সর্বনিম্ন দরদাতা ৭ কোটি টাকায় কাজ করতে চেয়েছেন। তাকে না দিয়ে কাজ দেওয়া হয় ১৫ কোটি টাকায় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দরদাতাকে। ৪০ লাখ টাকার এক্স-রে মেশিন ১ কোটি ২৬ লাখ টাকায়, ১৩০ টাকার ক্যাথেটার মাউন্ট ৪ হাজার টাকায়, ২১৮ টাকার সিভিপি ম্যানোমিটার ৫ হাজার ৮০০ টাকায়, ব্যাগসহ ২৫০ টাকার সুই ২৫ হাজার টাকায় এবং ১৪০ টাকার এইচএমই ফিল্টার কেনা হয় ৪ হাজার টাকায়। এসবই সরবরাহ করেছে ভিক্টর ট্রেডিং করপোরেশন নামের একটি প্রতিষ্ঠান।
কেনাকাটায় এসব অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালে (নিনস)। ২০১২ সাল থেকে একটি সিন্ডিকেট কেনাকাটার নামে অন্তত ২০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সূত্র জানিয়েছে। এই সিন্ডিকেটের নেপথ্যে রয়েছেন হাসপাতালটির যুগ্ম পরিচালক অধ্যাপক ডা. বদরুল আলম মণ্ডল ও তার ভাগ্নে সাবেক প্রশাসনিক কর্মকর্তা আবু সায়েম মোহাম্মদ এমদাদুল সাদেক।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও থেমে নেই এই সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য।
সম্প্রতি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ একটি ওয়ার্ম মেশিন কেনার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। সর্বোচ্চ ১২ কোটি টাকার এই মেশিন ২০ কোটি টাকার বেশি দামে কেনার পাঁয়তারা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সব ঠিক থাকলে এই মেশিনটি কেনার কার্যাদেশও ভিক্টর ট্রেডিং করপোরেশনই পাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই মেশিনটি দেশের মাত্র দুটি হাসপাতালে আছে। আট বছর আগে মেশিনটি কেনে বিআরবি হাসপাতাল। সম্প্রতি আরেকটি হাসপাতাল এটি কিনেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নিনসের এক চিকিৎসক বলেন, ‘মেরুদণ্ডের অপারেশনে মেশিনটি ব্যবহার করা হয়। আমার জানামতে, বিআরবি হাসপাতালে আট বছরে ২০টি অপারেশনও হয়নি এই মেশিনটি দিয়ে। আমাদের স্পাইন ইউনিট সুনির্দিষ্টভাবে এই মেশিনটি কেনার জন্য চাহিদা দেয়নি। তার পরও মেশিনটি কেনার বিষয়ে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এই মেশিনটি শুধু মেট্রোনিক কোম্পানি তৈরি করে। বাংলাদেশে মেট্রোনিকের পরিবেশক ভিক্টর টেডিং করপোরেশন। সে জন্যই মেশিনটি কেনায় এত তোড়জোড়।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সূত্র জানিয়েছে, ভিক্টর ট্রেডিং করপোরেশন নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটির কাগুজে স্বত্বাধিকারী কাওছার ভূঁইয়া। নিনসের সাবেক প্রশাসনিক কর্মকর্তা সাদেক ভিক্টরের একজন ব্যবসায়িক অংশীদার। সাদেক যে বিলাসবহুল নিশান গাড়িটি ব্যবহার করেন, সেটি ভিক্টরের নামে কেনা। কেনাকাটায় দুর্নীতির মাধ্যমে অল্পদিনে তিনি হয়েছেন অঢেল সম্পদের মালিক। তবে নিনসের একটি সূত্র জানিয়েছে, ওপরে ওপরে মামা থাকলেও মূলত ভিক্টরের ব্যবসায়িক পার্টনার ডা. বদরুল আলম। এর আগে সাদেকের বিরুদ্ধে দুর্নীতি-অনিয়মের অভিযোগ উঠলে শাস্তিস্বরূপ এই প্রতিষ্ঠান থেকে তাকে বদলি করে দেওয়া হয়। দুদকে ভিক্টরের মালিক কাওছার ও সাদেকের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ফাইল খোলা হয়। পরে বদরুল আলম সাবেক ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়ার প্রভাব খাটিয়ে ভাগ্নে সাদেক ও কাওছারকে রক্ষা করেন।
