নাগরিক সেবা পেতে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) খুবই গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় সর্বমহলে বেড়েছে এর গুরুত্ব। কিন্তু বিভিন্ন কারণে এই এনআইডিতে থাকা ত্রুটিবিচ্যুতি সংশোধন করতে বাধ্য হন অনেকে। তবে এসব বিষয়ে করা আবেদনগুলো নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা, ভোগান্তি ও হয়রানি যেন দূরই হচ্ছে না। বরং ভোগান্তি ও হয়রানির পাশাপাশি মাঝেমধ্যে দুর্ব্যবহারের শিকার হচ্ছেন গ্রাহকরা। সংশোধনের জন্য তিন থেকে সাত বছর আগে করা কারও কারও আবেদন এখনো ঝুলে আছে এনআইডির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে। অথচ সংশোধন আবেদনের তারিখ থেকে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে সব আবেদন নিষ্পত্তির বিধান উল্লেখ রয়েছে আইনে।
সম্প্রতি মো. শাহজাহান ভূঁইয়া নামে এনআইডি সেবা নিতে যাওয়া এক গ্রাহক এনআইডির প্রধান কার্যালয়ের জরুরি সেবা শাখার উপপরিচালক মো. রশিদ মিয়ার বিরুদ্ধে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ তুলেছেন। তিনি গত ২১ জানুয়ারি মহাপরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন উপপরিচালক মো. রশিদ মিয়া। আর ঘটনা তদন্ত করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা খবরের কাগজকে জানিয়েছেন এনআইডি মহাপরিচালক এ এস এম হুমায়ুন কবীর।
অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে পেশায় পরিচ্ছন্নতাকর্মী শাহজাহান বলেন, ‘বয়স সংশোধনের আবেদন করে তিন বছর ধরে ঘুরছি আপা। ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার জন্য এটা দরকার হবে। অথচ করতে পারছি না। উপজেলায় কাজ না হওয়ায় এনআইডির হেড অফিসে এসেছি। এখানে এসে কাজ হওয়া দূরের কথা, উল্টো এক কর্মকর্তার দুর্ব্যবহারের শিকার হয়েছি। তিনি এই অফিসের উপপরিচালক (মো. রশিদ মিয়া)। আমার সব কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরও তিনি সেগুলো বিশ্বাস করছেন না। উপজেলার তদন্ত রিপোর্ট তারা পাননি বলায় আমি নিজে তার হাতে জমা দেওয়ার পরও তিনি সেগুলো আমলে না নিয়ে আমাকে নানা প্রশ্ন করেন। আমি নাকি মিত্থ্যুক, আমার দাড়ি আছে- এগুলো নাকি মিথ্য বেশ! আমাকে রুম থেকে বের হয়ে যেতে বলেন। আমি চলে আসি। পরে আমি এনআইডি মহাপরিচালকের কাছে অভিযোগ দিই।’
ভুক্তভোগী শাহজাহান আরও জানান, ২৫ বছর ধরে তিনি বঙ্গভবনের গণপূর্ত উপবিভাগে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ করছেন। বাড়ি কুমিল্লার দেবিদ্বারে। তার স্কুল সার্টিফিকেট ও জন্মনিবন্ধনে থাকা বয়সের সঙ্গে এনআইডিতে লেখা বয়সের তফাত ১০ বছর। জন্মসাল সংশোধনে এ পর্যন্ত তিনবার আবেদন করেছেন। হলফনামা জমাসহ বয়স সংশোধনের বয়স নির্ধারণে রেডিওলজি টেস্টের রিপোর্টও তিনি জমা দিয়েছেন। সর্বশেষ বয়স টেস্ট ও উপজেলা নির্বাচন অফিসারের রিপোর্ট তার চাহিদার সঙ্গে মিলে যাওয়ার পরও তাকে হয়রানি করা হচ্ছে।
শাহজাহানের অভিযোগ ভিত্তিহীন দাবি করেছেন ইসির উপপরিচালক মো. রশিদ মিয়া।
তিনি বলেন, ‘ওই ব্যক্তি জন্মসাল ১০ বছর কমানোর আবেদন করেছেন। আঞ্চলিক নির্বাচন কার্যালয়ে তার আবেদন দুবার বাতিল হয়েছে। কারণ কাগজপত্রে ঘাটতি ও সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। সে ক্ষেত্রে আবেদনের সপক্ষে প্রয়োজনীয় যেসব ডকুমেন্ট দরকার হয়, সেগুলো তার কাছে চাওয়া হয়েছে। দুর্ব্যবহারের অভিযোগ বানানো। সে দিন আমি ওই আবেদনকারীকে চাকরিদাতা কর্তৃপক্ষের সার্ভিস ডকুমেন্টসহ চিঠি আনতে বলেছি। তারপরও কেউ অভিযোগ করলে কিছু করার নেই। কর্তৃপক্ষ নিশ্চয়ই সেটা দেখবে। কারণ অনেকেই ভুয়া কাগজপত্র দেওয়ায় অধিকতর যাচাই না করে আমাদের সংশোধনের কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুসরণ করতে হচ্ছে।’
পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে নির্বাচন ভবনে গিয়ে কথা হয় রাজধানীর কলাবাগান থেকে আসা হাবিবুর রহমান নামে এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘জাতীয় পরিচয়পত্রে নামের ভুল সংশোধনে দুই বছর আগে আবেদন করেছিলাম। এখনো সেই কাজ হয়নি, ক্যানসেলও হয়নি। সে কারণে আমি নতুন করে আবেদনও করতে পারছি না।’
কথা হয় দক্ষিণ বাড্ডার বাসিন্দা গীরেন্দ্র চন্দ্র বর্মণের সঙ্গে। তিনি জানান, ২০০০ সাল থেকে তিনি ভারতীয় হাইকমিশনে গাড়িচালকের কাজ করছেন। তার পৈতৃক বাড়ি কুমিল্লার মনোহরগঞ্জে। এনআইডিতে তার বয়স ও নাম স্বপন বর্মণ লিপিবদ্ধ হওয়ার জের টানছেন সাত বছর ধরে। ২০১৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত তিনবার সংশোধন আবেদন করেছেন। আবেদনের সপক্ষে সব ধরনের কাগজপত্র জমা দিয়েছেন। তিনবার স্থানীয় তদন্ত ও পাঁচবার ইসি অফিসে পরিবারসহ তার সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। তারপরও তার ডকুমেন্টসগুলো বিশ্বাসযোগ্য মনে করছেন না সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। ভুক্তভোগী ওই গাড়িচালকের অভিযোগ, নানা অজুহাতে তাকে হয়রানি করে নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ণ করা হচ্ছে।
এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে এনআইডি মহাপরিচালক এ এস এম হুমায়ুন কবীর খবরের কাগজকে বলেন, ‘এ ধরনের একটা আবেদন আমি পেয়েছি। ওই ঘটনায় এরই মধ্যে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছি। কারণ সেবা নিতে আসা কোনো নাগরিকের সঙ্গে কেন দুর্ব্যবহার করা হবে। এটা তাদের অধিকার। তবে এমনও আছে অনেক গ্রাহকও বাড়াবাড়ি করেন, অনৈতিক তদবির করেন। কর্মকর্তাদেরও কাজের অনেক চাপ থাকে। কাজেই কোন পরিস্থিতিতে সেই ঘটনা তা খতিয়ে দেখতে হবে। আবেদনকারী ও কর্মকর্তা উভয়ের বক্তব্য জানা দরকার। সে জন্যই এ ধরনের ঘটনায় তদন্ত সাপেক্ষে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে’।
একই সঙ্গে এনআইডি সেবা নিতে গিয়ে মানুষের নানাভাবে হয়রানির হওয়ার যে অভিযোগ তাতে একমত পোষণ করেন মহাপরিচালক হুমায়ুন কবীর নিজেও। তিনি বলেন, ‘আবেদন জমে থাকার কারণ ভিন্ন ভিন্ন। গ্রাহকের অসচেতনতা, মধ্যস্থতাকারী, তথ্য সংগ্রহকারী কর্মকর্তা- এমনকি দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদেরও গাফিলতি রয়েছে। তা না হলে তিন থেকে চার বছর আগে সংশোধনের জন্য করা এনআইডির আবেদন কেন পড়ে থাকবে! এটাও ঠিক সাধারণ ত্রুটিগত ভুল সংশোধন দ্রুতই হয়ে যাচ্ছে। আর তথ্য জটিলতা থাকলে সেগুলো তদন্ত ছাড়া ছাড় দেওয়া যায় না। বছরের পর বছর আবেদন পড়ে থাকলে ভুক্তভোগীরা নানা উপায়ে সেগুলো সংশোধনের চেষ্টা করেন, আর সেই সুযোগ নেন মধ্যস্থতাকারীরা’।
ইসির তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের মাঝামাঝিতে ইসিতে সংশোধনের জন্য করা ছয় লাখের বেশি আবেদন জমে ছিল। ইসির নানা উদ্যোগের ফলে সেই সংখ্যা প্রায় অর্ধেকে নেমে এলেও পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি নেই। এনআইডি বিভাগে এখনো ছয়টি ক্যাটাগরিতে জমে থাকা আবেদন ৩ লাখ ৫০ হাজারেরও বেশি। এনআইডি মহাপরিচালক জানান, এ অবস্থার উত্তরণে সম্প্রতি জমে থাকা আবেদনগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করতে তিন মাসের ক্রাশ প্রোগ্রাম নিয়েছে এনআইডি কর্তৃপক্ষ।