৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে গাজীপুরে একটি টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে বস্ত্র মন্ত্রণালয়। তবে এ প্রকল্পের প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হলে এতে অযৌক্তিক খরচ ধরা পড়ে। এ ছাড়া সম্প্রতি প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় এসব খরচ নিয়ে আপত্তি জানানো হয়।
এদিকে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, প্রকল্পের ক্ষেত্রে অযৌক্তিক খরচ কাটছাঁট করা অত্যন্ত জরুরি।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন অর্থের অপচয় ছাড়া আর কিছু নয়। কারণ হিসেবে তারা বরিশালের গৌরনদীতে স্থাপিত ‘শহিদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাত টেক্সটাইল ইনস্টিটিউট’ ও অন্যান্য কিছু প্রতিষ্ঠানের কাজে বাড়তি খরচের উদাহরণ তুলে ধরেন।
তারা জানান, ২০১৩ সালের জুলাই থেকে ২০১৬ সালের জুন পর্যন্ত সময় বেঁধে দিলেও তিনবার সংশোধন করে ২০২১ সালের জুনে শেষ হয়েছে ‘শহিদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাত টেক্সটাইল ইনস্টিটিউট’-এর কাজ। সেখানে ছাত্র-ছাত্রীদের হোস্টেল, প্রিন্সিপাল কোয়ার্টার, অফিসার্স কোয়ার্টার নির্মাণ করা হলেও সেগুলো ফাঁকা পড়ে আছে।
সিরাজগঞ্জের আমেনা মনসুর টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজেরও একই দশা। মাদারীপুরে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থাকার পরও রাজনৈতিক বিবেচনায় মেহেরপুরে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ করা হয়েছে। তা ফাঁকা পড়ে আছে, শিক্ষা কার্যক্রম এখনো শুরু হয়নি।
এভাবে মন্ত্রণালয় বিভিন্ন জায়গায় টেক্সটাইল কলেজ স্থাপন করে অর্থের অপচয় করছে।
এ ব্যাপারে পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আব্দুর রউফ খবরের কাগজকে বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য বিভিন্ন ভবন লাগবে। এটা স্বাভাবিক ব্যাপার। তবে কেন অধ্যক্ষ ভবন ফাঁকা পড়ে থাকে সেটা দেখার বিষয়। গাজীপুর টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ দরকার বলেই নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। কারণ এটা শিল্প এলাকা। দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে হবে। অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে এর প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। তারা সবকিছু যাচাই-বাছাই করবে। কোনো ভুলত্রুটি পেলে ধরবে, সংশোধন করতে বলবে। এটা স্বাভাবিক ব্যাপার। এটা করার অধিকার তাদের আছে।’
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ও সরকারের শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির অন্যতম সদস্য অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মুস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেছেন, ‘প্রকল্পের নামে অর্থের অপচয় করা ঠিক না। জনগণের করের টাকায় এসব করা হয়। প্রকল্পের অধীন অধ্যক্ষ ভবন করা হলেও ফাঁকা পড়ে থাকবে কেন? টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের অধ্যক্ষ কর্মস্থলে না থাকলে কীভাবে ভালোভাবে চলবে। কর্তৃপক্ষকে এটা ভালোভাবে মনিটরিং করতে হবে।’