একটি সূত্র জানায়, কাওছার নিনস থেকে লুটে নেওয়া টাকায় শেরেবাংলা নগরে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন। ২০২৩ সালে ভিক্টর ট্রেডিংয়ের দুর্নীতির অনুসন্ধান চালাতে গিয়ে হামলার শিকার হন ডিবিসি টেলিভিশনের দুই সাংবাদিক। সেই ঘটনায় কাওছার ভূঁইয়াসহ আটজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে তারা জামিনে মুক্ত হন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কেনাকাটার জন্য কমিটি থাকলেও নিনসে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ছিল বদরুল আলমের হাতে। সাবেক ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়ার আত্মীয় পরিচয়ে তিনি ছিলেন নিয়ন্ত্রণহীন। তার সেই দাম্ভিকতা এখনো কমেনি।
২০১২ সালের ১২ জানুয়ারি বদরুল আলম অতিরিক্ত দায়িত্বে নিনসের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিযুক্ত হন। প্রথমে নিনস ৩০০ শয্যার ছিল। তারপর ৫০০ শয্যা করা হয়। এরপর ২০১৮ সালে আরও ৫০০ শয্যার একটি হাসপাতাল ভবন করার প্রকল্প একনেকে পাস হয়। সেই প্রকল্পেরও পরিচালক বদরুল আলম। ৫০৬ কোটি টাকার ওই প্রকল্পে কেনাকাটায় বরাদ্দ ছিল ২০৩ কোটি টাকা।
বদরুল আলম প্রকল্প পরিচালক হওয়ার পর প্রশাসনিক কর্মকর্তার পদে বসান ভাগ্নে সাদেককে। তারপর রাতারাতি মামা-ভাগ্নে পেয়ে যান আলাদিনের চেরাগ। অনুসন্ধানে বদরুল ও তার ভাগ্নের এই সিন্ডিকেটে হিসাবরক্ষক কর্মকর্তা কাজী মোর্শেদ, স্টোরকিপার ইমরান হোসেন, ইনস্ট্রুমেন্ট কেয়ারটেকার আপেল মাহমুদ, মেকানিক্যাল সুপারভাইজার শরিফুল ইসলাম, ল্যাব টেকনিশিয়ান আলমগীর হোসেনসহ আরও কয়েকজনের নাম উঠে এসেছে।
ভিক্টর ট্রেডিং করপোরেশনসহ আরও দু-একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করে রাতারাতি সিন্ডিকেটের সদস্যরা আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন। ২০১২ সালে ছোটখাটো জিনিস সরবরাহের মাধ্যমে নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালে কাজ শুরু করে ভিক্টর ট্রেডিং করপোরেশন। হিসাবরক্ষক কর্মকর্তা কাজী মোর্শেদ ভিক্টরকে এই হাসপাতালে ঢোকান। তিনি ভিক্টরের স্বত্বাধিকারী কাওছার ভূঁইয়ার নিকটাত্মীয়। এ ছাড়া স্টোরকিপার ইমরান হোসেন কাওছারের বিয়ের উকিল বাবা।
একটি সূত্রে জানা গেছে, যেকোনো দরপত্র আহ্বানের ক্ষেত্রে বদরুল আলম তার ভাগ্নে সাদেককে দিয়ে নিজেদের মতো করে স্পেসিফিকেশন তৈরি করান, যেন ভিক্টর বা তাদের পছন্দের প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান কাজ না পায়। স্পেসিফিকেশনের পরও যদি অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান বিট করে টিকে যায়, তাহলে ফাঁকফোকর তৈরি করে সেই প্রতিষ্ঠানকে কোনো না কোনোভাবে অযোগ্য করে দেওয়া হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, তিনি নিনসের অফিস কক্ষে বসে ভিক্টরের লোকজনকে স্পেসিফিকেশন তৈরি করতেও দেখেছেন। ভিক্টরের লোকেরা আপেল মাহমুদের রুম, উচ্চমান সহকারী ও স্টোরকিপারের কম্পিউটার ব্যবহার করেন।
