সুন্দরবনে গত ২২ বছরে ২৫ বার অগ্নিকাণ্ড হয়েছে। অধিকাংশ আগুন লাগার কারণ হিসেবে তদন্ত প্রতিবেদনে জেলে-মৌয়ালদের অসাবধানতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। জেলে-মৌয়ালদের বিড়ি-সিগারেট বা মৌমাছি তাড়াতে জ্বালানো মশাল থেকে সবচেয়ে বেশি আগুনের সূত্রপাত হয়। যদিও এ নিয়ে বনজীবীদের দ্বিমত আছে।
বন বিভাগের সূত্র অনুযায়ী, পূর্ব সুন্দরবনে আগুন লাগার ঘটনা বেশি ঘটে। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ৬ মে পূর্ব বনবিভাগে বাগেরহাটের চাঁদপাই রেঞ্জে প্রায় ৭ দশমিক ৯ একর এলাকায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার পরও কয়েক দিন পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্তভাবে ছোট পরিসরে আগুন জ্বলতে দেখা যায়।
অপরদিকে পশ্চিম সুন্দরবনে চোরা শিকারি ও বিষ দিয়ে মাছ শিকারের ঘটনা বেশি ঘটে। গত ১৬ মার্চ সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও খুলনার কয়রা থেকে ২০৫ কেজি হরিণের মাংস জব্দ করে কোস্টগার্ড। অভিযানে মাংসের পাশাপাশি হরিণের দুটি মাথা ও চামড়া এবং ৮টি পা জব্দ করা হয়।
এদিকে আজ শুক্রবার বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব বন দিবস’। যা আন্তর্জাতিক বন দিবস নামেও পরিচিত। বনের গুরুত্ব এবং পৃথিবীতে জীবন টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে বনের ভূমিকা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর জন্য দিবসটি পালন করা হয়। বিশ্ব বন দিবসে সচেতনতা বৃদ্ধিতে স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে বন ও গাছপালা সম্পর্কিত কার্যক্রম, বৃক্ষরোপণ অভিযানে উৎসাহিত করা হয়। তবে সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায় খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরায় এবার বন বিভাগে বিশ্ব বন দিবসের কোনো আনুষ্ঠানিকতা রাখা হয়নি।
এ বিষয়ে সুন্দরবন বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ জানান, এবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায় বিশ্ব বন দিবসের অনুষ্ঠান কিছুটা পিছিয়ে নেওয়া হয়েছে। ঢাকায় ২৩ বা ২৪ মার্চ এই অনুষ্ঠানের পাশাপাশি খুলনায় একই সঙ্গে দিবসটি পালন করা হবে।
সুন্দরবন বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ আরও জানান, পূর্ব সুন্দরবনে যেসব এলাকায় আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে তার আশেপাশে বনরক্ষী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে সচেতনতামূলক বৈঠক হয়েছে। বনে আগুন নেভানোর জন্য শক্তিশালী দুইটি নৌযান দেওয়া হয়েছে। মসজিদের ইমামদেরকে বনে প্রবেশের পর বনজীবীরা যেন আগুন ফেলে না আসে সে বিষয়ে বয়ান দেওয়া হচ্ছে। সতর্কতামূলক মাইকিং ও হ্যান্ডবিল বিতরণ করা হয়েছে। এ ছাড়া চোরা শিকারিদের প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে তথ্য দিলে পুরস্কারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
বন গবেষকরা বলছেন, সুন্দরবনে মানুষের অবাধ যাতায়াতের কারণে শব্দ দূষণসহ নানা সমস্যায় বনের স্বাভাবিক পরিবেশের ওপর নেতিবাচক চাপ সৃষ্টি হয়। পর্যটন স্পটগুলোতেও পর্যটক যাতায়াতের ওপর নিয়ন্ত্রণ আনা প্রয়োজন। কোনো স্পটে কী পরিমাণ পর্যটক যেতে পারবে তা নির্ধারণ করে দেওয়া দরকার।
সুন্দরবন অ্যাকাডেমির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির বলেন, সুন্দরবনে পরিবেশ প্রতিবেশ রক্ষায় একাধিক নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা রয়েছে। এখানে বন বিভাগ, মৎস্য বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আলাদা সংস্থা রয়েছে। ভিন্ন ভিন্ন সংস্থার দায়িত্বে থাকায় শেষ পর্যন্ত কেউই সঠিকভাবে বন রক্ষায় কাজ করতে পারে না। এ কারণে বনের ইকো ট্যুরিজম ব্যবস্থাপনায় নির্দিষ্ট একক নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাকে দায়িত্ব দিতে হবে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) খুলনা শাখার সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট মো. বাবুল হাওলাদার বলেন, সুন্দরবনের গুরুত্ব বুঝতে নীতি-নির্ধারণী মহল ব্যর্থ হয়েছে। এ করাণে পরিবেশ-প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষাকারী এ অমূল্য সম্পদ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। লবণ পানির আধিক্য কারণে প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট সুন্দরবনের অস্তিত্ব আজ হুমকির মুখে। ট্যুরিজমের নামে অপরিকল্পিত রিসোর্টসহ বিভিন্ন সুন্দরবন বিনাশী কর্মকাণ্ডের কারণে বনটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিভিন্ন মহলের পরস্পর যোগসাজশে চোরা শিকারিরা বাঘ শিকার করে চামড়াসহ বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পাচার, হরিণ শিকার, নদীতে বিষ প্রয়োগে মৎস্য শিকার, অনিয়মতান্ত্রিক মধু সংগ্রহ, অবৈধভাবে কাঠ ও গোলপাতা আহরণ করে প্রাকৃতিক এ সম্পদের অপূরণীয় ক্ষতি করছে। আইন থাকলেও নেই কোনো প্রয়োগ। নেই কোনো জবাবদিহি-স্বচ্ছতা। সুন্দরবন রক্ষায় প্রয়োজন আইনের কঠোর প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন।
জানা যায়, সুন্দরবন ঘিরে মাছ ধরা, মধু আহরণ, বাওয়ালি, কাঁকড়া শিকারসহ বিভিন্ন কাজে ১০ লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে। এর বাইরে চোরা শিকারি, বন্যপ্রাণি শিকার, নদী-খালে বিষ দিয়ে মাছ শিকারের মতো ঘটনা বনে ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।