বাংলাদেশ থেকে প্রথম ধাপে ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে ফেরত নিতে সম্মত হয়েছে মায়ানমার কর্তৃপক্ষ। চূড়ান্ত যাচাই-বাছাইয়ের পর্যায়ে আছে আরও ৭০ হাজার রোহিঙ্গা। মায়ানমার সরকারের এই ঘোষণায় বারবার মুখ থুবড়ে পড়া রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে।
রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে মায়ানমারের সম্মতিকে বড় ধরনের কূটনৈতিক সাফল্য বলে দাবি করা হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে। তারা বলছেন, এই নিশ্চয়তা প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে ‘ইতিবাচক ও আশাব্যঞ্জক’।
তবে রোহিঙ্গা নেতারা বলছেন, নিরাপত্তা দিয়ে রোহিঙ্গাদের কোথায় ফিরিয়ে নেওয়া হবে সেটি মায়ানমারকে স্পষ্ট করতে হবে। তারা আরাকানে ফিরতে চান। কিন্তু আরকান এখন সরকারের হাতছাড়া হয়ে গেছে।
এদিকে আরাকান আর্মির মুখপাত্র খাইং থু খা খবরের কাগজের কাছে দাবি করেছেন, প্রত্যাবাসন বিষয়ে মায়ানমারের উপ-প্রধানমন্ত্রী ইউ থান শিউ বাংলাদেশের কাছে ষড়যন্ত্রমূলক বক্তব্য দিয়েছেন। কারণ রাখাইনে রোহিঙ্গাদের কোনো কিছু নেই, যেখানে এসে তারা বসবাস করতে পারেন।
সাড়ে ৭ বছর আগে, ২০১৭ সালে মানবিক বিবেচনায় মায়ানমার থেকে আসা নির্যাতিত রোহিঙ্গা নাগরিকদের আশ্রয় দিয়েছিল বাংলাদেশ। গণহত্যা ও নির্যাতনের মুখে নানা সময়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গার সংখ্যা এখন ১৩ লাখের বেশি। দিন দিন এই সংখ্যা বাড়ছে।
শুরু থেকেই রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে বাংলাদেশ সরকার নানা চেষ্টা চালিয়েছে। কিন্তু ছলচাতুরীর মাধ্যমে মায়ানমার একজন রোহিঙ্গাকেও ফেরত নেয়নি।
গত ১৪ মার্চ রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির পরিদর্শনে যান জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস ও প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। দুজনই লাখও রোহিঙ্গার সঙ্গে ইফতার করেন। বক্তব্যে তারা প্রত্যাবাসন বিষয়ে রোহিঙ্গাদের আশার বাণী শোনান। বলেন, আগামী রোজার ঈদ রোহিঙ্গারা নিজ দেশে স্বজনদের সঙ্গে উদযাপন করতে পারবেন।
কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, ‘জাতিসংঘের মহাসচিব ও প্রধান উপদেষ্টার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির পরিদর্শনের মাস না পেরুতেই বাংলাদেশ থেকে প্রথম ধাপে ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে ফেরত নিতে সম্মত হয়েছে মায়ানমার। চূড়ান্ত যাচাই-বাছাইয়ের পর্যায়ে আছে আরও ৭০ হাজার রোহিঙ্গা। এমন খবর সত্যিই ইতিবাচক।’
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনের অতিরিক্ত কমিশনার আবু সালেহ মোহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ খবরের কাগজকে বলেন, ‘প্রত্যাবাসনের জন্য প্রস্তুত কক্সবাজারের টেকনাফ ও বান্দরবানের ঘুমধুমের ট্রানজিট সেন্টার। তালিকা হাতে এলেই পরিবারগুলো শনাক্তের পর নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রত্যাবাসন করা হবে।’
তবে রোহিঙ্গা কমিউনিটির নেতাদের দাবি, নিরাপত্তা দিয়ে রোহিঙ্গাদের কোথায় ফিরিয়ে নেবে সেটা মায়ানমারকে পরিষ্কার করে বলতে হবে।
আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জোবায়ের খবরের কাগজকে বলেন, ‘আরাকান আমাদের জন্মভূমি। সেখানে ফিরতে পারলে তা সবার জন্যই ভালো। কিন্তু এই প্রত্যাবাসন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হবে কি-না, সেটিও ভাবতে হবে। বর্তমানে আরাকান আর্মি ও জান্তা বাহিনীর মধ্যে লড়াই তীব্র আকার ধারণ করেছে। ইতোমধ্যে মায়ানমারের অনেক রাজ্য আরাকান আর্মি দখলে নিয়েছে। আমাদের দায়িত্ব কে নেবে! মিন অং হ্লাইং আর্জেন্টিনার গ্রেপ্তারি পরোয়ানাপ্রাপ্ত ব্যক্তি। আরাকান তার হাতছাড়া হয়ে গেছে। আমরা ফেরত গেলে তো আরাকানে যাব। কিন্তু জান্তাপ্রধান আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে? এ কথা এখনো পরিষ্কার করে বলেনি তারা। এই পরিস্থিতিতে আমাদের (রোহিঙ্গা) প্রত্যাবাসন সঠিক প্রক্রিয়ায় হবে কি-না, তা নিয়েও আশঙ্কা রয়েছে।’
মোহাম্মদ জোবায়ের আরও বলেন, ‘আমরা চাই রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধান। এ ক্ষেত্রে জান্তাপ্রধান পরিষ্কার করে যদি বলত যে, রোহিঙ্গাদের জন্য আলাদা নিরাপদ জোন করে দেওয়া হবে তাহলে অন্তর থেকে খুশি হতাম।’
বাংলাদেশ ২০১৮-২০২০ সালে ৬ ধাপে মায়ানমারকে রোহিঙ্গাদের তালিকা দেয়। সেই তালিকায় থাকা ৮ লাখ রোহিঙ্গার মধ্যে মায়ানমার ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে ‘ফেরত যাওয়ার যোগ্য’ বলে শনাক্ত করেছে। চূড়ান্ত যাচাই-বাছাইয়ের পর্যায়ে আরও ৭ লাখ রোহিঙ্গার নাম ও ছবি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।