নভেম্বর-ডিসেম্বরে মশার উপদ্রব বেশি হলেও এবার মার্চেও স্বস্তি নেই। রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় ঝোপঝাড়, জঙ্গল, ড্রেনের বদ্ধ পানিতে জন্ম নিচ্ছে অসংখ্য মশা। সন্ধ্যার পর মশার দাপট বেড়ে যায় কয়েক গুণ। একদিকে জনসচেতনতার অভাব, অন্যদিকে সিটি করপোরেশনে লোকবলের অভাব থাকায় সঠিকভাবে মশক নিধন কার্যক্রম চলছে না। ফলে ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
রাজধানীর বাসিন্দারা বলছেন, এখন তদারকির অভাব দেখা যাচ্ছে। কারণ বিগত বছরে স্থানীয় ওয়ার্ডের স্ব-স্ব কাউন্সিলরসহ সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধিরা এসব নাগরিক সুবিধা দেখতেন। শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব থেকে সরে যেতে হয়। জনসেবার দায়িত্বভার পড়েছে একজন কর্মকর্তার ওপর। মাঠ পর্যায়ে দুর্বল মনিটরিংয়ের সুযোগে গা ছাড়া মনোভাব তৈরি হয়েছে মাঠ পর্যায়ের দায়িত্বরত কর্মীদের। ফলে নগরবাসী পড়ছেন মশার যন্ত্রণায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ঢাকা মহানগর উত্তর সিটিতে ৫৪টি ওয়ার্ডে কাউসিলর ছিলেন। তাদের সঙ্গে ১৮ জন সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর যুক্ত ছিলেন। সিটি করপোরেশনের ১০ জন আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তাও নিযুক্ত ছিলেন। জনভোগান্তির বিষয়ে আগে কাউন্সিলর বরাবর অভিযোগ দেওয়া গেছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেই সুযোগও নেই। ওয়ার্ডের সার্বিক কার্যক্রম তদারকি করেন প্রশাসন ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা। ঢাকা দক্ষিণ সিটির ক্ষেত্রেও তাই। ফলে মাঠ পর্যায়ের মনিটরিং ঢিলেঢালা হয়ে পড়েছে।
তবে সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, জেনেটিক্যালি পরিবর্তনের কারণে মশা নিধনে তিন স্তরের গবেষণা পরিচালনা করা হচ্ছে। সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার সমন্বয়ে মশা নিধনের ওষুধ ও কীটনাশক তৈরি হচ্ছে। তা মাঠ পর্যায়ে কর্মচারী-কর্মকর্তারা ব্যবহার করছেন। তবে মশা একেবারে নিধন করা সম্ভব নয়, জনসচেতনতার মাধ্যমে কমানো যেতে পারে।
মশার উপদ্রবের কারণে প্রতিনিয়ত বাড়ছে ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা। জেনেটিক্যালি পরিবর্তনের কারণে পরিবর্তন আসছে ডেঙ্গুর মতো ভয়াবহ রোগের ধরনেও। আর মশা দমনে গবেষণার প্রয়োজন বলছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
স্বাস্থ্য বিভাগের হিসেব বলছে, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে দেড় সহস্রাধিক ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন বিভিন্ন হাসপাতালে। সর্বশেষ মার্চ মাসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে ১ হাজার ১৬১ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। আর তাদের মধ্যে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে ৩৭৪ জনের বিপরীতে মারা গেছে ৩ জন। মার্চে ১৯ জন আক্রান্ত হয়েছেন। মৃত্যুর খবর এখনো পাওয়া যায়নি।
গত বছরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০২৪ সালে সারা দেশে এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত শনাক্ত হন ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন। বছরজুড়ে ডেঙ্গুতে প্রাণ হারান ৫৭৫ জন। কিউলেক্স মশা কামড়ালে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার অবস্থা তৈরি না হলেও এদের বাড়বাড়ন্ত সহ্য করা কঠিন। আইসিডিডিআরবি প্রকাশিত ওই গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশের গ্রীষ্মমণ্ডলীয় জলবায়ু, উষ্ণ তাপমাত্রা এবং দীর্ঘ বর্ষা ঋতুর কারণে এডিস মশার প্রজননের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়, যার ফলে দেশটি অনেক মশাবাহিত রোগের ঝুঁকিতে রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডেঙ্গুর মৌসুমি মহামারি জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি ক্রমবর্ধমান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মশার উপদ্রবের কথা স্বীকার করেন উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘এই মাসে মশার উপদ্রব রয়েছে অস্বীকার করা যাবে না। এ ক্ষেত্রে জনপ্রতিনিধি থাকলে আমাদের জন্য সুবিধা, এখন না থাকায় কিছুটা সমস্যা রয়েছে। তারপরেও আমরা চেষ্টা করছি এসব সমস্যা কাটিয়ে উঠতে।’ তিনি আরও বলেন, ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর নানা অভিযোগে ৬২ জন মশক নিধন মাঠকর্মীকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এখন প্রায় ১ হাজার ১০০ লোক মশক নিধনের কাজে নিয়োজিত। তাদের দিয়ে প্রতিদিন মশা নিধন রিলেটেড কাজ করানো হচ্ছে।
দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. নিশাত পারভীন খবরের কাগজকে বলেন, ‘একদিকে লোকবলের সমস্যা রয়েছে, অন্যদিকে কাউন্সিলরা না থাকায় কিছুটা সমস্যা তৈরি হয়েছে। তাও চেষ্টা করে যাচ্ছি। মশা একেবারে নিধন করা সম্ভব নয়। আমাদের কিছু নতুন ওয়ার্ড হয়েছে সেখানে মশার সমস্যা বেশি। কারণ এই ওয়ার্ডগুলোতে ডোবা-নালা বেশি, সেখানে পানি বহমান নয় বরং জমে থাকে। ফলে সেখানে মশা বেশি।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রায় ১ হাজার ৫০ জন মশক নিধনকর্মী সকাল-বিকেল শিফট করে কাজ করে যাচ্ছেন। তবে সবাইকে দিয়ে সমানভাবে কাজ করানো যাচ্ছে না। আবার জনবলের সমস্যা রয়েছে। তাই আমরা মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা করে যাচ্ছি। নানা সেমিনার ও সভা করা হচ্ছে। নানা কারণে শহরের নিম্নাঞ্চলগুলোতে মশার উৎপাত কিছুটা বেড়েছে। সেগুলো নিয়ে আমরা কাজ করছি।’