এই সিন্ডিকেটের আরেকজন সক্রিয় সদস্য আলমগীর হোসেন প্যাথলজি বিভাগের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সূত্র জানিয়েছে, তার সঙ্গে যোগাযোগ ছাড়া কোনো মালামাল এই বিভাগে প্রবেশ করতে পারে না। এই বিভাগে বিভিন্ন কোম্পানির মেশিন থাকলেও ভিক্টরের সরবরাহ করা মেশিন ছাড়া অন্য কোনো মেশিন তেমন একটা ব্যবহার করা হয় না। কারণ এখানে রয়েছে রি-এজেন্টের বিরাট ব্যবসা। নির্দিষ্ট মেশিনে নির্দিষ্ট কোম্পানির রি-এজেন্ট ব্যবহার করা হয়। মালামাল না নিয়েও বুঝে পাওয়া মর্মে ভিক্টরকে ছাড়পত্র দেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে আলমগীর হোসেনের বিরুদ্ধে। এভাবেই তিনি দুর্নীতির মাধ্যমে নিজেকে আর্থিকভাবে অনেক শক্তিশালী করেছেন, গড়েছেন সম্পদের পাহাড়। এই সিন্ডিকেটের সদস্য হিসেবে ল্যাবের যেকোনো মেশিনের টেন্ডার করার জন্য আপেল মাহমুদকে সঙ্গে নিয়ে ভিক্টর ট্রেডিং স্পেসিফিকেশস তৈরি করে। আর সেগুলো বদরুল আলম অনুমোদন দেন।
অভিযোগের বিষয়টি অস্বীকার করে আলমগীর হোসেন বলেন, ‘আমাদের ওই জায়গা পর্যন্ত যাওয়ার কোনো এখতিয়ারও নেই। হাতও নেই। অতএব যে বা যারা আমার বিরুদ্ধে এসব কথা বলেছেন। তারা খুবই বানোয়াট কথা বলেছেন।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই সিন্ডিকেটের মাথার ওপর বটবৃক্ষের মতো ছায়া দিতেন তৎকালীন প্রতিষ্ঠানপ্রধান অর্থাৎ পরিচালক অধ্যাপক ডা. কাজী দীন মোহাম্মদ। বদরুল সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে দীন মোহাম্মদ তদন্তের নামে পকেট কমিটি করে বৈধতা দিয়ে এসেছেন। দীন মোহাম্মদ সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিৎসক হওয়ায় কেউ এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস পাননি। শেখ হাসিনা পালানোর পর ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে দীন মোহাম্মদ নিনসের পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন। পরে অধ্যাপক ডা. গুরুদাস মণ্ডলকে নিনসে ফিরিয়ে আনাকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে দীন মোহাম্মদ পদত্যাগ করেন।
অভিযোগের বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক বদরুল আলম বলেন, ‘এ ধরনের অভিযোগ এই হাসপাতালের জন্য প্রযোজ্য না। কেনাকাটার একটা কমিটি আছে। কমিটি এমনভাবে কাজ করে, যেখানে অনিয়মের প্রশ্নই আসে না। বহু কোম্পানি এখানে কাজ পেয়েছে। শুধু ভিক্টর পায়, এটা বানানো কথা। কেনাকাটা নিয়ন্ত্রণ করে ওই কমিটি। কেনাকাটায় হস্তক্ষেপের কোনো সুযোগই নেই।’
২০২৩ সালের ৮ ডিসেম্বরের ‘প্রকিউরমেন্ট অব মডিউলার অপারেশন থিয়েটার ইয়ুথ ইক্যুইপমেন্ট উইথ অ্যাকসেসরিস’ শীর্ষক দরপত্রটি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সর্বনিম্ন দরদাতা ইউনিট্রেড করপোরেশনকে ৭ কোটি ৯৬ লাখ ৮০ হাজার টাকায় কাজ না দিয়ে ১৫ কোটি ৮৭ লাখ ৭৩ হাজার ৫৬ টাকায় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দরদাতা ভিক্টর ট্রেডিং করপোরেশনকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। এই এক দরপত্রে প্রায় ৮ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে সিন্ডিকেটটি। এ প্রসঙ্গে বদরুল আলম বলেন, ‘তারা যে মাদার কোম্পানির নাম দিয়ে কাগজ সাবমিট করেছিল, সেখানে ই-মেইল করে জানতে পারি, সর্বনিম্ন দরদাতা হওয়া কোম্পানিকে তারা অথরাইজেশনই দেয়নি। তার মানে প্রিলিমিনারিতে তারা আউট হয়ে গেছে। ইভল্যুয়েশন কমিটিতেই জাস্টিফাই হয়নি। রেট জাস্টিফাই তো পরের ব্যাপার।’ এসব বিষয়ে ভিক্টর ট্রেডিং করপোরেশনের স্বত্বাধিকারী কাওছার ভূঁইয়ার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।