‘ছাত্রলীগের বাপ্পি, তার ভাই ও হাসেম মিস্তিরির ছেলে কায়সারসহ চারজনে মিল্যা আমারে এই রুমে আইন্যা গামছা দিয়া হাত পিছমোড়া কইরা বাইন্ধা ফেলাই রাখছিল। রাইতের ৩টা বাজে চাইর লক্ষ টাকা দেওনের পর আমাকে ছাড়ছিল। আমার ফ্যামিলি জমি বিক্রি কইরা সেই টাকা দিছে।’
ভুক্তভোগী দিনমজুর জাহাঙ্গীর আলম এভাবেই ছাত্রলীগের টর্চার সেলের সামনে নিজের বন্দিদশা, নির্যাতনের শিকার হওয়া ও মুক্তিপণ দিয়ে বেঁচে ফেরার বর্ণনা দিচ্ছিলেন।
জাহাঙ্গীর আরও বলেন, ‘হ্যামার দিয়া আমার পিঠে বারি দিছিল দুইটা। তার পরেই জ্ঞান হারাই। পরে জ্ঞান ফিরলে রাত ৩টার দিকে হাতের বাঁধন খুলে দেয়। থানায় অভিযোগ দিলেও কাজ হয় নাই। আমি আমার টাকা ফেরত চাই। সন্ত্রাসীদের কঠিন শাস্তি চাই।’
শুধু জাহাঙ্গীর আলম নন। রাঙামাটি শহরের বিএনপি অফিসের পাশেই সাবা টাওয়ারে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে ছাত্রলীগের (বর্তমানে নিষিদ্ধ সংগঠন) টর্চার সেলে নির্যাতিত হয়েছেন ব্যবসায়ী, শ্রমিকসহ বহু মানুষ। আটতলা ভবনটির আন্ডারগ্রাউন্ডে একটি কক্ষে আয়নাঘর বানিয়ে চলত চাঁদাবাজি, বন্দি করে রাখা, শারীরিক নির্যাতন ও মুক্তিপণ আদায়। এলাকায় ভবন নির্মাণ, জমি বেচাকেনায় দিতে হতো চাঁদা। স্কুল-কলেজের ছাত্রীদের ইভটিজিং, প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি, দলবদ্ধ হয়ে আড্ডাবাজি, সীমান্ত পার করে আনা ভারতীয় সিগারেট বিক্রিসহ নানা অপকর্ম চালাত ছাত্রলীগের এই গ্যাং। তবে নির্যাতন, মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোসহ মেরে ফেলার হুমকি থাকায় ভয়ে তখন কেউ মুখ খুলতে পারেনি। এলাকাবাসী ও ভুক্তভোগীরা ছাত্রলীগের এসব চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী গ্যাংকে অবিলম্বে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন। পুলিশ বলছে, থানায় অভিযোগ দায়ের করলে আসামি গ্রেপ্তার ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গতকাল রবিবার সকালে সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, টর্চার সেলটি স্থানীয়দের কাছে এখন আয়নাঘর হিসেবেই পরিচিত। কয়েকজন ভুক্তভোগীর শনাক্ত করা ওই আয়নাঘর বাইরে থেকে তালাবদ্ধ থাকায় ভেতরে ঢোকা যায়নি। জানালা দিয়ে দেখা গেছে ভেতরে একাধিক চেয়ার, টেবিল ও বেঞ্চ। এই কক্ষের অদূরে আরও একাধিক কক্ষ থাকলেও মানুষের চলাচল না থাকায় সেখানে ভুতুড়ে পরিবেশ বিরাজ করছে।

ভুক্তভোগী ও এলাকাবাসী বলছেন, জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি শাওয়াল উদ্দিনের নেতৃত্বে জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি পিকআপচালক হাবিবুর রহমান বাপ্পি, জেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন কায়সার, ছাত্রলীগ নেতা মো. রাব্বী, মো. রাকিব ও কলিমউল্লাহ চাঁদাবাজি এবং টর্চার সেল চালাতেন। শহরের আলম ডকইয়ার্ড এলাকায় এই সন্ত্রাসীদের দৌরাত্ম্য, চাঁদাবাজি ও নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন এলাকাবাসী। কিন্তু ভয়ে মুখ খুলতেন না কেউই। তবে সম্প্রতি অপারেশন ডেভিল হান্টে গ্যাংয়ের আনোয়ার হোসেন কায়সার চট্টগ্রামে আটক হওয়ায় বাকিরা এখন পলাতক।
মো. আখতার নামে এক ভুক্তভোগী বলেন, ‘ভবন নির্মাণকাজ বন্ধ করার হুকুম দিয়া বাপ্পিরা বলছিল আমাদের সাথে ৫ লাখ টাকা লেনদেনের কথা হইছে। টাকা না দিলে কাজ চলব না। ভয়ে কাজ বন্ধ কইরা দিই।’ ব্যবসায়ী আবদুল হক বলেন, ‘চাঁদা না দেওয়ায় আমার দোকানের জিনিসপত্র, শোকেস লাথি মেরে ফেলে দেওয়া হয়। আমাকে মারতে আসে। এ জন্য ওই দিন দোকান বন্ধ করেছি। আর খুলি নাই।’
বদিউল আলম নামে আরেক ভুক্তভোগী বলেন, ‘আমার বাড়ির নির্মাণকাজ শুরু করলে বাপ্পি, কায়সার, রাকিব, রাব্বি ও কলিমুল্লাহ ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। না দেওয়ায় কাজ বন্ধ করে দেয়।’
রেজাউল করিম নামে একজন বলেন, ‘আমার মিস্ত্রিদের ধরে নিয়ে যায় আয়নাঘরে। মারধর করে তাদের মোবাইল ও টাকাপয়সা লুটে নেয়। আমি কথা বলতে গেলে আমার মোবাইলও নিয়ে নেয়। চাঁদা না পেয়ে জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি মৃত শাহ আলমের বাড়ির নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেয় সন্ত্রাসীরা। এরা জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি শাওয়াল উদ্দিনের ভাগিনা। শাওয়ালের নেতৃত্বেই রাঙামাটিতে এসব অপরাধ চলত। আমরা এখনো কোনো বিচার পাইনি। কয়েক দিন আগে থানায় অভিযোগ দিলেও কাজ হয়নি।’
নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের এই সন্ত্রাসীদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী ও ভুক্তভোগীরা। আলম ডকইয়ার্ডের বাসিন্দা জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘যারা এখানে ভবন ও বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করছেন তাদের কাছ থেকে ভয়ভীতি দেখিয়ে চাঁদাবাজি করা হয়েছে। তারা বিভীষিকাময় জীবন পার করেছে।’ আরেক বাসিন্দা মো. কামাল বলেন, ‘আমি প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি, ভবিষ্যতে যেকোনো সরকার ক্ষমতায় এলেও এলাকায় আর এসব চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড যাতে না হয়।’
রাঙামাটির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মারুফ আহম্মেদ বলেন, ‘দেশব্যাপী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সমুন্নত রাখার জন্য বিশেষ অভিযান চলছে। রাঙামাটিতেও চলমান অভিযানে বিভিন্ন অপরাধে ৫২ জনকে আটক ও নিয়মিত মামলা রুজু করেছি। কারও আইনগত অধিকার লঙ্ঘিত হলে থানায় অভিযোগ করলে আসামি গ্রেপ্তার ও যথাযথ আইনগত প্রতিকারের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’