বিদ্যালয়ে যাতায়াত করা সম্ভব হয় না। অধিকাংশ শিক্ষার্থীর পিতা-মাতা ও অভিভাবকরা কোলে করে সাঁকো পার করে দেন।
এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মেঘনা নদীর সঙ্গে সংযুক্ত থাকায় খালটিতে প্রতিদিনই জোয়ার ভাটার পানি আসে। যার কারণে সাঁকোটি কয়দিন পরপরই মেরামত করতে হয়। কয়েক মাস পরপরই এলাকার লোকজন প্রতি ঘর থেকে ৫০, ১০০ টাকা করে চাঁদা তুলে সাঁকোটি মেরামত করে সচল রাখে। এইভাবে দু-এক মাস পরপর সাঁকোটি মেরামত করে থাকেন তারা। এ ছাড়া অসুস্থ রোগী গাড়িতে করে আনা-নেওয়ার সুযোগ না থাকায় চরম বিপাকে পড়তে হচ্ছে গ্রামবাসীকে। গ্রামের কেউ অসুস্থ হলে তাকে দ্রুত হাসপাতালে চিকিৎসকের কাছে নেওয়া সম্ভব হয় না। এমতাবস্থায় সাঁকোটি ভেঙে পড়লে গ্রামবাসীর যাতায়াত বন্ধ হয়ে যায়।
সাঁকো পার হতে গিয়ে গ্রামের প্রায়ই দুর্ঘটনা শিকার হতে হয়। কখনো কখনো সঙ্গে থাকা মালামাল ও বইপত্র পানিতে পড়ে যায়। আবার কখনো কখনো পা পিছলে অথবা সাঁকোর বাঁশ ভেঙে নিজেরাই খালের পানিতে পড়ে যান। প্রতিমাসেই এমন দু-একটি দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। সাঁকো আর ভোগান্তি এ এলাকার মানুষের এখন নিত্যসঙ্গী।
আব্দুর রহমান নামের এক স্কুল ছাত্র বলছে, সাঁকো পার হতে তাদের প্রতিদিনই মৃত্যুর ঝুঁকির মুখোমুখি হতে হয়। গ্রামের বাসিন্দা সালমা বেগম বলেন, ‘সকালে বাড়ি থেকে বিদ্যালয়ে যাওয়ার পর বাড়িতে আবার ফেরা পর্যন্ত সন্তানদের নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতে হয় আমাদের।’ মোহাম্মদ দুলাল হোসেন বলেন, ভালো যাতায়াত ব্যবস্থা না থাকায় তাদের ভালো জায়গায় ছেলেমেয়েদের বিয়েশাদি পর্যন্ত দেওয়া সম্ভব হয় না। অনেকেই তাদের সন্তানদের এই গ্রামে বিয়ে দিতে এবং বিয়ে করাতেও রাজি হয় না। জাতীয় স্থানীয় নির্বাচন এলে প্রার্থী ও নেতারা গ্রামের মানুষের ভোটের জন্য সাঁকোটিকে ব্রিজে রূপান্তর করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকেন। কিন্তু ভোট চলে গেলে তারা সেই কথা বেমালুম ভুলে যান!
আবুল কাশেম নামের গ্রামের অন্য এক বাসিন্দা বলেন, অতীতে চেয়ারম্যান ও মেম্বাররা নির্বাচনের সময় প্রতিশ্রুতি দিলেও নির্বাচনের পর তাদের আর দেখাই পান না তারা। গ্রামের বাসিন্দা আব্দুর রহিম সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রতিবছর ২ থেকে ৩ মাস পরপর এই সাঁকোটি ভেঙে যায়। আমরা এলাকা থেকে টাকা উত্তোলন করে ফের মেরামত করতে হয়। এতে করে এই এলাকার লোকজনের দুর্ভোগের শেষ নেই।’
মান্নান হোসেন বলেন, ‘এই একটি ব্রিজের অভাবে আমাদের চলাচল করতে অসুবিধা হয়। ছেলেমেয়েদের স্কুলে যেতে সমস্যা হয়। রোগীদের হাসপাতালে নেওয়া যায় না, এমনকি সাইকেল নিয়েও চলাচল করা যায় না। কয়েক দিন পর পর সাঁকোটি মেরামত করতে হয়।’ মো. হারুন বলেন, ‘প্রতিবছরই সাঁকোটি আমরা নিজেদের পকেট থেকে টাকা দিয়ে ৬-৭ বার মেরামত করি। এ সাঁকো দিয়ে চলাচল করতে আমাদের খুবই দুর্ভোগ পোহাতে হয়। জেলা প্রশাসনের কাছে আমাদের আবেদন এখানে একটি ব্রিজ করে দিলে এই অঞ্চলের ৩ ওয়ার্ডের ১৫ হাজার মানুষের দুর্ভোগ কমবে।’
ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত নারী সদস্যের স্বামী মো. হানিফ বলেন, ‘এই সাঁকোটি প্রায় ৬৫-৭০ মিটার। এর ফলে এলাকার লোকদের অনেক দুর্ভোগে পড়তে হয়। আমরা এলজিইডি ও সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন দপ্তরের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই, তারা চাইলে এই অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নসহ সার্বিকভাবে উন্নতি সাধিত হবে।’
লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর কবির বলেন, ‘আমরা ওই জায়গা পরিদর্শন করে এসেছি। ওই রাস্তাটি কোস্ট গার্ড অফিসের পাশ দিয়ে গেছে। তাই কোস্টগার্ডের ছাড়পত্র মিললে মন্ত্রণালয়ের পাঠানো হবে।’