দুর্নীতিবাজ হিসেবে আলোচনায় থাকা বা জনমনে ব্যাপক ধারণা থাকা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা নিয়ে এরই মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে। তারা মনে করছেন, এতে করে অনেকেই উদ্দেশ্যমূলকভাবে হয়রানির শিকার বা হেয় হতে পারেন। এ বিষয়ে খবরের কাগজের কাছেও শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।
গত ২০ মার্চ জনপ্রশাসনবিষয়ক কমিটির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের এক সভার সারসংক্ষেপে বলা হয়, ‘জনপ্রশাসনবিষয়ক কমিটি’র দ্বিতীয় সভার সিদ্ধান্তানুযায়ী তার মন্ত্রণালয়/বিভাগ এবং আওতাধীন দপ্তরে কর্মরত কর্মকর্তা/কর্মচারীদের মধ্যে যাদের বিষয়ে জনমনে দুর্নীতিবাজ হিসেবে ব্যাপক ধারণা রয়েছে, গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।’
এই সিদ্ধান্তসহ চিঠি সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সিনিয়র সচিব, সচিব এবং সরকারি দপ্তরের মহাপরিচালক, নির্বাহী পরিচালক, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও চেয়ারম্যান এবং বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকদের কাছে এই চিঠি পাঠানো হয়েছে। তবে এই চিঠিতে ‘যাদের বিষয়ে জনমনে দুর্নীতিবাজ মর্মে ব্যাপক ধারণা রয়েছে’ এই লাইনটি নিয়ে বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা তাদের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।
স্থানীয় সরকার বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে খবরের কাগজকে বলেন, যদি কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িয়ে যান, সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সব সময়ই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। এটা নতুন কিছু নয়। কিন্তু সম্প্রতি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পাঠানো নির্দেশে গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে তদন্ত করার কথা বলা হয়েছে। এই কর্মকর্তা বলেন, একজন কর্মকর্তাকে সবাই পছন্দ করবেন, এটা হতে পারে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কোনো সিদ্ধান্ত বা নির্দেশ বিষয়ে অনেক সময় অনেক কর্মকর্তা ঊর্ধ্বতন বা সহকর্মীর বিরাগভাজন হয়ে থাকেন। এই নির্দেশের মাধ্যমে এখন একজন কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে অপছন্দের কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে হয়রানি বা হেয় করার মতো অপচেষ্টার সুযোগ হাতে তুলে দেওয়া হলো। কারণ চিঠির বক্তব্য অনুযায়ী দুর্নীতির ধারণা থাকলেই একজনের বিরুদ্ধে আরেকজন অভিযোগ তুলে তদন্তের মুখে ফেলে দেবে। এতে সত্যতা না থাকলেও শুধু ধারণার কারণে সরকারি একজন কর্মকর্তা-কর্মচারী হয়রানির শিকার হবেন। তা ছাড়া শুধু সন্দেহের বশে গোয়েন্দা সংস্থা দিয়ে তদন্তের পাশাপাশি দলীয় ট্যাগ দিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার একটা সুয়োমোটো ব্যবস্থা চালু করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
দুর্নীতিবাজ বলে ধারণার বশবর্তী হয়ে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে তদন্তে হয়রানির শিকার হবেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা বলেন, কর্তৃপক্ষ এমনিতে কোনো দুর্নীতির কথা জানতে পারে না। দুর্নীতি বা অনিয়মের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট করে কেউ জানালে বা অভিযুক্ত কর্মকর্তা বা কর্মচারীর কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নিলেই কেবল নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ হিসেবে জনপ্রশাসনের পক্ষে জানা সম্ভব। এই চিঠির মাধ্যমে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে বলা হয়েছে, যদি তার অধীনস্ত কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে যদি এমন অভিযোগ পাওয়া যায়, সে ক্ষেত্রে গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে যাচাই করে যদি অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়, সে ক্ষেত্রে যেন সেই কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নেয়। তিনি বলেন, অনেকের ক্ষেত্রেই অনেক সময় দুর্নীতির অভিযোগ থাকলেও তা প্রতিকার বা অভিযুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আবেদন করেন না। সে ক্ষেত্রে সরকারের জানার উপায় কী- এমন প্রশ্ন রেখে ঊর্ধ্বতন এই কর্মকর্তা বলেন, সে জন্য এমন অভিযোগের কথা শোনা গেলেও যেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রো-অ্যাকটিভ হয়ে তা প্রতিকারের ব্যবস্থা নেন। এ কারণেই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে যেসব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে দুর্নীতিবাজ বলে ধারণা আছে, তাদের বিরুদ্ধে যেন গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তবে কিছু দুষ্ট লোক সব সময় যেকোনো পরিস্থিতিতে সুযোগ নিতে চায়। সে জন্য চিঠিতে বলে দেওয়া হয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আছে বা শোনা যায় গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গুরুত্বপূর্ণ এক বিভাগের সচিব বলেন, এটা আসলে দরকারই নাই। কারণ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে পদোন্নতি দেওয়ার আগে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে তাদের সবকিছু যাচাই-বাছাই করা হয়। ক্লিন ইমেজ বা চাকরীজীবনে দুর্নীতি, অনিয়মের অভিযোগ না থাকলেই কেবল পদোন্নতি পেয়ে থাকেন একজন কর্মকর্তা-কর্মচারী। তবে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে যদি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া যায়, তবে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আর ধারণাগত দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেলে সে ক্ষেত্রে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে যাচাই-বাছাই করে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে জানান এই সচিব। তবে বিপরীতে এই নির্দেশ অনুযায়ী সহকর্মীর ব্যক্তিগত আক্রোশের শিকারও হতে পারেন কেউ কেউ। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে যথেষ্ট সচেতন থাকতে হবে, যাতে নিরপরাধ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা হয়রানির শিকার না হন।
প্রসঙ্গত, গত ৮ জানুয়ারি বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, যুগ্ম সচিব ও ওপরের স্তরের কর্মকর্তাদের নিয়োগ, বদলি ও শৃঙ্খলাসংক্রান্ত বিষয়ে পরামর্শ দিতে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদকে সভাপতি করে জনপ্রশাসনবিষয়ক কমিটি গঠন করে সরকার।