গাজীপুর টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজেও বিভিন্ন খাতে অযৌক্তিক খরচের ব্যাপারে পরিকল্পনা কমিশনের আপত্তি নিয়ে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘পুরোনো অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে খরচের প্রাক্কলন করতে হবে। ভালো করে যাচাই-বাছাই করতে হবে। কারণ দেশের অর্থনীতি যে পর্যায়ে তাতে অহেতুক খরচ করার সুযোগ নেই। আগের মতো যাতে অর্থের অপচয় না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। অযৌক্তিক খরচ অবশ্যই কাটছাঁট করতে হবে।’
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, নির্ধারিত ২০১৬ সালে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও আরও পাঁচ বছর পর ২০২১ সালের জুনে আব্দুর রব সেরনিয়াবাত টেক্সটাইল ইনস্টিটিউট স্থাপন করা হয়েছে। ১০০ জন ছাত্রী থাকার জন্য হোস্টেল নির্মাণ করা হলেও মাত্র ১৮ জন ছাত্রী থাকছে। অধ্যক্ষ ভবন নির্মাণ করা হলেও তা ফাঁকা পড়ে আছে। ১২টি পরিবারের জন্য ৬ তলা স্টাফ কোয়ার্টার নির্মাণ করা হলেও মাত্র ১টি পরিবার বসবাস করে। এভাবে ৬০ কোটি টাকার প্রকল্পে বিভিন্নভাবে অর্থের অপচয় হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
একইভাবে ১১৯ কোটি টাকা খরচ করে সিরাজগঞ্জের কাজিপুরে আমেনা মনসুর টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ স্থাপন করা হয়েছে। ২০১৬ সালের জুলাইয়ে শুরু করে ২০২১ সালের জুনে শেষ হয় প্রকল্পটি। এখনো ফাঁকা পড়ে আছে অধ্যক্ষ বাসভবন, ছাত্রী নিবাস, স্টাফ ডরমেটরি। ১ কোটি ২০ লাখ টাকা খরচ করে পুকুর করা হলেও পানি নেই। মেহেরপুরে শহিউদ্দিন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজেরও একই দশা। প্রায় ২৫ কোটি টাকা খরচ করে ২০২৪ সালের জুনে এর কাজ শেষ হলেও শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়নি। পড়ে আছে ল্যাপটপ, ফার্নিচার, বইপত্র, বিভিন্ন যন্ত্রপাতি।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, বিভিন্ন জায়গায় টেক্সটাইল কলেজ করা হলেও তা কাজে লাগানো হয়নি। তারপরও পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয় থেকে গাজীপুর টেক্সটাইল ইজ্ঞিনিয়ারিং কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রকল্প অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত তিন বছর। প্রকল্পের প্রধান কাজ হচ্ছে, ২০ বিঘা জমি অধিগ্রহণ ও উন্নয়ন, প্রশাসনিক ভবন নির্মাণ, ২০০ বেডের ছাত্রাবাস নির্মাণ, ১০০ বেড়ের ছাত্রী নিবাস, দোতলার স্পিনিং শেড, ১৫ কোটি টাকায় ইউভিং শেড নির্মাণ, ওয়ার্কশপ, লাইব্রেরি ও ডাইয়িং ভবন নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া অফিসার ডরমেটরি নির্মাণ এবং ২৪৯ সেট যন্ত্রপাতি ও ল্যাবসামগ্রী কেনা হবে।
এসব যাচাই-বাছাই করতে পরিকল্পনা কমিশনে সম্প্রতি পিইসি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সূত্র জানায়, সভায় ভূমি অধিগ্রহণে ৩২ কোটি ৬১ লাখ টাকা ও ১০ কোটি টাকায় ভূমি উন্নয়ন খরচের যৌক্তিকতার ব্যাপারে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। ১৩ কোটি টাকা খরচে বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণ, সাড়ে ৩৪ লাখ টাকায় প্রধান ফটক (মূল গেট) নির্মাণ, ২৮ কোটি টাকায় ৬ তলা প্রশাসনিক ভবন নির্মাণে অযৌক্তিক খরচের ব্যাপারেও আপত্তি করা হয়েছে। এ ছাড়া ৪ হাজার ৬৩২টি আসবাবপত্র, যন্ত্রপাতি, ল্যাবসামগ্রী, ২ হাজার ১৫৮টি বই ও সাময়িকী, ১৫৪টি কম্পিউটার কেনার ক্ষেত্রে বাজারদর যাচাই কমিটির মাধ্যমে যৌক্তিকভাবে কেনার কথা বলা হয়েছে। ১ কোটি ২০ লাখ টাকা খরচ করে জলাধার নির্মাণের ব্যাপারেও প্রশ্ন তোলে পরিকল্পনা কমিশন।